প্রযুক্তিনির্ভর ‘বজ্রপাত নিরোধক’ খুঁটি স্থাপন করুন
jugantor
প্রযুক্তিনির্ভর ‘বজ্রপাত নিরোধক’ খুঁটি স্থাপন করুন

  তৌহিদ বিল্লাহ  

১৬ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষাকাল শুরু হয়েছে। আর বর্ষাকালের সঙ্গেই রয়েছে বজ্রপাতের যোগসাজশ। বজ্রপাতে প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা কমাতে মানুষকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর বজ্রপাতের কবল থেকে রক্ষা পেতে ২০টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করছে।

এসব নির্দেশনা জানা ও মানার বিকল্প নেই। নির্দেশনাগুলোর অন্যতম হলো-বজ্রপাত হলে উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বিদ্যুৎস্পর্শের আশঙ্কা বেশি থাকে, তাই বজ্রপাতের সময় পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নিতে এবং উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকতে হবে।

এছাড়া এ সময় জানালা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলা, টিভি-ফ্রিজ না ধরা, গাড়ির ভেতর অবস্থান না করা এবং খালি পায়ে না থাকা অন্যতম। কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাত শুরুর অন্তত আধঘণ্টা সময় সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, চলতি জুন মাসের প্রথম ছয় দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ৭২ জন বাংলাদেশি! মৃত্যুর এ চিত্র নিঃসন্দেহে দুশ্চিন্তার কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জে। হাওড়াঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে থাকে।

তবে এবার খোদ রাজধানীতেও বজ্রপাতের ঘটনায় একাধিক প্রাণহানির খবর প্রকাশ পেয়েছে মিডিয়ায়। বাংলাদেশে সাধারণত বজ্রপাত হয় মার্চ থেকে জুনে। জুনকে অলিখিতভাবে বজ্রপাতের মাসই মনে করা হয়। তবে সেপ্টেম্বর পর্যন্তও বজ্রপাতের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। সরকারি তথ্যমতে, দেশে গত এক দশকে বজ্রপাতে মারা গেছেন আড়াই হাজারের বেশি মানুষ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বিগত ১১ বছরে অর্থাৎ ২০১০ থেকে ২০২০ সালে দেশে বজ্রপাতে মারা গেছেন ২ হাজার ৩৭৯ জন। ২০২০ সালে বজ্রপাতে মারা গেছেন ২৯৮ জন। তবে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ২০১৮ সালে। ওই বছর মারা গেছেন ৩৫৯ জন। ২০১৭ সালে মারা গেছেন ৩০১ জন। ২০১৬ সালে ২০৫ জন, ২০১৫ সালে ১৬০ জন, ২০১৪ সালে ১৭০ জন, ২০১৩ সালে ১৮৫ জন, ২০১২ সালে ২০১ জন, ২০১১ সালে ১৭৯ জন এবং ২০১০ সালে ১২৩ জন বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করেন।

বজ্রপাতের এসব ঘটনায় দেখা যায়, মাঠে-ঘাটে কৃষক ও কর্মজীবী শ্রেণির মানুষই বেশি মারা যাচ্ছেন। বজ্রপাতের ফলে প্রাণ হারাচ্ছেন সংসারের কর্মক্ষম পুরুষ। পরিণতিতে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন সময় বজ্রপাতে হতাহতদের মধ্যে নারী বা শিশু থাকলেও কর্মক্ষম পুরুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। তারা কেউ কাজ করছিল মাঠে-খামারে, কেউ বা নৌকায় খেয়া পার হচ্ছিলেন, জেলেরা ধরছিলেন মাছ। হয়তো বা কেউ কোনো একটা গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।

এমন কর্ম-কোলাহলময় সময়ে আচমকা ঝরে গেছে অনেক প্রাণ। বাংলাদেশে গত দেড় মাসেই ১৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি বেসরকারি সংস্থা। সবমিলিয়ে মৃত্যুর এ চিত্র ভয়াবহ হলেও বজ্রপাতের তীব্রতা লাঘব কিংবা মানুষকে বজ্রপাত বিষয়ে আগাম পূর্বাভাস বা সচেতনতা সৃষ্টি করতে কী পদক্ষেপ নিয়েছি আমরা?

কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কেন আমরা আগাম ব্যবস্থা নিতে পারি না- এটাই এখন বড় প্রশ্ন। জনগণের জান ও মালের নিরাপত্তা দেওয়ার গুরুদায়িত্ব যারা কাঁধে তুলে নিয়েছেন, তাদেরই সবার আগে এ প্রশ্নের সদুত্তর দেয়া উচিত।

সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে ঘোষণা দেয়। তখন বজ্রপাতরোধে সারা দেশে ‘তালগাছ’ রোপণ কর্মসূচিও হাতে নিয়েছিল সরকার। তালগাছ খুবই ধীরগতিতে বৃদ্ধি পায়। তাই ওইসব গাছের বর্তমান কী হাল বা কতটুকু পরিণত হয়েছে, তা চোখে পড়ার মতো নয়। তালগাছ পুরোপুরি পরিণত হতে ২০-৩০ বছর পর্যন্ত লেগে যায় বিধায় এসব গাছ থেকে সুফল পেতে আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। ততদিন মানুষের প্রাণহানি থেমে থাকবে না।

তবে বজ্রপাতরোধে ‘তালগাছ’ সত্যিকার অর্থে কতটুকু ফলদায়ক, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। কারণ, বজ্রপাতরোধে এটি একটি সনাতন পদ্ধতি। আধুনিক প্রযুক্তির এ যুগে সনাতন পদ্ধতির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থেকে সারা দেশে যথাশিগ্গির আধুনিক ‘বজ্রনিরোধক পোল’ বসানো জরুরি। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতেও একসময় বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হতো।

কিন্তু তারা বজ্রনিরোধক খুঁটি বা পোল স্থাপন ও মানুষকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে এনেছে। একইসঙ্গে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছে সেসব দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশগুলোসহ পূর্ব এশিয়ায় বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা বহুলাংশে কমেছে। বিপরীতে বজ্রপাত রোধ করতে আমরা কেন শুধু তালগাছের ওপর নির্ভরশীল থাকব, ভেবে দেখার সময় এসেছে।

শিক্ষার্থী, নরসিংদী সরকারি কলেজ

tawhidbillah30086@gmail.com

প্রযুক্তিনির্ভর ‘বজ্রপাত নিরোধক’ খুঁটি স্থাপন করুন

 তৌহিদ বিল্লাহ 
১৬ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষাকাল শুরু হয়েছে। আর বর্ষাকালের সঙ্গেই রয়েছে বজ্রপাতের যোগসাজশ। বজ্রপাতে প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা কমাতে মানুষকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর বজ্রপাতের কবল থেকে রক্ষা পেতে ২০টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করছে।

এসব নির্দেশনা জানা ও মানার বিকল্প নেই। নির্দেশনাগুলোর অন্যতম হলো-বজ্রপাত হলে উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বিদ্যুৎস্পর্শের আশঙ্কা বেশি থাকে, তাই বজ্রপাতের সময় পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নিতে এবং উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকতে হবে।

এছাড়া এ সময় জানালা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলা, টিভি-ফ্রিজ না ধরা, গাড়ির ভেতর অবস্থান না করা এবং খালি পায়ে না থাকা অন্যতম। কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাত শুরুর অন্তত আধঘণ্টা সময় সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, চলতি জুন মাসের প্রথম ছয় দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ৭২ জন বাংলাদেশি! মৃত্যুর এ চিত্র নিঃসন্দেহে দুশ্চিন্তার কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জে। হাওড়াঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে থাকে।

তবে এবার খোদ রাজধানীতেও বজ্রপাতের ঘটনায় একাধিক প্রাণহানির খবর প্রকাশ পেয়েছে মিডিয়ায়। বাংলাদেশে সাধারণত বজ্রপাত হয় মার্চ থেকে জুনে। জুনকে অলিখিতভাবে বজ্রপাতের মাসই মনে করা হয়। তবে সেপ্টেম্বর পর্যন্তও বজ্রপাতের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। সরকারি তথ্যমতে, দেশে গত এক দশকে বজ্রপাতে মারা গেছেন আড়াই হাজারের বেশি মানুষ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বিগত ১১ বছরে অর্থাৎ ২০১০ থেকে ২০২০ সালে দেশে বজ্রপাতে মারা গেছেন ২ হাজার ৩৭৯ জন। ২০২০ সালে বজ্রপাতে মারা গেছেন ২৯৮ জন। তবে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ২০১৮ সালে। ওই বছর মারা গেছেন ৩৫৯ জন। ২০১৭ সালে মারা গেছেন ৩০১ জন। ২০১৬ সালে ২০৫ জন, ২০১৫ সালে ১৬০ জন, ২০১৪ সালে ১৭০ জন, ২০১৩ সালে ১৮৫ জন, ২০১২ সালে ২০১ জন, ২০১১ সালে ১৭৯ জন এবং ২০১০ সালে ১২৩ জন বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করেন।

বজ্রপাতের এসব ঘটনায় দেখা যায়, মাঠে-ঘাটে কৃষক ও কর্মজীবী শ্রেণির মানুষই বেশি মারা যাচ্ছেন। বজ্রপাতের ফলে প্রাণ হারাচ্ছেন সংসারের কর্মক্ষম পুরুষ। পরিণতিতে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন সময় বজ্রপাতে হতাহতদের মধ্যে নারী বা শিশু থাকলেও কর্মক্ষম পুরুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। তারা কেউ কাজ করছিল মাঠে-খামারে, কেউ বা নৌকায় খেয়া পার হচ্ছিলেন, জেলেরা ধরছিলেন মাছ। হয়তো বা কেউ কোনো একটা গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।

এমন কর্ম-কোলাহলময় সময়ে আচমকা ঝরে গেছে অনেক প্রাণ। বাংলাদেশে গত দেড় মাসেই ১৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি বেসরকারি সংস্থা। সবমিলিয়ে মৃত্যুর এ চিত্র ভয়াবহ হলেও বজ্রপাতের তীব্রতা লাঘব কিংবা মানুষকে বজ্রপাত বিষয়ে আগাম পূর্বাভাস বা সচেতনতা সৃষ্টি করতে কী পদক্ষেপ নিয়েছি আমরা?

কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কেন আমরা আগাম ব্যবস্থা নিতে পারি না- এটাই এখন বড় প্রশ্ন। জনগণের জান ও মালের নিরাপত্তা দেওয়ার গুরুদায়িত্ব যারা কাঁধে তুলে নিয়েছেন, তাদেরই সবার আগে এ প্রশ্নের সদুত্তর দেয়া উচিত।

সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে ঘোষণা দেয়। তখন বজ্রপাতরোধে সারা দেশে ‘তালগাছ’ রোপণ কর্মসূচিও হাতে নিয়েছিল সরকার। তালগাছ খুবই ধীরগতিতে বৃদ্ধি পায়। তাই ওইসব গাছের বর্তমান কী হাল বা কতটুকু পরিণত হয়েছে, তা চোখে পড়ার মতো নয়। তালগাছ পুরোপুরি পরিণত হতে ২০-৩০ বছর পর্যন্ত লেগে যায় বিধায় এসব গাছ থেকে সুফল পেতে আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। ততদিন মানুষের প্রাণহানি থেমে থাকবে না।

তবে বজ্রপাতরোধে ‘তালগাছ’ সত্যিকার অর্থে কতটুকু ফলদায়ক, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। কারণ, বজ্রপাতরোধে এটি একটি সনাতন পদ্ধতি। আধুনিক প্রযুক্তির এ যুগে সনাতন পদ্ধতির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থেকে সারা দেশে যথাশিগ্গির আধুনিক ‘বজ্রনিরোধক পোল’ বসানো জরুরি। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতেও একসময় বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হতো।

কিন্তু তারা বজ্রনিরোধক খুঁটি বা পোল স্থাপন ও মানুষকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে এনেছে। একইসঙ্গে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছে সেসব দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশগুলোসহ পূর্ব এশিয়ায় বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা বহুলাংশে কমেছে। বিপরীতে বজ্রপাত রোধ করতে আমরা কেন শুধু তালগাছের ওপর নির্ভরশীল থাকব, ভেবে দেখার সময় এসেছে।

শিক্ষার্থী, নরসিংদী সরকারি কলেজ

tawhidbillah30086@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন