শহিদ বুদ্ধিজীবী আবুল হাশেম সরকারের লাশও তার স্বজনরা পাননি
jugantor
শহিদ বুদ্ধিজীবী আবুল হাশেম সরকারের লাশও তার স্বজনরা পাননি

  সেলিম রেজা  

১৬ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শহিদ বুদ্ধিজীবী আবুল হাশেম সরকারের জন্ম কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর গ্রামে; ১৯৩৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর। ছিলেন তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার গাংনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের এক রাতে হানাদার বাহিনী ও দেশীয় দোসররা আত্মীয় বাড়িতে হানা দিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে খুন করে। স্ত্রী হাসিনা বেগম ও স্বজনরা তার লাশও খুঁজে পাননি আর।

মেধাবী শিক্ষক আবুল হাশেম সরকার এসএসসি থেকে এমএড (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) পর্যন্ত সব পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। তৎকালীন কুষ্টিয়া কলেজের (১৯৫২-৫৬) ছাত্র থাকাকালীন সর্বত্র ‘ব্লাক জুয়েল’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগেও কিছুদিন (১৯৫৭) পড়ালেখা করেন। আবুল হাশের সরকার ১৯৫৭-১৯৭১ সময়ে বাগোয়ান কেসিভিএন স্কুল (কুষ্টিয়া), শাহীন স্কুল (ঢাকা), তুজুলপুর হাইস্কুল (সাতক্ষীরা) এবং আজিমপুর গার্লস স্কুলে (ঢাকা) শিক্ষকতা করে প্রশংসিত হন।

মেহেরপুরের গাংনী থানা শহরবাসীর অনুরোধে আবুল হাশেম সরকার দুবার (১৯৬২ থেকে ১৯৬৬), (১৯৬৬ থেকে ১৯৭১) গাংনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বিবেকি এবং মেধাবী প্রধান শিক্ষক হিসাবে তার সুনাম এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আবুল হাশেম সরকার তখন স্বাধীনতার পক্ষে খুব সোচ্চার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এলাকার ছাত্র-যুবকদের ডেকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বোঝাতে থাকেন। বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান দিয়ে এবং সংবাদপত্রের খবরের উদ্বৃতি দিয়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে যুবকদের উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। এজন্য তিনি ৭১ এর জুলাই-আগস্টে সীমান্ত এলাকা পার হয়ে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় যান। সেখানে যুদ্ধ এবং শরণার্থী নিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সঙ্গে ছিলেন তারই ভগ্নিপতি আরেক শহিদ শিক্ষক হাফিজ উদ্দিন বিশ্বাস। ভারত থেকে এসে আবুল হাশেম সরকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জোর তৎপরতা চালাতে থাকেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের এবং সাধারণ যুবকদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

এদিকে শত্রুরাও থেমে থাকেনি। এলাকার পিস কমিটির প্ররোচনায় তৈরি হত্যা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয় আবুল হাশেম সরকারের। অবশেষে আসে ’৭১-এর ১৫ আগস্টের গভীর রাত। স্থানটি ছিল গাংনী থানার চৌগাছা গ্রাম। তখন আবুল হাশেম সরকারের ভগ্নিপতি হাফিজ উদ্দিনের বাড়িতে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-পরিকল্পনা চলছিল। হঠাৎ সেখানে হানাদার বাহিনীর গাড়ি এসে হাজির। পাকিস্তানি সৈন্য ও স্থানীয় কয়েকজন রাজাকার গাড়ি থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকে আবুল হাশেম সরকার ও হাফিজ উদ্দিন বিশ্বাসের চোখ বেঁধে ফেলে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়িতে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই ছিল আবুল হাশেম সরকারের শেষযাত্রা। আর তিনি ফিরে আসেননি স্বজনদের কাছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো বটে; কিন্তু নির্ভীক, দেশপ্রেমিক, শিক্ষক আবুল হাশেম সরকার সেই স্বাধীনতার আস্বাদন নিতে পারলেন না। স্ত্রী হাসিনা বেগম ও তার সন্তানরা শহিদ বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক আবুল হাশেম সরকারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান। চান শত্রুদের উপযুক্ত শাস্তি।

কবি, লেখক, অধ্যাপক রফিকুর রশীদ রচিত ‘মেহেরপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থে (২০০৯) শহিদ আবুল হাশেম সরকারের কথা লিপিবদ্ধ আছে। ১৯৯৫ সালে গাংনী হাইস্কুলের সুবর্ণজয়ন্তীতে এ গুণী শিক্ষককে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হয়। সুবর্ণজয়ন্তী স্মরণিকা ‘উত্তরাধিকার’-এ গুণী শিক্ষককে উৎসর্গ করা হয়। ২০১১ সালে কুষ্টিয়ার ‘স্বনির্ভরতায় আশার আলো মুক্তিযোদ্ধা বহুমুখী (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল অনুমোদিত) সমবায় সমিতি’ তাকে শহিদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা প্রদান করে। এছাড়াও ২০১৫ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক, লে. কর্নেল কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক বাংলাদেশ টেলিভিশনে এ গুণী শহিদ শিক্ষককে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করেন। কুষ্টিয়ার পরিচিত মুখ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক মো. মাহাতাব উদ্দিন সরকার আবুল হাশেম সরকারের সহোদর।

প্রাবন্ধিক

শহিদ বুদ্ধিজীবী আবুল হাশেম সরকারের লাশও তার স্বজনরা পাননি

 সেলিম রেজা 
১৬ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শহিদ বুদ্ধিজীবী আবুল হাশেম সরকারের জন্ম কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর গ্রামে; ১৯৩৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর। ছিলেন তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার গাংনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের এক রাতে হানাদার বাহিনী ও দেশীয় দোসররা আত্মীয় বাড়িতে হানা দিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে খুন করে। স্ত্রী হাসিনা বেগম ও স্বজনরা তার লাশও খুঁজে পাননি আর।

মেধাবী শিক্ষক আবুল হাশেম সরকার এসএসসি থেকে এমএড (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) পর্যন্ত সব পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। তৎকালীন কুষ্টিয়া কলেজের (১৯৫২-৫৬) ছাত্র থাকাকালীন সর্বত্র ‘ব্লাক জুয়েল’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগেও কিছুদিন (১৯৫৭) পড়ালেখা করেন। আবুল হাশের সরকার ১৯৫৭-১৯৭১ সময়ে বাগোয়ান কেসিভিএন স্কুল (কুষ্টিয়া), শাহীন স্কুল (ঢাকা), তুজুলপুর হাইস্কুল (সাতক্ষীরা) এবং আজিমপুর গার্লস স্কুলে (ঢাকা) শিক্ষকতা করে প্রশংসিত হন।

মেহেরপুরের গাংনী থানা শহরবাসীর অনুরোধে আবুল হাশেম সরকার দুবার (১৯৬২ থেকে ১৯৬৬), (১৯৬৬ থেকে ১৯৭১) গাংনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বিবেকি এবং মেধাবী প্রধান শিক্ষক হিসাবে তার সুনাম এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আবুল হাশেম সরকার তখন স্বাধীনতার পক্ষে খুব সোচ্চার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এলাকার ছাত্র-যুবকদের ডেকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বোঝাতে থাকেন। বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান দিয়ে এবং সংবাদপত্রের খবরের উদ্বৃতি দিয়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে যুবকদের উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। এজন্য তিনি ৭১ এর জুলাই-আগস্টে সীমান্ত এলাকা পার হয়ে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় যান। সেখানে যুদ্ধ এবং শরণার্থী নিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সঙ্গে ছিলেন তারই ভগ্নিপতি আরেক শহিদ শিক্ষক হাফিজ উদ্দিন বিশ্বাস। ভারত থেকে এসে আবুল হাশেম সরকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জোর তৎপরতা চালাতে থাকেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের এবং সাধারণ যুবকদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

এদিকে শত্রুরাও থেমে থাকেনি। এলাকার পিস কমিটির প্ররোচনায় তৈরি হত্যা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয় আবুল হাশেম সরকারের। অবশেষে আসে ’৭১-এর ১৫ আগস্টের গভীর রাত। স্থানটি ছিল গাংনী থানার চৌগাছা গ্রাম। তখন আবুল হাশেম সরকারের ভগ্নিপতি হাফিজ উদ্দিনের বাড়িতে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-পরিকল্পনা চলছিল। হঠাৎ সেখানে হানাদার বাহিনীর গাড়ি এসে হাজির। পাকিস্তানি সৈন্য ও স্থানীয় কয়েকজন রাজাকার গাড়ি থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকে আবুল হাশেম সরকার ও হাফিজ উদ্দিন বিশ্বাসের চোখ বেঁধে ফেলে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়িতে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই ছিল আবুল হাশেম সরকারের শেষযাত্রা। আর তিনি ফিরে আসেননি স্বজনদের কাছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো বটে; কিন্তু নির্ভীক, দেশপ্রেমিক, শিক্ষক আবুল হাশেম সরকার সেই স্বাধীনতার আস্বাদন নিতে পারলেন না। স্ত্রী হাসিনা বেগম ও তার সন্তানরা শহিদ বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক আবুল হাশেম সরকারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান। চান শত্রুদের উপযুক্ত শাস্তি।

কবি, লেখক, অধ্যাপক রফিকুর রশীদ রচিত ‘মেহেরপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থে (২০০৯) শহিদ আবুল হাশেম সরকারের কথা লিপিবদ্ধ আছে। ১৯৯৫ সালে গাংনী হাইস্কুলের সুবর্ণজয়ন্তীতে এ গুণী শিক্ষককে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হয়। সুবর্ণজয়ন্তী স্মরণিকা ‘উত্তরাধিকার’-এ গুণী শিক্ষককে উৎসর্গ করা হয়। ২০১১ সালে কুষ্টিয়ার ‘স্বনির্ভরতায় আশার আলো মুক্তিযোদ্ধা বহুমুখী (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল অনুমোদিত) সমবায় সমিতি’ তাকে শহিদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা প্রদান করে। এছাড়াও ২০১৫ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক, লে. কর্নেল কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক বাংলাদেশ টেলিভিশনে এ গুণী শহিদ শিক্ষককে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করেন। কুষ্টিয়ার পরিচিত মুখ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক মো. মাহাতাব উদ্দিন সরকার আবুল হাশেম সরকারের সহোদর।

প্রাবন্ধিক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন