পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী ৮৩ শতাংশই শিশু
jugantor
পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী ৮৩ শতাংশই শিশু

  আহসানুল হক অর্ক  

২৩ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাকালীন নানা আতঙ্কের মধ্যে প্রায়ই পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা, ডায়রিয়া, নানা প্রকার সংক্রামক রোগের পাশাপাশি ইদানীং আশঙ্কাজনক হারে মানুষের মৃত্যু ঘটছে বজ্রপাতেও। একটা বিদেশি প্রবাদ আছে-‘পৃথিবীতে প্রবেশের পথ একটি হলেও প্রস্থানের পথ অনেক।’ স্বাভাবিকভাবেই নানা কারণে, নানাভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে দেশে খুনখারাবির অন্ত নেই। তা সত্ত্বেও কেন পানিতে ডুবে মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে ভাবা-এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। এর উত্তরে বলা যেতে পারে-পানিতে ডুবে এদেশে শিশুমৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। হাওড়-বাঁওড়-নদী-নালা-পুকুরের দেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুই আশ্চর্যজনক প্রসঙ্গই বটে। এক্ষেত্রে যে কথাটি না বললেই নয়, তা হলো আমাদের উদাসীনতা। পুকুরে ডুবে বেশিরভাগ শিশুমৃত্যুর নেপথ্য কারণ উদাসীন মনোভাব। সেই মনোভাবের জায়গাটিতে সচেতনতা তৈরিই জন্যই কিছু তথ্য সবার সঙ্গে শেয়ার করা প্রয়াসে এই ছোট্ট নিবন্ধ। আশা করি, তথ্যগুলো আমাদের সচেতন করবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ বছরের কমবয়সী শিশুমৃত্যুর ৪৩ শতাংশের কারণ পানিতে ডুবে মারা যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অফ হেল্থ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই)-এর ২০১৭ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ স্টাডি শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ১৪ হাজার ২৯ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায় বলে উল্লেখ করা হয়। এ রিপোর্ট অনুযায়ী পানিতে ডুবে মৃত্যুর দিক থেকে কমনওয়েল্থ দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।

জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ের অনলাইন নিউজ পোর্টালে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ৫৭৯টি পানি সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার কথা প্রকাশিত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা ৮০৮ শিশুসহ মোট ৯৬৮। প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, ২১১ জন। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৪ জন, রংপুরে ১৪৩, রাজশাহীতে ১২১, ময়মনসিংহে ১০৬, বরিশালে ৮৩ ও খুলনা বিভাগে ৭২ জন মারা গেছে। উক্ত সময়কালে সবচেয়ে কম মৃত্যু ছিল সিলেট বিভাগে, ৪৮ জন।

পানিতে ডুবে মারা যাওয়াদের ৮৩ শতাংশই শিশু। এর মধ্যে ৪ বছর বা এর চেয়েও কম বয়সী ৩৪৮ জন, ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী ৩০৮ জন, ৯ থেকে ১৪ বছরের ১২০ জন এবং ১৫ থেকে ১৮ বছরের ৩২ জন। আর ১৬০ জনের বয়স ১৮ বছরের বেশি। পানিতে ডুবে মৃতদের মধ্যে ৩৫২ জন নারী। এদের মধ্যে কন্যাশিশু ৩১৯ জন। আর মৃত ৬১০ পুরুষের মধ্যে ৪৮৩ জনই শিশু। প্রকাশিত সংবাদ থেকে ছয় জনের লৈঙ্গিক পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সংবাদ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পানিতে ডুবে দিনের প্রথমভাগে অর্থাৎ সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে ৩৯৪ জন এবং দুপুর থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ৩৮৮ জন মারা গেছে। সন্ধ্যায় ১৫৪ জন মারা গেছে। ২০ জন রাতের বেলায় পানিতে ডুবেছে। এর বাইরে ১২ জনের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সময়কাল প্রকাশিত সংবাদ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত ১৫ মাসের মধ্যে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যক ৫৭৭ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে আগস্ট মাসে; এ মাসে মারা গেছে ১৭১ জন। এছাড়া জুন মাসে ৯১ জন ও জুলাই মাসে ১৬৩ জন মারা গেছে। ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ৫৯ জনের মৃত্যুর বিপরীতে ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে পানিতে ডুবে মারা যায় ১৫৮ জন, যা গত বছরের ওই সময়ের তুলনায় ১৬৮ শতাংশ বেশি। ফলে এটা স্পষ্ট যে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা আরো বেড়েছে অথবা গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত ঘটনার সংবাদ আগের তুলনায় বেড়েছে।

আলোচ্য ১৫ মাসে ৭৮৩ জন কোনো না কোনোভাবে পানির সংস্পর্শে আসার পর ডুবে যায়। এর মধ্যে ১১৮ জন মারা গেছে নৌযান দুর্ঘটনায়। প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বন্যার পানিতে ডুবে। মূলত পরিবারের সদস্যদের যথাযথ নজরদারি না থাকার কারণে পানিতে ডোবার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে থাকে। দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশু বড়দের অগোচরে বাড়ি সংলগ্ন পুকুর বা অন্যান্য জলাশয়ে চলে যাওয়ার পর দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে প্রকাশিত প্রিভেন্টিং ড্রাউনিং : অ্যান ইমপ্লিমেন্টেশন গাইডে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্য রোধে স্থানীয় পর্যায়ের মানুষজনকে সম্পৃক্ত করে দিবাযত্ন কেন্দ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি ও জাতীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থী, এআইইউবি, ঢাকা

পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী ৮৩ শতাংশই শিশু

 আহসানুল হক অর্ক 
২৩ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাকালীন নানা আতঙ্কের মধ্যে প্রায়ই পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা, ডায়রিয়া, নানা প্রকার সংক্রামক রোগের পাশাপাশি ইদানীং আশঙ্কাজনক হারে মানুষের মৃত্যু ঘটছে বজ্রপাতেও। একটা বিদেশি প্রবাদ আছে-‘পৃথিবীতে প্রবেশের পথ একটি হলেও প্রস্থানের পথ অনেক।’ স্বাভাবিকভাবেই নানা কারণে, নানাভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে দেশে খুনখারাবির অন্ত নেই। তা সত্ত্বেও কেন পানিতে ডুবে মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে ভাবা-এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। এর উত্তরে বলা যেতে পারে-পানিতে ডুবে এদেশে শিশুমৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। হাওড়-বাঁওড়-নদী-নালা-পুকুরের দেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুই আশ্চর্যজনক প্রসঙ্গই বটে। এক্ষেত্রে যে কথাটি না বললেই নয়, তা হলো আমাদের উদাসীনতা। পুকুরে ডুবে বেশিরভাগ শিশুমৃত্যুর নেপথ্য কারণ উদাসীন মনোভাব। সেই মনোভাবের জায়গাটিতে সচেতনতা তৈরিই জন্যই কিছু তথ্য সবার সঙ্গে শেয়ার করা প্রয়াসে এই ছোট্ট নিবন্ধ। আশা করি, তথ্যগুলো আমাদের সচেতন করবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ বছরের কমবয়সী শিশুমৃত্যুর ৪৩ শতাংশের কারণ পানিতে ডুবে মারা যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অফ হেল্থ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই)-এর ২০১৭ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ স্টাডি শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ১৪ হাজার ২৯ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায় বলে উল্লেখ করা হয়। এ রিপোর্ট অনুযায়ী পানিতে ডুবে মৃত্যুর দিক থেকে কমনওয়েল্থ দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।

জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ের অনলাইন নিউজ পোর্টালে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ৫৭৯টি পানি সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার কথা প্রকাশিত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা ৮০৮ শিশুসহ মোট ৯৬৮। প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, ২১১ জন। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৪ জন, রংপুরে ১৪৩, রাজশাহীতে ১২১, ময়মনসিংহে ১০৬, বরিশালে ৮৩ ও খুলনা বিভাগে ৭২ জন মারা গেছে। উক্ত সময়কালে সবচেয়ে কম মৃত্যু ছিল সিলেট বিভাগে, ৪৮ জন।

পানিতে ডুবে মারা যাওয়াদের ৮৩ শতাংশই শিশু। এর মধ্যে ৪ বছর বা এর চেয়েও কম বয়সী ৩৪৮ জন, ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী ৩০৮ জন, ৯ থেকে ১৪ বছরের ১২০ জন এবং ১৫ থেকে ১৮ বছরের ৩২ জন। আর ১৬০ জনের বয়স ১৮ বছরের বেশি। পানিতে ডুবে মৃতদের মধ্যে ৩৫২ জন নারী। এদের মধ্যে কন্যাশিশু ৩১৯ জন। আর মৃত ৬১০ পুরুষের মধ্যে ৪৮৩ জনই শিশু। প্রকাশিত সংবাদ থেকে ছয় জনের লৈঙ্গিক পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সংবাদ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পানিতে ডুবে দিনের প্রথমভাগে অর্থাৎ সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে ৩৯৪ জন এবং দুপুর থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ৩৮৮ জন মারা গেছে। সন্ধ্যায় ১৫৪ জন মারা গেছে। ২০ জন রাতের বেলায় পানিতে ডুবেছে। এর বাইরে ১২ জনের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সময়কাল প্রকাশিত সংবাদ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত ১৫ মাসের মধ্যে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যক ৫৭৭ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে আগস্ট মাসে; এ মাসে মারা গেছে ১৭১ জন। এছাড়া জুন মাসে ৯১ জন ও জুলাই মাসে ১৬৩ জন মারা গেছে। ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ৫৯ জনের মৃত্যুর বিপরীতে ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে পানিতে ডুবে মারা যায় ১৫৮ জন, যা গত বছরের ওই সময়ের তুলনায় ১৬৮ শতাংশ বেশি। ফলে এটা স্পষ্ট যে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা আরো বেড়েছে অথবা গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত ঘটনার সংবাদ আগের তুলনায় বেড়েছে।

আলোচ্য ১৫ মাসে ৭৮৩ জন কোনো না কোনোভাবে পানির সংস্পর্শে আসার পর ডুবে যায়। এর মধ্যে ১১৮ জন মারা গেছে নৌযান দুর্ঘটনায়। প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বন্যার পানিতে ডুবে। মূলত পরিবারের সদস্যদের যথাযথ নজরদারি না থাকার কারণে পানিতে ডোবার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে থাকে। দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশু বড়দের অগোচরে বাড়ি সংলগ্ন পুকুর বা অন্যান্য জলাশয়ে চলে যাওয়ার পর দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে প্রকাশিত প্রিভেন্টিং ড্রাউনিং : অ্যান ইমপ্লিমেন্টেশন গাইডে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্য রোধে স্থানীয় পর্যায়ের মানুষজনকে সম্পৃক্ত করে দিবাযত্ন কেন্দ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি ও জাতীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থী, এআইইউবি, ঢাকা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন