নির্মোহ ম্যাজিস্ট্রেসি
jugantor
নির্মোহ ম্যাজিস্ট্রেসি

  জিয়া হাবীব আহসান  

০১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৫ আগস্ট বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক নেত্রকোনায় দুটি শিশুকে দণ্ড প্রদান ও হাইকোর্টের নির্দেশে ওই দুজনকে মুক্তি প্রদানের ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর আগেও বেশ কয়েকবার দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ছাগলকে দণ্ড প্রদান, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কয়েকদিন পরে পুলিশ কর্তৃক ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপিত আসামিকে দণ্ড প্রদান, অপরাধ স্থলে না গিয়ে চেম্বারে বসে দণ্ড প্রদান ইত্যাদি ঘটনা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ প্রেক্ষাপটে এমন একজন ম্যাজিস্ট্রেট সম্পর্কে লিখছি, যার ম্যাজিস্ট্রেসি দক্ষতা ও নৈপুণ্য অসাধারণ, অনুসরণীয়, অনুকরণীয় এবং মোবাইল কোর্টের আইন প্রয়োগে যিনি ছিলেন নির্মোহ, নৈর্ব্যক্তিক ও নিরপেক্ষ। তিনি হচ্ছেন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। আমার জানামতে, তার নেতৃত্বে অন্তত ৮/১০ হাজার মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। অথচ তার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটিও রিট হয়নি। তার নির্ভুল আইন প্রয়োগের কারণে দণ্ডিতরা কোনো আদালতে যাওয়ার সাহস পাননি; বরং জেলা ও মহানগর দায়রা জজ আদালতে তার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রিভিশনগুলোর সবকটিতে তার আদেশ অপরিবর্তিত রেখেছিলেন বিজ্ঞ জজ সাহেবরা।

মোবাইল কোর্টের সংখ্যা, দণ্ডিত অপরাধীর সংখ্যা এবং জরিমানার অঙ্কে আমার জানামতে, তিনি বাংলাদেশে সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। তার পেছনে অনেক ভয়ংকর শত্রু ছিল। অনেক হুমকি ছিল; কিন্তু কখনো তিনি মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না। চট্টগ্রামে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শক্তহাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী তাকে ‘Tiger of ctg’ নামে অভিহিত করতেন। বড় বড় দুর্নীতি উদঘাটন এবং রাঘববোয়াল ধরতে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। আমার বিশ্বাস, এক্ষেত্রে শুধু সততাই তার সম্বল ছিল না; সততার সঙ্গে অসাধারণ সাহস, কর্মদক্ষতা অর্থাৎ তাৎক্ষণিক মাঠে তথা অপরাধস্থলে ঝাঁপিয়ে পড়ার দুর্দমনীয় সাহস, সর্বোপরি গভীর কর্তব্যনিষ্ঠাই ছিল মুনীর চৌধুরীর প্রেরণা।

তাকে দেখেছি, বড় বড় শিল্প-কারখানায় গ্যাস চুরি, ভেজাল ও নকল ওষুধের ব্যবসা, যান চলাচলে বিশৃঙ্খলা, ওয়াসার পানি চুরি, অপচয় ও রাজস্ব ফাঁকি, বিদ্যুৎ চুরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, খাদ্যে ভেজাল, জনস্বার্থবিরোধী অবৈধ ব্যবসা, নগরজুড়ে ভয়াবহ দূষণ, পাহাড় কাটা, নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবসা, কর্ণফুলী নদীতে বেআইনি মৎস্য সম্পদ আহরণ, নগরীর রাস্তা-ঘাট, খাল-নালা-নর্দমা ও ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানে নেমে সরকারের বহু সেক্টর ও নাগরিকদের জীবনমানে বিশাল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন। চট্টগ্রামের রাজপথে, অলিগলিতে, পাহাড়ে, সমুদ্রে, মহল্লায় ও ভবনে নানা অপরাধ নির্মূলে ঝড়, বৃষ্টি ও রোদ উপেক্ষা করে অকুস্থলে ছুটে যেতেন তিনি। তার বিরামহীন অভিযানে চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ ও সংস্থাগুলোর রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি অপরাধও নিয়ন্ত্রণে এসেছিল।

ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাকে নিঃস্বার্থভাবে ও জনকল্যাণে প্রয়োগ করার যে দৃষ্টান্ত ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর দেখিয়েছেন, বর্তমান প্রজন্মের ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে তা মডেল হিসাবে তুলে ধরা উচিত। বস্তুত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় প্রয়োজন প্রচুর অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, যার অভাবে এ কার্যক্রম জনসাধারণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

আইনজীবী, পরিবেশ এবং মানবাধিকার কর্মী

নির্মোহ ম্যাজিস্ট্রেসি

 জিয়া হাবীব আহসান 
০১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৫ আগস্ট বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক নেত্রকোনায় দুটি শিশুকে দণ্ড প্রদান ও হাইকোর্টের নির্দেশে ওই দুজনকে মুক্তি প্রদানের ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর আগেও বেশ কয়েকবার দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ছাগলকে দণ্ড প্রদান, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কয়েকদিন পরে পুলিশ কর্তৃক ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপিত আসামিকে দণ্ড প্রদান, অপরাধ স্থলে না গিয়ে চেম্বারে বসে দণ্ড প্রদান ইত্যাদি ঘটনা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ প্রেক্ষাপটে এমন একজন ম্যাজিস্ট্রেট সম্পর্কে লিখছি, যার ম্যাজিস্ট্রেসি দক্ষতা ও নৈপুণ্য অসাধারণ, অনুসরণীয়, অনুকরণীয় এবং মোবাইল কোর্টের আইন প্রয়োগে যিনি ছিলেন নির্মোহ, নৈর্ব্যক্তিক ও নিরপেক্ষ। তিনি হচ্ছেন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। আমার জানামতে, তার নেতৃত্বে অন্তত ৮/১০ হাজার মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। অথচ তার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটিও রিট হয়নি। তার নির্ভুল আইন প্রয়োগের কারণে দণ্ডিতরা কোনো আদালতে যাওয়ার সাহস পাননি; বরং জেলা ও মহানগর দায়রা জজ আদালতে তার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রিভিশনগুলোর সবকটিতে তার আদেশ অপরিবর্তিত রেখেছিলেন বিজ্ঞ জজ সাহেবরা।

মোবাইল কোর্টের সংখ্যা, দণ্ডিত অপরাধীর সংখ্যা এবং জরিমানার অঙ্কে আমার জানামতে, তিনি বাংলাদেশে সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। তার পেছনে অনেক ভয়ংকর শত্রু ছিল। অনেক হুমকি ছিল; কিন্তু কখনো তিনি মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না। চট্টগ্রামে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শক্তহাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী তাকে ‘Tiger of ctg’ নামে অভিহিত করতেন। বড় বড় দুর্নীতি উদঘাটন এবং রাঘববোয়াল ধরতে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। আমার বিশ্বাস, এক্ষেত্রে শুধু সততাই তার সম্বল ছিল না; সততার সঙ্গে অসাধারণ সাহস, কর্মদক্ষতা অর্থাৎ তাৎক্ষণিক মাঠে তথা অপরাধস্থলে ঝাঁপিয়ে পড়ার দুর্দমনীয় সাহস, সর্বোপরি গভীর কর্তব্যনিষ্ঠাই ছিল মুনীর চৌধুরীর প্রেরণা।

তাকে দেখেছি, বড় বড় শিল্প-কারখানায় গ্যাস চুরি, ভেজাল ও নকল ওষুধের ব্যবসা, যান চলাচলে বিশৃঙ্খলা, ওয়াসার পানি চুরি, অপচয় ও রাজস্ব ফাঁকি, বিদ্যুৎ চুরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, খাদ্যে ভেজাল, জনস্বার্থবিরোধী অবৈধ ব্যবসা, নগরজুড়ে ভয়াবহ দূষণ, পাহাড় কাটা, নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবসা, কর্ণফুলী নদীতে বেআইনি মৎস্য সম্পদ আহরণ, নগরীর রাস্তা-ঘাট, খাল-নালা-নর্দমা ও ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানে নেমে সরকারের বহু সেক্টর ও নাগরিকদের জীবনমানে বিশাল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন। চট্টগ্রামের রাজপথে, অলিগলিতে, পাহাড়ে, সমুদ্রে, মহল্লায় ও ভবনে নানা অপরাধ নির্মূলে ঝড়, বৃষ্টি ও রোদ উপেক্ষা করে অকুস্থলে ছুটে যেতেন তিনি। তার বিরামহীন অভিযানে চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ ও সংস্থাগুলোর রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি অপরাধও নিয়ন্ত্রণে এসেছিল।

ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাকে নিঃস্বার্থভাবে ও জনকল্যাণে প্রয়োগ করার যে দৃষ্টান্ত ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর দেখিয়েছেন, বর্তমান প্রজন্মের ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে তা মডেল হিসাবে তুলে ধরা উচিত। বস্তুত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় প্রয়োজন প্রচুর অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, যার অভাবে এ কার্যক্রম জনসাধারণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

আইনজীবী, পরিবেশ এবং মানবাধিকার কর্মী

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন