আয় বাড়ানো গেলে হতদরিদ্রদের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে না
jugantor
আয় বাড়ানো গেলে হতদরিদ্রদের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে না

  ড. মো. রওশন কামাল  

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৮৪-৮৫ সালে শ্রীলংকার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেখানকার দক্ষিণ প্রদেশের শিল্পোন্নয়ন উপদেষ্টা হয়ে যাই। তখন শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন প্রেমাদাসা। তিনি বললেন-‘২০০০ সালের মধ্যে সবার বাসস্থান’ চাই। যেমন কথা তেমন কাজ।

আমি যখন গেলাম আমার কর্মস্থলে-ভারত মহাসাগরের তীরে শ্রীলংকার সর্ব দক্ষিণে গল অঞ্চলে। প্রথমদিকে নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে দেখতে শুরু করলাম এবং সাধারণভাবে যারা দরিদ্র, তাদের বাড়ির সম্মুখে দেখতে পেলাম স্তূপ করে রাখা আছে ইট, বালু, সিমেন্টের বস্তা, রড-অর্থাৎ বাড়ি করার জন্য যেসব উপকরণ দরকার, সবই জড়ো করে রাখা। আনন্দ পেলাম-রাষ্ট্রপতির কথামতো কাজ হচ্ছে দেখে।

এর ১০-১৫ দিন পরে ওই এলাকায় গিয়ে দেখলাম, ওইসব মাল-মসলার কোনো অস্তিত্ব নেই। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হলো-নতুন বাড়িও নেই আর ইট, বালুর অস্তিত্বও নেই? হাসতে হাসতে সে বলল-আগে পেট, তাই ওইগুলো বিক্রি করে পেটের ক্ষুধা নিবারণ করেছি। বুঝতে পারলাম-মানুষের আয় না বাড়াতে পারলে সবার জন্য বাসস্থান প্রকল্প সফল করা সম্ভব নয়। সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড করতে দেওয়ার অনুমতি চাইলাম। টাকা ছিল প্রজেক্টে, তাই তারা রাজি হয়ে গেলেন।

আসলে হতদরিদ্রদের ক্ষেত্রে যদি আয়ের পথ বের করে আয় বাড়ানো যায়, তবে তেমন একটা সাহায্যের দরকার হয় না। তারা নিজেরাই নিজের মতো বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে। এ কাজ করেছিলাম প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এরশাদের আদর্শ গ্রাম প্রকল্পে। তখন ছিলাম ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নানা জায়গায় আদর্শ গ্রাম প্রকল্পের বাসিন্দাদের আয় বাড়ানোর কাজ নিয়ে। সফল হয়েছি কিনা, তা দেখার আগেই অন্য প্রকল্পের অন্য কাজে যোগ দিয়েছিলাম। তবে এ কথা ঠিক, ভিক্ষা করার চেয়ে নিজের মতো করে কাজ করার আনন্দই আলাদা।

আয়বর্ধক বা শ্রমিকদের আয় বাড়ানোর আরও পথ আছে। যখন শ্রীলংকা যাই, তখন জানতে পারলাম-১৯৯৫ সালে শ্রীলংকা থেকে তিন লাখ গৃহকর্মী বা হাউসমেড বিদেশে পাঠানো হবে। মজার ব্যাপার হলো, হাউসমেড বেতন পায় মাসে একশ’ ডলার; কিন্তু যদি হাউসকিপার পাঠানো যায়, তবে তারা মাসে দুইশ ডলার পাবে। সঙ্গে সঙ্গে ওখানকার শ্রীলংকান বন্ধুদের বললাম, ওই প্রকল্পের প্রধানের সঙ্গে আমার দেখা করার ব্যবস্থা করতে।

হয়ে গেল এবং সেই প্রধানকে (এক কর্নেল) বললাম, পয়সা আমার কাছে আছে। আমি এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণে বিদেশে পাঠানোর কর্মীদের ‘হাউসকিপার’-এ পরিণত করব। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। আমার এলাকাভুক্ত তিন জেলা-গল, মাতারা ও হামবানটোটার মধ্যে আমি গলে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে আধুনিক বাড়ি ও জীবনধারার জন্য প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি বসালাম-যেমন, ওয়াটার হিটার, এয়ারকুলার, এয়ারকন্ডিশনার ইত্যাদি। যারা বিদেশে যেতে চায়, তাদের প্রজেক্টের পয়সায় ৩-৬ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলাম। সে সময় শ্রীলংকার শ্রমমন্ত্রী ছিলেন এখনকার প্রধানমন্ত্রী মহেন্দ্র রাজা পাকসে। তিনি এত উৎসাহী হলেন; আমাকে বললেন-এক জেলায় কেন, আরও দুজেলায় শুরু করুন। আমিও তো তাই চাই; হয়ে গেল। মোটকথা, কাজ করে উপার্জন, দান গ্রহণ থেকে অনেক ভালো।

অনেক আগে জাপানে প্রায় ৭ বছর থাকার পর দেশে ফিরলে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন থেকে বগুড়ায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমি কিছু কাজ করার জন্য বলল। তখন সেখানকার প্রকল্প প্রধানের সঙ্গে আলাপ করে ঠিক করলাম, লোকজনের যা বিদ্যার দৌড়, তাতে তারা মাটি কাটা, গাছ কাটা-এসব পারবে; তারপরও ভিক্ষার চেয়ে কাজ ভালো। আরও কিছু কাজের কথা বলি। যখন ইইউ প্রকল্পে রংপুরে ছিলাম, তখন নতুন কিছু কাজ করেছি; যেমন-ভুট্টা চাষ। তবে এখানে এক সমস্যায় পড়লাম। গ্রামবাসী ভুট্টা চাষ করতে রাজি হলো; তবে শর্ত দিল-ভুট্টা আমাকে বিক্রি করতে হবে।

চাষ হলো গাছভর্তি ঝুমঝুম ভুট্টা; কিন্তু তারা বেচে না। কেননা, আমি বিক্রি করার ভার নিয়েছি। ফলে দুটাকা করে কিনে ৫০ পয়সা করে আমার বাবুর্চি দিয়ে বিক্রি করলাম। ক্ষতিটা প্রকল্প মেটাল। এর ফলে হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগলের খাবারের জন্য স্বাভাবিকভাবে ভুট্টা চাষ শুরু হলো। সেখানে পেঁপে চাষ শুরু করলাম।

আরও করেছি বাঁশ-বেতের কাজ। ঢাকা থেকে প্রশিক্ষক এনে ৪০/৫০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের উৎপাদিত জিনিস আবার ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। আসলে যোগ্য কাজ দিলে গ্রামের লোকেরা তা করে।

ঢাকা

আয় বাড়ানো গেলে হতদরিদ্রদের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে না

 ড. মো. রওশন কামাল 
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৮৪-৮৫ সালে শ্রীলংকার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেখানকার দক্ষিণ প্রদেশের শিল্পোন্নয়ন উপদেষ্টা হয়ে যাই। তখন শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন প্রেমাদাসা। তিনি বললেন-‘২০০০ সালের মধ্যে সবার বাসস্থান’ চাই। যেমন কথা তেমন কাজ।

আমি যখন গেলাম আমার কর্মস্থলে-ভারত মহাসাগরের তীরে শ্রীলংকার সর্ব দক্ষিণে গল অঞ্চলে। প্রথমদিকে নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে দেখতে শুরু করলাম এবং সাধারণভাবে যারা দরিদ্র, তাদের বাড়ির সম্মুখে দেখতে পেলাম স্তূপ করে রাখা আছে ইট, বালু, সিমেন্টের বস্তা, রড-অর্থাৎ বাড়ি করার জন্য যেসব উপকরণ দরকার, সবই জড়ো করে রাখা। আনন্দ পেলাম-রাষ্ট্রপতির কথামতো কাজ হচ্ছে দেখে।

এর ১০-১৫ দিন পরে ওই এলাকায় গিয়ে দেখলাম, ওইসব মাল-মসলার কোনো অস্তিত্ব নেই। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হলো-নতুন বাড়িও নেই আর ইট, বালুর অস্তিত্বও নেই? হাসতে হাসতে সে বলল-আগে পেট, তাই ওইগুলো বিক্রি করে পেটের ক্ষুধা নিবারণ করেছি। বুঝতে পারলাম-মানুষের আয় না বাড়াতে পারলে সবার জন্য বাসস্থান প্রকল্প সফল করা সম্ভব নয়। সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড করতে দেওয়ার অনুমতি চাইলাম। টাকা ছিল প্রজেক্টে, তাই তারা রাজি হয়ে গেলেন।

আসলে হতদরিদ্রদের ক্ষেত্রে যদি আয়ের পথ বের করে আয় বাড়ানো যায়, তবে তেমন একটা সাহায্যের দরকার হয় না। তারা নিজেরাই নিজের মতো বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে। এ কাজ করেছিলাম প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এরশাদের আদর্শ গ্রাম প্রকল্পে। তখন ছিলাম ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নানা জায়গায় আদর্শ গ্রাম প্রকল্পের বাসিন্দাদের আয় বাড়ানোর কাজ নিয়ে। সফল হয়েছি কিনা, তা দেখার আগেই অন্য প্রকল্পের অন্য কাজে যোগ দিয়েছিলাম। তবে এ কথা ঠিক, ভিক্ষা করার চেয়ে নিজের মতো করে কাজ করার আনন্দই আলাদা।

আয়বর্ধক বা শ্রমিকদের আয় বাড়ানোর আরও পথ আছে। যখন শ্রীলংকা যাই, তখন জানতে পারলাম-১৯৯৫ সালে শ্রীলংকা থেকে তিন লাখ গৃহকর্মী বা হাউসমেড বিদেশে পাঠানো হবে। মজার ব্যাপার হলো, হাউসমেড বেতন পায় মাসে একশ’ ডলার; কিন্তু যদি হাউসকিপার পাঠানো যায়, তবে তারা মাসে দুইশ ডলার পাবে। সঙ্গে সঙ্গে ওখানকার শ্রীলংকান বন্ধুদের বললাম, ওই প্রকল্পের প্রধানের সঙ্গে আমার দেখা করার ব্যবস্থা করতে।

হয়ে গেল এবং সেই প্রধানকে (এক কর্নেল) বললাম, পয়সা আমার কাছে আছে। আমি এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণে বিদেশে পাঠানোর কর্মীদের ‘হাউসকিপার’-এ পরিণত করব। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। আমার এলাকাভুক্ত তিন জেলা-গল, মাতারা ও হামবানটোটার মধ্যে আমি গলে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে আধুনিক বাড়ি ও জীবনধারার জন্য প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি বসালাম-যেমন, ওয়াটার হিটার, এয়ারকুলার, এয়ারকন্ডিশনার ইত্যাদি। যারা বিদেশে যেতে চায়, তাদের প্রজেক্টের পয়সায় ৩-৬ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলাম। সে সময় শ্রীলংকার শ্রমমন্ত্রী ছিলেন এখনকার প্রধানমন্ত্রী মহেন্দ্র রাজা পাকসে। তিনি এত উৎসাহী হলেন; আমাকে বললেন-এক জেলায় কেন, আরও দুজেলায় শুরু করুন। আমিও তো তাই চাই; হয়ে গেল। মোটকথা, কাজ করে উপার্জন, দান গ্রহণ থেকে অনেক ভালো।

অনেক আগে জাপানে প্রায় ৭ বছর থাকার পর দেশে ফিরলে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন থেকে বগুড়ায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমি কিছু কাজ করার জন্য বলল। তখন সেখানকার প্রকল্প প্রধানের সঙ্গে আলাপ করে ঠিক করলাম, লোকজনের যা বিদ্যার দৌড়, তাতে তারা মাটি কাটা, গাছ কাটা-এসব পারবে; তারপরও ভিক্ষার চেয়ে কাজ ভালো। আরও কিছু কাজের কথা বলি। যখন ইইউ প্রকল্পে রংপুরে ছিলাম, তখন নতুন কিছু কাজ করেছি; যেমন-ভুট্টা চাষ। তবে এখানে এক সমস্যায় পড়লাম। গ্রামবাসী ভুট্টা চাষ করতে রাজি হলো; তবে শর্ত দিল-ভুট্টা আমাকে বিক্রি করতে হবে।

চাষ হলো গাছভর্তি ঝুমঝুম ভুট্টা; কিন্তু তারা বেচে না। কেননা, আমি বিক্রি করার ভার নিয়েছি। ফলে দুটাকা করে কিনে ৫০ পয়সা করে আমার বাবুর্চি দিয়ে বিক্রি করলাম। ক্ষতিটা প্রকল্প মেটাল। এর ফলে হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগলের খাবারের জন্য স্বাভাবিকভাবে ভুট্টা চাষ শুরু হলো। সেখানে পেঁপে চাষ শুরু করলাম।

আরও করেছি বাঁশ-বেতের কাজ। ঢাকা থেকে প্রশিক্ষক এনে ৪০/৫০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের উৎপাদিত জিনিস আবার ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। আসলে যোগ্য কাজ দিলে গ্রামের লোকেরা তা করে।

ঢাকা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন