দত্তক আইন হালনাগাদ করা জরুরি
jugantor
দত্তক আইন হালনাগাদ করা জরুরি

  জাহিদ রহমান  

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এতিম শিশুকে দত্তক গ্রহণ সাধারণত সমাজে মহৎ এবং ইতিবাচকভাবে দেখা হয়। এতে এতিম শিশুটি একটি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়, যা তাদের উন্নত জীবনের সুযোগ দেয়। রেকর্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় চার মিলিয়নের অধিক অনাথ শিশু রয়েছে। সন্তান ধারণে অক্ষমতা, বন্ধ্যত্ব-এরকম নানা কারণেই নিঃসন্তান দম্পতির সংখ্যা বাড়ছে এবং অনেকেই এখন শিশু দত্তক নিতে চাইছেন। অনাথ শিশুকে সাহায্য করা এবং একটি সুন্দর জীবনযাপনের সুযোগ করে দেওয়া সবার দায়িত্ব। একটি গৃহহীন অথবা অনাথ শিশুর অভিভাবক হয়ে তাকে আশ্রয় বা লালন-পালন করলে সেটা শুধু বৈধই নয়, ইবাদতও বটে। এ ক্ষেত্রে অসহায় শিশুর প্রতি মমতাই মুখ্য উদ্দেশ্য। ওই শিশুর মঙ্গলে সরল বিশ্বাসে কৃতকাজ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

বর্তমানে বাংলাদেশে পারিবারিক আইন ইসলামিক অনুশাসনের ধারায় পরিচালিত। ফলে মুসলিমরা আইনত দত্তক নিতে পারে না; কিন্তু আইন-২০১৩ এর অধীনে অভিভাবকত্ব লাভ করতে পারে। এ আইন দত্তক গৃহীত সন্তানকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করার অধিকার দেয় না। বর্তমানে গার্ডিয়ান অ্যান্ড ওয়ার্ডস আইন-১৮৯০ (ধারা ৭)-এর অধীনে বেশিরভাগ মানুষ অভিভাবকত্বের আবেদন করে থাকেন। শরিয়াহ আইন অনুযায়ী, দত্তক নেওয়ার সময় সন্তানের পিতৃপরিচয় স্বত্ব ত্যাগ করে এমনভাবে নেওয়া যাবে না যে, মা-বাবা আর কখনো ওই শিশুর মা-বাবা হিসাবে পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না। ইসলাম এ কাজ কখনো সমর্থন করে না। কেননা, ইসলাম সওয়াবের নিয়তে অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে বলেছে; কিন্তু সন্তান দখল করা কিংবা তার প্রকৃত পরিচয় গোপন করার অনুমতি দেয়নি। দত্তক নেওয়া শিশুকে দত্তক নেওয়ার কারণ এবং প্রকৃত পিতামাতার পরিচয় জানতে হবে; না হলে অনেক সময় শিশুটি নিজেকে পরিত্যক্ত ভাবতে পারে।

যেহেতু দত্তক নেওয়া সন্তান দত্তক পিতামাতার উত্তরাধিকার হয় না; তবে চাইলে দত্তক পিতামাতা তাদের মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ দত্তক সন্তানের জন্য দান হিসাবে দিতে পারেন। সেজন্য পালক ব্যক্তিকে জীবদ্দশায় হেবা করে সম্পত্তি দিতে হবে বা অসিয়ত করে যেতে হবে, যাতে পালকের মৃত্যুর পর সম্পত্তির অনধিক তিনের এক অংশ সে পেতে পারে। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় হিন্দু আইন দ্বারা নির্ধারিত সীমাবদ্ধতা অনুসারে শুধু ছেলে শিশু দত্তক নিতে সক্ষম। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে হিন্দু আইন প্রাকৃতিক পুত্র এবং দত্তক পুত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। তবে পুত্রসন্তান দত্তক নেওয়ার পর তার পুরোনো পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক এমনভাবে ছিন্ন করা হয়, যেন তাকে নতুন পরিবারের মধ্যে জন্ম দেওয়া হলো। একটি সামাজিক আনুষ্ঠানিক রেওয়াজের মাধ্যমে দত্তক পুত্রসন্তান তার নতুন পরিবারের ওপর অধিকার, কর্তব্য এবং দায়িত্ববোধের অংশীদার হয়। হিন্দু পুরুষ বিবাহিত, অবিবাহিত বা বিপত্নীক যাই হোক না কেন, তার দত্তক নেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার সীমিত।

সোমালিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তিউনিসিয়া, তুরস্ক এবং মালয়েশিয়ায় দত্তক গ্রহণ বৈধ। মালয়েশিয়াসহ বাকি চারটি দেশ তাদের নিজ নিজ দত্তক আইন অনুসারে শরিয়াহ নীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এছাড়া তুরস্কে তুর্কি সিভিল কোডের আইনগত সংযোজনকে সামনে রেখে, আগ্রহী দত্তক পিতামাতা দত্তক চূড়ান্ত করার আগে এক বছরের জন্য শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। ফলে এটি সরকারকে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে, এতে শিশুর সর্বোত্তম যত্ন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের বহু পুরোনো সংস্কারযোগ্য আইনগুলোকে হালনাগাদ করা হয়েছে; যা প্রশংসার দাবিদার। এক্ষেত্রে নিগৃহীত ও অবহেলিত শিশুদের সুরক্ষার বিধান রেখে আইন থাকাটা যুক্তিসঙ্গত। তবে সংস্কার, সংযোজন বা বিয়োজন যেন কোনো ধর্মীয় অনুভূতি কিংবা ধর্মীয় বিধানবিরোধী না হয়। গার্ডিয়ান অ্যান্ড ওয়ার্ডস আইন-১৮৯০ এর অধীনে অসুবিধা বিবেচনায় বাংলাদেশে দত্তক পিতামাতার অধিকার ও দায়িত্বের বিস্তারিত রূপরেখাসহ একটি দত্তক আইন অনুমোদন করা উচিত। পিতামাতার মর্যাদা এবং সন্তানের উত্তরাধিকার অধিকার পরিবর্তন না করে মুসলিম আইন অনুসারে দত্তক গ্রহণ করা যেতে পারে। দত্তক পিতামাতার হেফাজতের অধিকার, সন্তানকে আগলে রাখার দায়িত্ব সম্পর্কিত বিধান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

ব্যারিস্টার, যুক্তরাজ্য

দত্তক আইন হালনাগাদ করা জরুরি

 জাহিদ রহমান 
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এতিম শিশুকে দত্তক গ্রহণ সাধারণত সমাজে মহৎ এবং ইতিবাচকভাবে দেখা হয়। এতে এতিম শিশুটি একটি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়, যা তাদের উন্নত জীবনের সুযোগ দেয়। রেকর্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় চার মিলিয়নের অধিক অনাথ শিশু রয়েছে। সন্তান ধারণে অক্ষমতা, বন্ধ্যত্ব-এরকম নানা কারণেই নিঃসন্তান দম্পতির সংখ্যা বাড়ছে এবং অনেকেই এখন শিশু দত্তক নিতে চাইছেন। অনাথ শিশুকে সাহায্য করা এবং একটি সুন্দর জীবনযাপনের সুযোগ করে দেওয়া সবার দায়িত্ব। একটি গৃহহীন অথবা অনাথ শিশুর অভিভাবক হয়ে তাকে আশ্রয় বা লালন-পালন করলে সেটা শুধু বৈধই নয়, ইবাদতও বটে। এ ক্ষেত্রে অসহায় শিশুর প্রতি মমতাই মুখ্য উদ্দেশ্য। ওই শিশুর মঙ্গলে সরল বিশ্বাসে কৃতকাজ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

বর্তমানে বাংলাদেশে পারিবারিক আইন ইসলামিক অনুশাসনের ধারায় পরিচালিত। ফলে মুসলিমরা আইনত দত্তক নিতে পারে না; কিন্তু আইন-২০১৩ এর অধীনে অভিভাবকত্ব লাভ করতে পারে। এ আইন দত্তক গৃহীত সন্তানকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করার অধিকার দেয় না। বর্তমানে গার্ডিয়ান অ্যান্ড ওয়ার্ডস আইন-১৮৯০ (ধারা ৭)-এর অধীনে বেশিরভাগ মানুষ অভিভাবকত্বের আবেদন করে থাকেন। শরিয়াহ আইন অনুযায়ী, দত্তক নেওয়ার সময় সন্তানের পিতৃপরিচয় স্বত্ব ত্যাগ করে এমনভাবে নেওয়া যাবে না যে, মা-বাবা আর কখনো ওই শিশুর মা-বাবা হিসাবে পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না। ইসলাম এ কাজ কখনো সমর্থন করে না। কেননা, ইসলাম সওয়াবের নিয়তে অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে বলেছে; কিন্তু সন্তান দখল করা কিংবা তার প্রকৃত পরিচয় গোপন করার অনুমতি দেয়নি। দত্তক নেওয়া শিশুকে দত্তক নেওয়ার কারণ এবং প্রকৃত পিতামাতার পরিচয় জানতে হবে; না হলে অনেক সময় শিশুটি নিজেকে পরিত্যক্ত ভাবতে পারে।

যেহেতু দত্তক নেওয়া সন্তান দত্তক পিতামাতার উত্তরাধিকার হয় না; তবে চাইলে দত্তক পিতামাতা তাদের মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ দত্তক সন্তানের জন্য দান হিসাবে দিতে পারেন। সেজন্য পালক ব্যক্তিকে জীবদ্দশায় হেবা করে সম্পত্তি দিতে হবে বা অসিয়ত করে যেতে হবে, যাতে পালকের মৃত্যুর পর সম্পত্তির অনধিক তিনের এক অংশ সে পেতে পারে। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় হিন্দু আইন দ্বারা নির্ধারিত সীমাবদ্ধতা অনুসারে শুধু ছেলে শিশু দত্তক নিতে সক্ষম। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে হিন্দু আইন প্রাকৃতিক পুত্র এবং দত্তক পুত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। তবে পুত্রসন্তান দত্তক নেওয়ার পর তার পুরোনো পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক এমনভাবে ছিন্ন করা হয়, যেন তাকে নতুন পরিবারের মধ্যে জন্ম দেওয়া হলো। একটি সামাজিক আনুষ্ঠানিক রেওয়াজের মাধ্যমে দত্তক পুত্রসন্তান তার নতুন পরিবারের ওপর অধিকার, কর্তব্য এবং দায়িত্ববোধের অংশীদার হয়। হিন্দু পুরুষ বিবাহিত, অবিবাহিত বা বিপত্নীক যাই হোক না কেন, তার দত্তক নেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার সীমিত।

সোমালিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তিউনিসিয়া, তুরস্ক এবং মালয়েশিয়ায় দত্তক গ্রহণ বৈধ। মালয়েশিয়াসহ বাকি চারটি দেশ তাদের নিজ নিজ দত্তক আইন অনুসারে শরিয়াহ নীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এছাড়া তুরস্কে তুর্কি সিভিল কোডের আইনগত সংযোজনকে সামনে রেখে, আগ্রহী দত্তক পিতামাতা দত্তক চূড়ান্ত করার আগে এক বছরের জন্য শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। ফলে এটি সরকারকে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে, এতে শিশুর সর্বোত্তম যত্ন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের বহু পুরোনো সংস্কারযোগ্য আইনগুলোকে হালনাগাদ করা হয়েছে; যা প্রশংসার দাবিদার। এক্ষেত্রে নিগৃহীত ও অবহেলিত শিশুদের সুরক্ষার বিধান রেখে আইন থাকাটা যুক্তিসঙ্গত। তবে সংস্কার, সংযোজন বা বিয়োজন যেন কোনো ধর্মীয় অনুভূতি কিংবা ধর্মীয় বিধানবিরোধী না হয়। গার্ডিয়ান অ্যান্ড ওয়ার্ডস আইন-১৮৯০ এর অধীনে অসুবিধা বিবেচনায় বাংলাদেশে দত্তক পিতামাতার অধিকার ও দায়িত্বের বিস্তারিত রূপরেখাসহ একটি দত্তক আইন অনুমোদন করা উচিত। পিতামাতার মর্যাদা এবং সন্তানের উত্তরাধিকার অধিকার পরিবর্তন না করে মুসলিম আইন অনুসারে দত্তক গ্রহণ করা যেতে পারে। দত্তক পিতামাতার হেফাজতের অধিকার, সন্তানকে আগলে রাখার দায়িত্ব সম্পর্কিত বিধান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

ব্যারিস্টার, যুক্তরাজ্য

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন