ইশকুল খুইলাছে...
jugantor
ইশকুল খুইলাছে...

  ফাবিহা বিনতে হক  

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ দেড় বছর পর গত ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালা খোলা হয়েছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা একটা দীর্ঘ সময় পরে আবারও শিক্ষা প্রাঙ্গণে যেতে পারছে। এই লম্বা সময়ে পুরো বিশ্ব মোকাবিলা করেছে করোনা মহামারির সঙ্গে, এখনো করে যাচ্ছে।

মহামারির প্রভাব কেবল দেশের আর্থসামাজিক অবস্থায় না; বরং মানুষের জীবনযাপনে প্রভাব ফেলেছে প্রকটভাবে। এ প্রভাব শিক্ষার্থীদের উপরও পড়েছে।

বলতে গেলে, করোনার প্রাদুর্ভাব হওয়ার পর অন্যান্য কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য স্বাভাবিক হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধই রাখা হয়েছে ২০২০ সালের সেই মার্চ মাস থেকে। অনলাইনে শিক্ষা-কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলেও দেশের অনেক শিক্ষার্থী নেটওয়ার্কের বাইরে থাকায় অনলাইনে ক্লাস কিংবা অধ্যয়ন অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে উঠেনি। গণসাক্ষরতা অভিযানের সমীক্ষা অনুযায়ী, মাত্র ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ও দূরশিক্ষণ বা বেতার, টেলিভিশন, অনলাইনের বিভিন্ন প্লাটফর্ম এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেওয়া পাঠদানের আওতায় আসতে পেরেছে।

চিরাচরিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকার দরুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভ্যস্ত হতে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে কিছুটা চাপ পড়বে এবং তা খুব স্বাভাবিক। যেহেতু দেশে করোনা এখনো রয়ে গেছে, তাই অভিভাবক থেকে শুরু করে সরকারপ্রধানের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, করোনা মহামারি পরিবর্তন করে দিয়েছে অনেকের জীবনযাত্রার মান। তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাসহ মানসিক অবস্থায়ও বদল এসেছে। করোনা মহামারিতে অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, অনেকে ব্যবসা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। জীবনের মূল চালিকাশক্তি যেখানে অর্থনীতি, সেখানে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন একটি পরিবারের ছোট থেকে বড় সবার ওপরেই প্রভাব ফেলতে বাধ্য। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন, বইখাতা অথবা ড্রেসকোডে নমনীয় হওয়া কর্তৃপক্ষের মানবিক দায়িত্ব।

এ ছাড়াও করোনা অনেক পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছে। কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ হারিয়েছেন মা, কেউ কেউ পুরো পরিবারই হারিয়ে বসে আছেন। প্রিয়জনের বিয়োগ যন্ত্রণা পৃথিবীর যে কোনো কষ্টকে হার মানায়। তবু জীবন চলে জীবনের গতিতে। বাবা-মা হারানো ছেলেটাও স্কুল ড্রেস ধুয়েমুছে স্কুলে যাবে, গালে পানির দাগ না শুকালেও আদরের মেয়েটা যাবে কলেজে। পরিবার পরিজন হারানো মানুষগুলোর জন্য সহপাঠীদের সহানুভূতির পাশাপাশি মানসিক সহযোগিতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

শিক্ষার্থীদের ওপর মহামারির সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব যেটা পড়েছে, তা হলো ঝরে পড়া। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, করোনার প্রভাবে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে এ সংখ্যা কততে গিয়ে দাঁড়ায়, তা এখন বোঝা যাবে।

পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করতে অনেক শিক্ষার্থী শ্রমিক, দিনমজুর বা গৃহপরিচারিকার কাজে যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অনভ্যাস, এমন কী পড়াশোনার প্রতি অনীহার কারণে ঝরে পড়েছে অনেকে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ইত্যাদি দুরবস্থার দরুন শিক্ষাব্যবস্থা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এ অবস্থার উত্তরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা অমূলক হবে না।

সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে শিক্ষার আলো জ্বলে উঠুক প্রতিটি প্রাণে। পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানবিক সহায়তা ও কল্যাণে আবারও প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন মুখরিত হোক ছাত্রছাত্রীদের কলকাকলিতে।

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

fabihabintehaue83@gmail.com

ইশকুল খুইলাছে...

 ফাবিহা বিনতে হক 
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ দেড় বছর পর গত ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালা খোলা হয়েছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা একটা দীর্ঘ সময় পরে আবারও শিক্ষা প্রাঙ্গণে যেতে পারছে। এই লম্বা সময়ে পুরো বিশ্ব মোকাবিলা করেছে করোনা মহামারির সঙ্গে, এখনো করে যাচ্ছে।

মহামারির প্রভাব কেবল দেশের আর্থসামাজিক অবস্থায় না; বরং মানুষের জীবনযাপনে প্রভাব ফেলেছে প্রকটভাবে। এ প্রভাব শিক্ষার্থীদের উপরও পড়েছে।

বলতে গেলে, করোনার প্রাদুর্ভাব হওয়ার পর অন্যান্য কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য স্বাভাবিক হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধই রাখা হয়েছে ২০২০ সালের সেই মার্চ মাস থেকে। অনলাইনে শিক্ষা-কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলেও দেশের অনেক শিক্ষার্থী নেটওয়ার্কের বাইরে থাকায় অনলাইনে ক্লাস কিংবা অধ্যয়ন অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে উঠেনি। গণসাক্ষরতা অভিযানের সমীক্ষা অনুযায়ী, মাত্র ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ও দূরশিক্ষণ বা বেতার, টেলিভিশন, অনলাইনের বিভিন্ন প্লাটফর্ম এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেওয়া পাঠদানের আওতায় আসতে পেরেছে।

চিরাচরিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকার দরুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভ্যস্ত হতে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে কিছুটা চাপ পড়বে এবং তা খুব স্বাভাবিক। যেহেতু দেশে করোনা এখনো রয়ে গেছে, তাই অভিভাবক থেকে শুরু করে সরকারপ্রধানের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, করোনা মহামারি পরিবর্তন করে দিয়েছে অনেকের জীবনযাত্রার মান। তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাসহ মানসিক অবস্থায়ও বদল এসেছে। করোনা মহামারিতে অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, অনেকে ব্যবসা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। জীবনের মূল চালিকাশক্তি যেখানে অর্থনীতি, সেখানে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন একটি পরিবারের ছোট থেকে বড় সবার ওপরেই প্রভাব ফেলতে বাধ্য। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন, বইখাতা অথবা ড্রেসকোডে নমনীয় হওয়া কর্তৃপক্ষের মানবিক দায়িত্ব।

এ ছাড়াও করোনা অনেক পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছে। কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ হারিয়েছেন মা, কেউ কেউ পুরো পরিবারই হারিয়ে বসে আছেন। প্রিয়জনের বিয়োগ যন্ত্রণা পৃথিবীর যে কোনো কষ্টকে হার মানায়। তবু জীবন চলে জীবনের গতিতে। বাবা-মা হারানো ছেলেটাও স্কুল ড্রেস ধুয়েমুছে স্কুলে যাবে, গালে পানির দাগ না শুকালেও আদরের মেয়েটা যাবে কলেজে। পরিবার পরিজন হারানো মানুষগুলোর জন্য সহপাঠীদের সহানুভূতির পাশাপাশি মানসিক সহযোগিতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

শিক্ষার্থীদের ওপর মহামারির সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব যেটা পড়েছে, তা হলো ঝরে পড়া। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, করোনার প্রভাবে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে এ সংখ্যা কততে গিয়ে দাঁড়ায়, তা এখন বোঝা যাবে।

পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করতে অনেক শিক্ষার্থী শ্রমিক, দিনমজুর বা গৃহপরিচারিকার কাজে যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অনভ্যাস, এমন কী পড়াশোনার প্রতি অনীহার কারণে ঝরে পড়েছে অনেকে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ইত্যাদি দুরবস্থার দরুন শিক্ষাব্যবস্থা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এ অবস্থার উত্তরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা অমূলক হবে না।

সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে শিক্ষার আলো জ্বলে উঠুক প্রতিটি প্রাণে। পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানবিক সহায়তা ও কল্যাণে আবারও প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন মুখরিত হোক ছাত্রছাত্রীদের কলকাকলিতে।

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

fabihabintehaue83@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন