গিরিনন্দিনী মাতামুহুরীর বুকে বিপন্নতার বেদনাভার
jugantor
গিরিনন্দিনী মাতামুহুরীর বুকে বিপন্নতার বেদনাভার

  মমতাজ উদ্দিন আহমদ  

২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নান্দনিক মাতামুহুরী, মায়ের সঙ্গে নামের সংযুক্তি! এ নদীর কোলে আমার বসবাস। জন্ম এ নদীর পাড়ে। শিশু এবং তারুণ্যের উন্মাদনা কেটেছে এ নদীর বুকেই, কেটেছি সাঁতার তারই স্রোতে! মাতামুহুরীকে ঘিরে রয়েছে শত স্মৃতি, আনন্দ ও বেদনা। বিষাদ কিংবা বিলাপেও রয়েছে এই নদী! এ নদী যেন জীবনেরসত্তা, বিত্ত-বৈভব আর সুখের প্রবাহ; একইসঙ্গে লাস্যময়ী-হাস্যময়ী-রূপময়ী-রহস্যময়ী! তার চলনের গতি যেন কোনো সুরূপা-অপরূপার এঁকেবেঁকে হেঁটে চলা! খরস্রোতা মাতামুহুরী প্রাচীনকাল থেকে এখনো অনেক পরিবারের জীবন-জীবিকার পরম নিভর্রতা-নিশ্চয়তা। তাদের কাছে এ নদী যেন প্রাত্যহিক আনন্দ-বেদনা-বিসংবাদের মহাকালের মহাস্রোত!

সুদূর অতীত থেকে এ নদী প্রাকৃতিক পরিবেশের, ভূ-সম্পদের, অর্থ আর বাস্তুতান্ত্রিকতার প্রাণকেন্দ্র। তাই এ নদীর সঙ্গে এসব মানুষের সম্পর্ক সতত, প্রাণবন্ত ও অবিচ্ছেদ্য। অনন্তকালের অভিযাত্রায় এ নদী তাদের সুখ-দুঃখের পরম সাথী এ নদীর অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণও উল্লেখযোগ্য। নদীর বুকে কাঠ, বাঁশ এবং নৌপরিবহণ এতদঞ্চলের অর্থনীতির চাকায় এনেছে গতি। খরস্রোতা মাতামুহুরী বর্ষাকালে আবার দুঃখেরও কারণ। নানা সময়ে এ নদী সৃষ্টি করে শোকের আবহ। কারণ কত নিষ্পাপ জীবন কেড়ে নেয় এ নদীর স্রোত! ক’বছর ধরে ভাঙছে নদীর তীর। বিলীন হচ্ছে জনপদ আর সহায়-সম্পদ। তবে বছরজুড়ে সুখের পরশে এ দুঃখ স্থায়ী নয়। সবকিছু ছাড়িয়ে গিরিনন্দিনী মাতামুহুরীর দুতীরে দেখা মিলে ছায়াঘেরা পাখি ডাকা সুউচ্চ পাহাড়ের নির্মল উদারতা ও গাঢ় সবুজের মাখামাখি। নদীর বুকে যখন পর্যটকরা ভ্রমণ করেন তখন দুতীরজুড়ে বিটপী কান্তরের শৈলসারির মুগ্ধতায় ভরে যায় মন। যার অন্তর্নিহিত সুষমা, সুশোভিত-সুরূপময় নান্দনিকতার প্রকাশ অসাধ্য। কেবল অন্তরের ধ্যানলোকেই বুঝা সম্ভব! সবুজ অরণ্যানীর নান্দনিকতার সঙ্গে নদীর কুলকুল রব প্রকৃতিতে আনে বৈচিত্র্য।

দু’দশক আগে মাতামুহুরীর বাঁকে বাঁকে ছিল কাজল কালো জল। এ জলাধারগুলোকে স্থানীয়রা ‘কুম’ হিসাবে চিনত। এখন আর সেই গভীরতা নেই। নদীর পাড়ের সুবিন্যস্ত সবুজাভ সজ্জা নেই। হেমন্তে কাশফুলের উদ্দামতাও দেখা যায় না। পার্বত্য জনপদ আলীকদম ও লামায় সমাজ-সভ্যতা সৃষ্টির অন্যতম কারিগর এ শৈবলিনী মাতামুহুরী। পাশাপাশি সমতলের চকরিয়া উপজেলা আর লামা-আলীকদমের আঞ্চলিক সামাজিকতাকে করেছে সজীব-পুষ্ট ও হৃষ্ট।

শত-সহস্রবর্ষের ঐতিহ্যের ধারক-বাহক প্রবাহিনী মাতামুহুরী। নদীঘেঁষা জনপদে সুদূর প্রাচীনকালে গড়ে উঠেছিল সভ্যতা। এ নদীর অববাহিকা ঘিরে গড়ে ওঠে জনবসতি। নদীর পানি সিঞ্চনে প্রতি বছর আবর্তিত হয় কৃষি অর্থনীতি। ফলে এ নদীর উদারতা পাহাড়ি জনপদ আলীকদম-লামা ও সমতলের চকরিয়া উপজেলাকে দিয়েছে নান্দনিক বৈভব। এ যেন মহান স্রষ্টার অতুলনীয় সৃষ্টি ও ঐশ্বর্য। ষড়ঋতুর পালাবদলে মাতামুহুরীর অববাহিকায় আসে পরিবর্তন। বর্ষা-বাদলে নদীর বুকে আসে মায়াবতী আবেগ। তখন পানির স্রোতে ক্ষয় করে নদীর পাড় আর জনপদ। ক্ষতি হয় ক্ষেত-ফসলের। হেমন্ত-শীত ও বসন্তে মাতামুহুরীর বুক থাকে তারুণ্যের মায়াময় চঞ্চলতায় ভরা। চলার ছন্দ থাকে নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ। তবে গ্রীষ্মে এ নদীর বুকে জেগে উঠে অসংখ্য বালুর চর।

প্রকৃতিতে মাতামুহুরীর অবদান হয়তো অন্য দশটা নদীর মতোই। তবে এ নদীর মাধ্যমে এ জনপদের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটানোর সুযোগ পেয়েছে। মাতামুহুরী পার্বত্য চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী। বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে অন্যতম। লামা এবং আলীকদম উপজেলার অসংখ্য জলনির্গম প্রণালী থেকে এ নদী পুষ্ট হয়েছে। উৎসমুখ থেকেই ছোট-বড় উপনদী-খাল-ঝিরি-ঝরনার পানি এসে যুক্ত হয়েছে মাতামুহুরীতে। জনশ্রুতি মতে, মাতামুহুরী নদী একক কোনো উৎস থেকে সৃষ্টি নয়। মাতৃস্তনসদৃশ অসংখ্য পাহাড়ের গা বেয়ে পানি চুয়ে চুয়ে পড়ে বিভিন্ন শাখা খাল বা ঝিরির পানিতেই মাতামুহুরীর সৃষ্টি। মুহুরী শব্দের অর্থ অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ার ঝাঁঝর। ইংরেজিতে যাকে বলে শাওয়ার (Shower)। এভাবে অনেকগুলো শাখা-প্রশাখার পানি শাওয়ার আকারে ঝরে এ নদীতে মিলিত হয় বলেই এ নদীর নাম মাতামুহুরী।

মার্মা ভাষায় মাতামুহুরী নদীর নাম-মোরেই খ্যোং বা মেরিখ্যাইং। মোরেই বা মেরি শব্দের অর্থ মাতামুহুরী আর খ্যোং বা খ্যাইং শব্দের অর্থ নদী। তরঙ্গিণী মাতামুহুরীর উৎপত্তি আলীকদম উপজেলার বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সীমান্তের পাহাড়ি এলাকা থেকে। উৎপত্তিস্থলে নদীটি যেখানে গিয়ে তার নাম হারিয়েছে সরেজমিন সেখানে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। স্থানটির নাম দোছরি-ফাত্তারা। দোছরি ও ফাত্তারা পৃথক দুটি খাল বা উপনদী। এ দুটি খালের সংযোগ স্থল থেকেই মাতামুহুরী নদীর শুরু! এ স্থানটি ইংরেজি Y (ওয়াই) অক্ষরের মতো।

তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১৮৮০ সালের ১৭ নভেম্বর মাতামুহুরী নদীর উপত্যকায় ১ লাখ ৩ হাজার একর পাহাড়কে ‘মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট’ ঘোষণা করেন। এ রিজার্ভ ফরেস্ট মাতামুহুরীর পানির অন্যতম জোগানদাতাও বটে। প্রায় দু’যুগ আগেও স্রোতবহা মাতামুহুরী সম্পদ-সম্ভারে ছিল পরিণত। তারুণ্যের উদ্বেলতা ছিল এ সমুদ্রকান্তার প্রবাহে। জল জীববৈচিত্র্যের বিপুল সম্ভারে ছিল পরিপূর্ণ। নদীর কিছুদূর পর পর ছিল তীব্র স্রোত। যাকে স্থানীয়রা ‘দরদরি’ হিসাবে চিহ্নিত করত। কিন্তু বর্তমানে নদীটির স্বাভাবিক অবস্থা আর নেই। দীর্ঘ দু’যুগের বেশি সময় ধরে নদীর তীরে তামাক চাষ ও বৃক্ষ নিধনে পরিবেশ হয়েছে বিপর্যস্ত। প্রতি বছর পাহাড়ি জুমিয়াদের জুমচাষ নদী তরীবর্তী সবুজাভ পাহাড়গুলো হয়ে যায় শ্মশানের ছাইয়ের ধূসরতা।

এক সময়ের পূর্ণযৌবনা মাতামুহুরী এখন কিছুটা সংকুচিত। নদীতে নাব্য সংকট শুরু হয় গ্রীষ্ম মৌসুমে। আলীকদম সদর থেকে উজানে অন্তত ৮০-৯০ কিলোমিটার নদী অববাহিকা-উপত্যকাজুড়ে প্রতি বছর জুমচাষ হয়। নানা কারণে এ নদীর বুকে এখন পলি জমছে। এভাবে চলতে থাকলে নদীটি সম্পদ থেকে সংকটে রূপান্তরিত হবে! পাহাড়ের সুখ-দুঃখ বয়ে বঙ্গোপসাগরের বুকে নিয়ে যায় সমুদ্রদয়িতা মাতামুহুরী। মাটিক্ষয় রোধ করা না গেলে দৈহিকভাবে অচিরেই শীর্ষকায়ায় সংকটাপন্ন হতে বাধ্য এ নদী। নদীর উজানে ও পাড়জুড়ে সড়ক নির্মাণে কাটা হচ্ছে পাহাড়। কাটা পাহাড়ের মাটি গিয়ে পড়ছে ঝিরি, খাল ও নদীতে। নদীর তীরে ফসল আবাদে দেওয়া হয় বিষ ও কীটনাশক। যা নদীটির প্রাকৃতিক পরিবেশকে নষ্ট করেছে। ফলে পানি হয়ে যাচ্ছে দূষিত।

অব্যাহত মাটির ক্ষয়, জুমচাষ, পাহাড়-কাটা, তামাক চাষ, সার কীটনাশকের অযাচিত ব্যবহারের প্রবাহিনী মাতামুহুরীর প্রকৃতি-পরিবেশকে নাজুক করছে দিন দিন। এ নদীকে সুরক্ষিত না রাখলে অচিরেই বিপন্নতার বেদনাভার সইতে হবে আগামী প্রজন্মকে। গিরিনন্দিনী আলীকদমকে সবুজাভ প্রকৃতির অনুপম অনুভবে উপলব্ধি করতে হলে মাতামুহুরীর অবদানকে কোনোভাবে অস্বীকার করা যাবে না। তাই আসুন সবাই সচেতন হই। আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে সদা প্রস্তুত থাকি। নান্দনিক মাতামুহুরীকে মায়ের মতোই ভালোবাসি।

সভাপতি, আলীকদম প্রেস ক্লাব

গিরিনন্দিনী মাতামুহুরীর বুকে বিপন্নতার বেদনাভার

 মমতাজ উদ্দিন আহমদ 
২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নান্দনিক মাতামুহুরী, মায়ের সঙ্গে নামের সংযুক্তি! এ নদীর কোলে আমার বসবাস। জন্ম এ নদীর পাড়ে। শিশু এবং তারুণ্যের উন্মাদনা কেটেছে এ নদীর বুকেই, কেটেছি সাঁতার তারই স্রোতে! মাতামুহুরীকে ঘিরে রয়েছে শত স্মৃতি, আনন্দ ও বেদনা। বিষাদ কিংবা বিলাপেও রয়েছে এই নদী! এ নদী যেন জীবনেরসত্তা, বিত্ত-বৈভব আর সুখের প্রবাহ; একইসঙ্গে লাস্যময়ী-হাস্যময়ী-রূপময়ী-রহস্যময়ী! তার চলনের গতি যেন কোনো সুরূপা-অপরূপার এঁকেবেঁকে হেঁটে চলা! খরস্রোতা মাতামুহুরী প্রাচীনকাল থেকে এখনো অনেক পরিবারের জীবন-জীবিকার পরম নিভর্রতা-নিশ্চয়তা। তাদের কাছে এ নদী যেন প্রাত্যহিক আনন্দ-বেদনা-বিসংবাদের মহাকালের মহাস্রোত!

সুদূর অতীত থেকে এ নদী প্রাকৃতিক পরিবেশের, ভূ-সম্পদের, অর্থ আর বাস্তুতান্ত্রিকতার প্রাণকেন্দ্র। তাই এ নদীর সঙ্গে এসব মানুষের সম্পর্ক সতত, প্রাণবন্ত ও অবিচ্ছেদ্য। অনন্তকালের অভিযাত্রায় এ নদী তাদের সুখ-দুঃখের পরম সাথী এ নদীর অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণও উল্লেখযোগ্য। নদীর বুকে কাঠ, বাঁশ এবং নৌপরিবহণ এতদঞ্চলের অর্থনীতির চাকায় এনেছে গতি। খরস্রোতা মাতামুহুরী বর্ষাকালে আবার দুঃখেরও কারণ। নানা সময়ে এ নদী সৃষ্টি করে শোকের আবহ। কারণ কত নিষ্পাপ জীবন কেড়ে নেয় এ নদীর স্রোত! ক’বছর ধরে ভাঙছে নদীর তীর। বিলীন হচ্ছে জনপদ আর সহায়-সম্পদ। তবে বছরজুড়ে সুখের পরশে এ দুঃখ স্থায়ী নয়। সবকিছু ছাড়িয়ে গিরিনন্দিনী মাতামুহুরীর দুতীরে দেখা মিলে ছায়াঘেরা পাখি ডাকা সুউচ্চ পাহাড়ের নির্মল উদারতা ও গাঢ় সবুজের মাখামাখি। নদীর বুকে যখন পর্যটকরা ভ্রমণ করেন তখন দুতীরজুড়ে বিটপী কান্তরের শৈলসারির মুগ্ধতায় ভরে যায় মন। যার অন্তর্নিহিত সুষমা, সুশোভিত-সুরূপময় নান্দনিকতার প্রকাশ অসাধ্য। কেবল অন্তরের ধ্যানলোকেই বুঝা সম্ভব! সবুজ অরণ্যানীর নান্দনিকতার সঙ্গে নদীর কুলকুল রব প্রকৃতিতে আনে বৈচিত্র্য।

দু’দশক আগে মাতামুহুরীর বাঁকে বাঁকে ছিল কাজল কালো জল। এ জলাধারগুলোকে স্থানীয়রা ‘কুম’ হিসাবে চিনত। এখন আর সেই গভীরতা নেই। নদীর পাড়ের সুবিন্যস্ত সবুজাভ সজ্জা নেই। হেমন্তে কাশফুলের উদ্দামতাও দেখা যায় না। পার্বত্য জনপদ আলীকদম ও লামায় সমাজ-সভ্যতা সৃষ্টির অন্যতম কারিগর এ শৈবলিনী মাতামুহুরী। পাশাপাশি সমতলের চকরিয়া উপজেলা আর লামা-আলীকদমের আঞ্চলিক সামাজিকতাকে করেছে সজীব-পুষ্ট ও হৃষ্ট।

শত-সহস্রবর্ষের ঐতিহ্যের ধারক-বাহক প্রবাহিনী মাতামুহুরী। নদীঘেঁষা জনপদে সুদূর প্রাচীনকালে গড়ে উঠেছিল সভ্যতা। এ নদীর অববাহিকা ঘিরে গড়ে ওঠে জনবসতি। নদীর পানি সিঞ্চনে প্রতি বছর আবর্তিত হয় কৃষি অর্থনীতি। ফলে এ নদীর উদারতা পাহাড়ি জনপদ আলীকদম-লামা ও সমতলের চকরিয়া উপজেলাকে দিয়েছে নান্দনিক বৈভব। এ যেন মহান স্রষ্টার অতুলনীয় সৃষ্টি ও ঐশ্বর্য। ষড়ঋতুর পালাবদলে মাতামুহুরীর অববাহিকায় আসে পরিবর্তন। বর্ষা-বাদলে নদীর বুকে আসে মায়াবতী আবেগ। তখন পানির স্রোতে ক্ষয় করে নদীর পাড় আর জনপদ। ক্ষতি হয় ক্ষেত-ফসলের। হেমন্ত-শীত ও বসন্তে মাতামুহুরীর বুক থাকে তারুণ্যের মায়াময় চঞ্চলতায় ভরা। চলার ছন্দ থাকে নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ। তবে গ্রীষ্মে এ নদীর বুকে জেগে উঠে অসংখ্য বালুর চর।

প্রকৃতিতে মাতামুহুরীর অবদান হয়তো অন্য দশটা নদীর মতোই। তবে এ নদীর মাধ্যমে এ জনপদের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটানোর সুযোগ পেয়েছে। মাতামুহুরী পার্বত্য চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী। বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে অন্যতম। লামা এবং আলীকদম উপজেলার অসংখ্য জলনির্গম প্রণালী থেকে এ নদী পুষ্ট হয়েছে। উৎসমুখ থেকেই ছোট-বড় উপনদী-খাল-ঝিরি-ঝরনার পানি এসে যুক্ত হয়েছে মাতামুহুরীতে। জনশ্রুতি মতে, মাতামুহুরী নদী একক কোনো উৎস থেকে সৃষ্টি নয়। মাতৃস্তনসদৃশ অসংখ্য পাহাড়ের গা বেয়ে পানি চুয়ে চুয়ে পড়ে বিভিন্ন শাখা খাল বা ঝিরির পানিতেই মাতামুহুরীর সৃষ্টি। মুহুরী শব্দের অর্থ অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ার ঝাঁঝর। ইংরেজিতে যাকে বলে শাওয়ার (Shower)। এভাবে অনেকগুলো শাখা-প্রশাখার পানি শাওয়ার আকারে ঝরে এ নদীতে মিলিত হয় বলেই এ নদীর নাম মাতামুহুরী।

মার্মা ভাষায় মাতামুহুরী নদীর নাম-মোরেই খ্যোং বা মেরিখ্যাইং। মোরেই বা মেরি শব্দের অর্থ মাতামুহুরী আর খ্যোং বা খ্যাইং শব্দের অর্থ নদী। তরঙ্গিণী মাতামুহুরীর উৎপত্তি আলীকদম উপজেলার বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সীমান্তের পাহাড়ি এলাকা থেকে। উৎপত্তিস্থলে নদীটি যেখানে গিয়ে তার নাম হারিয়েছে সরেজমিন সেখানে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। স্থানটির নাম দোছরি-ফাত্তারা। দোছরি ও ফাত্তারা পৃথক দুটি খাল বা উপনদী। এ দুটি খালের সংযোগ স্থল থেকেই মাতামুহুরী নদীর শুরু! এ স্থানটি ইংরেজি Y (ওয়াই) অক্ষরের মতো।

তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১৮৮০ সালের ১৭ নভেম্বর মাতামুহুরী নদীর উপত্যকায় ১ লাখ ৩ হাজার একর পাহাড়কে ‘মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট’ ঘোষণা করেন। এ রিজার্ভ ফরেস্ট মাতামুহুরীর পানির অন্যতম জোগানদাতাও বটে। প্রায় দু’যুগ আগেও স্রোতবহা মাতামুহুরী সম্পদ-সম্ভারে ছিল পরিণত। তারুণ্যের উদ্বেলতা ছিল এ সমুদ্রকান্তার প্রবাহে। জল জীববৈচিত্র্যের বিপুল সম্ভারে ছিল পরিপূর্ণ। নদীর কিছুদূর পর পর ছিল তীব্র স্রোত। যাকে স্থানীয়রা ‘দরদরি’ হিসাবে চিহ্নিত করত। কিন্তু বর্তমানে নদীটির স্বাভাবিক অবস্থা আর নেই। দীর্ঘ দু’যুগের বেশি সময় ধরে নদীর তীরে তামাক চাষ ও বৃক্ষ নিধনে পরিবেশ হয়েছে বিপর্যস্ত। প্রতি বছর পাহাড়ি জুমিয়াদের জুমচাষ নদী তরীবর্তী সবুজাভ পাহাড়গুলো হয়ে যায় শ্মশানের ছাইয়ের ধূসরতা।

এক সময়ের পূর্ণযৌবনা মাতামুহুরী এখন কিছুটা সংকুচিত। নদীতে নাব্য সংকট শুরু হয় গ্রীষ্ম মৌসুমে। আলীকদম সদর থেকে উজানে অন্তত ৮০-৯০ কিলোমিটার নদী অববাহিকা-উপত্যকাজুড়ে প্রতি বছর জুমচাষ হয়। নানা কারণে এ নদীর বুকে এখন পলি জমছে। এভাবে চলতে থাকলে নদীটি সম্পদ থেকে সংকটে রূপান্তরিত হবে! পাহাড়ের সুখ-দুঃখ বয়ে বঙ্গোপসাগরের বুকে নিয়ে যায় সমুদ্রদয়িতা মাতামুহুরী। মাটিক্ষয় রোধ করা না গেলে দৈহিকভাবে অচিরেই শীর্ষকায়ায় সংকটাপন্ন হতে বাধ্য এ নদী। নদীর উজানে ও পাড়জুড়ে সড়ক নির্মাণে কাটা হচ্ছে পাহাড়। কাটা পাহাড়ের মাটি গিয়ে পড়ছে ঝিরি, খাল ও নদীতে। নদীর তীরে ফসল আবাদে দেওয়া হয় বিষ ও কীটনাশক। যা নদীটির প্রাকৃতিক পরিবেশকে নষ্ট করেছে। ফলে পানি হয়ে যাচ্ছে দূষিত।

অব্যাহত মাটির ক্ষয়, জুমচাষ, পাহাড়-কাটা, তামাক চাষ, সার কীটনাশকের অযাচিত ব্যবহারের প্রবাহিনী মাতামুহুরীর প্রকৃতি-পরিবেশকে নাজুক করছে দিন দিন। এ নদীকে সুরক্ষিত না রাখলে অচিরেই বিপন্নতার বেদনাভার সইতে হবে আগামী প্রজন্মকে। গিরিনন্দিনী আলীকদমকে সবুজাভ প্রকৃতির অনুপম অনুভবে উপলব্ধি করতে হলে মাতামুহুরীর অবদানকে কোনোভাবে অস্বীকার করা যাবে না। তাই আসুন সবাই সচেতন হই। আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে সদা প্রস্তুত থাকি। নান্দনিক মাতামুহুরীকে মায়ের মতোই ভালোবাসি।

সভাপতি, আলীকদম প্রেস ক্লাব

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন