ঘুস থেকে কি পরিত্রাণ মিলবে না?
jugantor
ঘুস থেকে কি পরিত্রাণ মিলবে না?

  লাইজু আক্তার  

২৪ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুস একটি সামাজিক ব্যাধি। দুই বর্ণের এ ঘুস শব্দটির অনেক ক্ষমতা। এই ঘুস অনেক সময় আলোর গতির মতো কাজ করে ক্ষেত্রবিশেষে। অনেক অসাধ্য সাধন করতে পারে এ ঘুস। আপনার ফাইল চাপা পড়ে আছে, কিছুতেই সচল করতে পারছেন না?

ঘুসের আশ্রয় নিন, দেখবেন ফাইল আপনার ভাবনার চেয়েও দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করেছে। আপনি কি রেমিট্যান্স যোদ্ধা হতে চান? কিন্তু পাসপোর্ট/ ভিসা পাচ্ছেন না? ঘুস দিতে শিখুন, কাজ হবে সহজ। ঘুসের ক্ষমতা অপরিসীম। ঘুসের দাপট এখন সর্বব্যাপী।

বিশেষ করে সরকারি-আধা সরকারি অফিসে এর সার্বক্ষণিক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সরকারি অফিসগুলোর দেওয়ালও ঘুস খায়-এমন একটি প্রবচন চালু আছে আমাদের সমাজে। ঘুসকে আবার শুদ্ধ বাংলায় বলে উৎকোচ। আবার কখনো কখনো ভদ্রতার লেবাস চড়িয়ে ওটাকে বলা হয় ‘উপরি’। বিয়ের বরের আয়-রোজগার সম্বন্ধে কনের বাড়ির লোকজনকে ধারণা দেওয়ার সময় ঘটক বলে থাকে-ছেলে বেতন যা-ই পাক, উপরি বেশ ভালোই পায়। সেই উপরি এখন আরও আধুনিক হয়ে ‘স্পিড মানি’তে রূপ নিতে যাচ্ছে। নামের এ নব্য সংস্করণের যথার্থ কারণও আছে। ওটা দিলে যে কোনো ফাইল বা কাজের স্পিড বেড়ে যায়। সে হিসাবে ঘুসের এই নতুন নামকরণ সার্থক।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘সার্ভিস সেক্টরে দুর্নীতি : জাতীয় পরিবার জরিপ ২০১৫’ অনুসারে ২০১৪ সালে ৬৭.৮ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৮.১ শতাংশ ঘুস প্রদান করতে বাধ্য হয়েছিল। এ ঘুসের গড় পরিমাণ ছিল ৪,৫৩৮ টাকা। ২০১৫ সালের জরিপে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত সেক্টরগুলো হলো-পাসপোর্ট (৭৭.৭ শতাংশ), আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (৭৪.৬ শতাংশ), শিক্ষা (সরকারি ও এমপিও) (৬০.৮ শতাংশ), বিআরটিএ (৬০.১ শতাংশ), ভূমি প্রশাসন (৫৩.৪ শতাংশ) বিচার বিভাগীয় পরিষেবা (৪৮.২ শতাংশ) এবং স্বাস্থ্য (৩৭.৫ শতাংশ)। উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় কম আয়ের পরিবারের ওপর দুর্নীতির চাপ বেশি। এর কারণ কী? এ বিষয়ে একটি জরিপ করা হলে ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেন, তারা ঘুস প্রদান করেন কারণ; ‘আমরা যদি ঘুস না দেই, তবে আমরা পরিষেবা পাব না।’ বর্তমানে এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে ঘুসের প্রভাব নেই। ঘুস আজকাল একটি সুপার পাওয়ারসম্পন্ন শব্দ হয়ে গেছে। এর থেকে কি পরিত্রাণ মিলবে না আমাদের?

আজকাল সরকারি চাকরি পেতে মেধা-যোগ্যতার পাশাপাশি ঘুস প্রদানের সামর্থ্যও একটি বড় যোগ্যতা হিসাবে বিবেচিত। একটি সরকারি অফিসের পিয়নের চাকরি পেতেও নাকি পাঁচ লাখ পর্যন্ত ঘুস গুনতে হয়। পুলিশের এক কনস্টেবলের চাকরি পেতে লাগে আট-দশ লাখ। যত ওপরে যাবেন, টাকার অঙ্ক তত বড় হবে। তো যারা এ বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করে চাকরি হস্তগত করে, চাকরিতে প্রবেশের পর তারা সে টাকাটা বৈধ-অবৈধ উপায়ে আদায় করে নেওয়ার চেষ্টা তো করবেই।

ঘুস নেওয়ার বিষয়টি চক্রাকারে ঘুরছে। আমি চাকরি নিতে দশ লাখ টাকা দিয়েছি; এখন আমার কাছে কেউ চাকরি কিংবা পরিষেবা নিতে এলে ঘুস নিব বলে এটাকে স্বাভাবিক বিষয় হিসাবে দাবি করতেই পারে সবাই। কিন্তু তবুও এ সামাজিক ব্যাধিটির সঠিক চিকিৎসা দরকার। না হলে একটা সময় আসবে, ঘুসের কারিশমায় সব ক্ষেত্রে অযোগ্যেদের প্রবেশ ঘটবে আর মেধাবীরা পড়ে থাকবে পেছনে। এর ফলে দেশ মেধাহীনদের দখলে চলে যাবে।

ঘুস নিয়ে অনেক লেখালেখি, প্রচার-প্রচারণা হয়েছে, হচ্ছে; কিন্তু সঠিক সমাধান করতে হলে আরও তৎপর হতে হবে। কেউ ঘুস গ্রহণ কিংবা প্রদান করলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে কেউ ঘুস নেওয়ার সাহস পাবে না। নড়বড়ে শাসন ব্যবস্থার ফলে মানুষের নৈতিকতা হারিয়ে যায়। আর তখনই মানুষ ঘুস নিয়ে থাকে। ঘুস গ্রহণকারী ও প্রদানকারী উভয়কেই শাস্তিস্বরূপ জেল-জরিমানা ও সমাজ থেকে বহিষ্কার করতে হবে। তাহলে ঘুস সংক্রান্ত দুর্নীতি পুরোদমে নির্মূল করা সম্ভব। ঘুস রোধে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। যে আইনগুলো ঘুস রোধে কার্যকর হচ্ছে না, তা সংশোধন করতে হবে। কারণ, আইনের শাসন ঘুস রোধ করতে সক্ষম। এজন্য বিচার বিভাগের অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

শিক্ষার্থী, নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ

ঘুস থেকে কি পরিত্রাণ মিলবে না?

 লাইজু আক্তার 
২৪ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুস একটি সামাজিক ব্যাধি। দুই বর্ণের এ ঘুস শব্দটির অনেক ক্ষমতা। এই ঘুস অনেক সময় আলোর গতির মতো কাজ করে ক্ষেত্রবিশেষে। অনেক অসাধ্য সাধন করতে পারে এ ঘুস। আপনার ফাইল চাপা পড়ে আছে, কিছুতেই সচল করতে পারছেন না?

ঘুসের আশ্রয় নিন, দেখবেন ফাইল আপনার ভাবনার চেয়েও দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করেছে। আপনি কি রেমিট্যান্স যোদ্ধা হতে চান? কিন্তু পাসপোর্ট/ ভিসা পাচ্ছেন না? ঘুস দিতে শিখুন, কাজ হবে সহজ। ঘুসের ক্ষমতা অপরিসীম। ঘুসের দাপট এখন সর্বব্যাপী।

বিশেষ করে সরকারি-আধা সরকারি অফিসে এর সার্বক্ষণিক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সরকারি অফিসগুলোর দেওয়ালও ঘুস খায়-এমন একটি প্রবচন চালু আছে আমাদের সমাজে। ঘুসকে আবার শুদ্ধ বাংলায় বলে উৎকোচ। আবার কখনো কখনো ভদ্রতার লেবাস চড়িয়ে ওটাকে বলা হয় ‘উপরি’। বিয়ের বরের আয়-রোজগার সম্বন্ধে কনের বাড়ির লোকজনকে ধারণা দেওয়ার সময় ঘটক বলে থাকে-ছেলে বেতন যা-ই পাক, উপরি বেশ ভালোই পায়। সেই উপরি এখন আরও আধুনিক হয়ে ‘স্পিড মানি’তে রূপ নিতে যাচ্ছে। নামের এ নব্য সংস্করণের যথার্থ কারণও আছে। ওটা দিলে যে কোনো ফাইল বা কাজের স্পিড বেড়ে যায়। সে হিসাবে ঘুসের এই নতুন নামকরণ সার্থক।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘সার্ভিস সেক্টরে দুর্নীতি : জাতীয় পরিবার জরিপ ২০১৫’ অনুসারে ২০১৪ সালে ৬৭.৮ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৮.১ শতাংশ ঘুস প্রদান করতে বাধ্য হয়েছিল। এ ঘুসের গড় পরিমাণ ছিল ৪,৫৩৮ টাকা। ২০১৫ সালের জরিপে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত সেক্টরগুলো হলো-পাসপোর্ট (৭৭.৭ শতাংশ), আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (৭৪.৬ শতাংশ), শিক্ষা (সরকারি ও এমপিও) (৬০.৮ শতাংশ), বিআরটিএ (৬০.১ শতাংশ), ভূমি প্রশাসন (৫৩.৪ শতাংশ) বিচার বিভাগীয় পরিষেবা (৪৮.২ শতাংশ) এবং স্বাস্থ্য (৩৭.৫ শতাংশ)। উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় কম আয়ের পরিবারের ওপর দুর্নীতির চাপ বেশি। এর কারণ কী? এ বিষয়ে একটি জরিপ করা হলে ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেন, তারা ঘুস প্রদান করেন কারণ; ‘আমরা যদি ঘুস না দেই, তবে আমরা পরিষেবা পাব না।’ বর্তমানে এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে ঘুসের প্রভাব নেই। ঘুস আজকাল একটি সুপার পাওয়ারসম্পন্ন শব্দ হয়ে গেছে। এর থেকে কি পরিত্রাণ মিলবে না আমাদের?

আজকাল সরকারি চাকরি পেতে মেধা-যোগ্যতার পাশাপাশি ঘুস প্রদানের সামর্থ্যও একটি বড় যোগ্যতা হিসাবে বিবেচিত। একটি সরকারি অফিসের পিয়নের চাকরি পেতেও নাকি পাঁচ লাখ পর্যন্ত ঘুস গুনতে হয়। পুলিশের এক কনস্টেবলের চাকরি পেতে লাগে আট-দশ লাখ। যত ওপরে যাবেন, টাকার অঙ্ক তত বড় হবে। তো যারা এ বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করে চাকরি হস্তগত করে, চাকরিতে প্রবেশের পর তারা সে টাকাটা বৈধ-অবৈধ উপায়ে আদায় করে নেওয়ার চেষ্টা তো করবেই।

ঘুস নেওয়ার বিষয়টি চক্রাকারে ঘুরছে। আমি চাকরি নিতে দশ লাখ টাকা দিয়েছি; এখন আমার কাছে কেউ চাকরি কিংবা পরিষেবা নিতে এলে ঘুস নিব বলে এটাকে স্বাভাবিক বিষয় হিসাবে দাবি করতেই পারে সবাই। কিন্তু তবুও এ সামাজিক ব্যাধিটির সঠিক চিকিৎসা দরকার। না হলে একটা সময় আসবে, ঘুসের কারিশমায় সব ক্ষেত্রে অযোগ্যেদের প্রবেশ ঘটবে আর মেধাবীরা পড়ে থাকবে পেছনে। এর ফলে দেশ মেধাহীনদের দখলে চলে যাবে।

ঘুস নিয়ে অনেক লেখালেখি, প্রচার-প্রচারণা হয়েছে, হচ্ছে; কিন্তু সঠিক সমাধান করতে হলে আরও তৎপর হতে হবে। কেউ ঘুস গ্রহণ কিংবা প্রদান করলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে কেউ ঘুস নেওয়ার সাহস পাবে না। নড়বড়ে শাসন ব্যবস্থার ফলে মানুষের নৈতিকতা হারিয়ে যায়। আর তখনই মানুষ ঘুস নিয়ে থাকে। ঘুস গ্রহণকারী ও প্রদানকারী উভয়কেই শাস্তিস্বরূপ জেল-জরিমানা ও সমাজ থেকে বহিষ্কার করতে হবে। তাহলে ঘুস সংক্রান্ত দুর্নীতি পুরোদমে নির্মূল করা সম্ভব। ঘুস রোধে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। যে আইনগুলো ঘুস রোধে কার্যকর হচ্ছে না, তা সংশোধন করতে হবে। কারণ, আইনের শাসন ঘুস রোধ করতে সক্ষম। এজন্য বিচার বিভাগের অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

শিক্ষার্থী, নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন