ব্যবসায় বাঙালিয়ানা দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশে ভূমিকা রাখছে
jugantor
ব্যবসায় বাঙালিয়ানা দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশে ভূমিকা রাখছে

  ফাবিহা বিনতে হক  

২৪ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোনো দেশকে জানতে হলে প্রথমেই ওই দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। কেননা, সংস্কৃতি বলতে কোনো দেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনাচরণকেই বুঝিয়ে থাকে। তাই জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচরণ কোনোকিছুই দেশটির সংস্কৃতি থেকে আলাদা নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মূল্যবোধ, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তিত হলেও কিছু অভ্যাস দিনের পর দিন মানুষ ধারণ করে থাকে শেকড়কে ধরে রাখার প্রয়াসে। সেসব হাজার বছরের সংস্কৃতিকেই আমরা লোকজ সংস্কৃতি বলে থাকি।

তবে কোনো দেশের সংস্কৃতি ততদিনই স্থায়ী হবে, যতদিন এই সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে অর্থনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হবে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, মসলিন কাপড়ের কথা। মোগল আমলে বাংলাদেশে মসলিন ছিল সবচেয়ে উৎকৃষ্ট এবং দামি কাপড়। ‘পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি’ শীর্ষক গ্রন্থে মসলিন সম্পর্কে বিশেষ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। এতে মোটা ধরনের মসলিনকে মলোচিনা, প্রশস্ত ও মসৃণ মসলিনকে মোনাচি এবং সর্বোৎকৃষ্ট মসলিনকে গেনজেটিক বা গঙ্গাজলী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নবম শতকে রচিত আরব ভৌগোলিক সোলাইমানের ‘সিলসিলাত উত তাওয়ারীখে’ ‘রুমি’ নামক একটি রাজ্যের বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে এমন সূক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র পাওয়া যেত যে, এক টুকরো কাপড় একটি আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে নাড়াচড়া করানো যেত। আর এই রুমি রাজ্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন ধরা হয়।

ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে উনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করা বস্ত্রের উপরে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনে প্রস্তুত করা আমদানিকৃত কাপড়ের উপরে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ কর ছিল। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতশিল্পে ধস নামে। ফলে আস্তে আস্তে মসলিন বাংলার বুক থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে এবং একটা সময় মসলিন হারিয়ে যায়। এভাবে কোনো দেশের সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়ন না করলে তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি এবং নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

বিগত কয়েক বছর ধরে দেশীয় ডিজাইনের কাপড় বিক্রি করার ধুম পড়ে গেছে দোকানে দোকানে। আজকাল সামাজিক মাধ্যম খুললেই দেখা যায়, দেশীয় সুতি কাপড়ের কুর্তি, থ্রিপিস, তাঁতের শাড়ি, মণিপুরী শাড়ি, জামদানি শাড়ি কেনার অনলাইন শপ। এমন কী অলঙ্কারের ক্ষেত্রেও নারীরা বর্তমানে ডায়মন্ড বা সিটিগোল্ড বাদ দিয়ে মাটি, কাপড়, কাঠ, এন্টিকের তৈরি গহনার দিকে বেশি ঝুঁকছে। কয়েকটি শাড়ির পেজ ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যায়, শাড়ির আঁচল জুড়ে আছে রবীন্দ্র, নজরুল, লালনের কবিতা/গানের লাইন। শুধু পোশাকের ক্ষেত্রেই নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় এবং জেলা শহরগুলোর রেস্টুরেন্ট বা কফিশপগুলো বাঙালি সাংস্কৃতিক আবহে সাজানো হচ্ছে। এমনকি তৈজসপত্রেও আনা হচ্ছে গ্রামবাংলার ছোঁয়া। সেখানে বাজানো হচ্ছে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, হাছন, লালনের গান।

কয়েক বছর আগেও ইন্ডিয়ান সিরিয়াল থেকে অনুপ্রাণিত পাখি, কিরণমালা ইত্যাদি বাহারি নামের ভারতীয় পোশাক কেনার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল ঈদ, পূজা-পার্বণে। এসব জামা কিনতে না পারার দুঃখে পত্রিকার পাতায় আত্মহত্যার খবরও শোনা যেত। এই অন্ধ অনুকরণ থেকে বের হয়ে নিজেদের কৃষ্টি কালচার বাঁচিয়ে রাখার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে দেশে, তা সত্যিই দেশের দৃষ্টান্তমূলক উন্নয়ন।

শিল্পায়ন-নগরায়ণের এ যুগে কোনো দেশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে ভোগবাদের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা আপাতদৃষ্টিতে নেই। ‘গ্রাম হয়ে যাবে শহর’-এটিই নগরায়ণের মূলনীতি। এভাবে দেশের গ্রামীণ সমাজ এবং সংস্কৃতিও হারিয়ে যাবে কালের বিবর্তনে মসলিন কাপড়ের মতো, যদি না এই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা হয় অর্থনীতি দিয়ে। তাই ব্যবসায় ক্ষেত্রে বাঙালিয়ানা নিঃসন্দেহে দেশের সংস্কৃতিতে একটি বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক পরিবর্তন।

শিক্ষার্থী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

ব্যবসায় বাঙালিয়ানা দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশে ভূমিকা রাখছে

 ফাবিহা বিনতে হক 
২৪ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোনো দেশকে জানতে হলে প্রথমেই ওই দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। কেননা, সংস্কৃতি বলতে কোনো দেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনাচরণকেই বুঝিয়ে থাকে। তাই জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচরণ কোনোকিছুই দেশটির সংস্কৃতি থেকে আলাদা নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মূল্যবোধ, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তিত হলেও কিছু অভ্যাস দিনের পর দিন মানুষ ধারণ করে থাকে শেকড়কে ধরে রাখার প্রয়াসে। সেসব হাজার বছরের সংস্কৃতিকেই আমরা লোকজ সংস্কৃতি বলে থাকি।

তবে কোনো দেশের সংস্কৃতি ততদিনই স্থায়ী হবে, যতদিন এই সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে অর্থনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হবে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, মসলিন কাপড়ের কথা। মোগল আমলে বাংলাদেশে মসলিন ছিল সবচেয়ে উৎকৃষ্ট এবং দামি কাপড়। ‘পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি’ শীর্ষক গ্রন্থে মসলিন সম্পর্কে বিশেষ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। এতে মোটা ধরনের মসলিনকে মলোচিনা, প্রশস্ত ও মসৃণ মসলিনকে মোনাচি এবং সর্বোৎকৃষ্ট মসলিনকে গেনজেটিক বা গঙ্গাজলী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নবম শতকে রচিত আরব ভৌগোলিক সোলাইমানের ‘সিলসিলাত উত তাওয়ারীখে’ ‘রুমি’ নামক একটি রাজ্যের বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে এমন সূক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র পাওয়া যেত যে, এক টুকরো কাপড় একটি আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে নাড়াচড়া করানো যেত। আর এই রুমি রাজ্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন ধরা হয়।

ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে উনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করা বস্ত্রের উপরে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনে প্রস্তুত করা আমদানিকৃত কাপড়ের উপরে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ কর ছিল। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতশিল্পে ধস নামে। ফলে আস্তে আস্তে মসলিন বাংলার বুক থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে এবং একটা সময় মসলিন হারিয়ে যায়। এভাবে কোনো দেশের সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়ন না করলে তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি এবং নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

বিগত কয়েক বছর ধরে দেশীয় ডিজাইনের কাপড় বিক্রি করার ধুম পড়ে গেছে দোকানে দোকানে। আজকাল সামাজিক মাধ্যম খুললেই দেখা যায়, দেশীয় সুতি কাপড়ের কুর্তি, থ্রিপিস, তাঁতের শাড়ি, মণিপুরী শাড়ি, জামদানি শাড়ি কেনার অনলাইন শপ। এমন কী অলঙ্কারের ক্ষেত্রেও নারীরা বর্তমানে ডায়মন্ড বা সিটিগোল্ড বাদ দিয়ে মাটি, কাপড়, কাঠ, এন্টিকের তৈরি গহনার দিকে বেশি ঝুঁকছে। কয়েকটি শাড়ির পেজ ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যায়, শাড়ির আঁচল জুড়ে আছে রবীন্দ্র, নজরুল, লালনের কবিতা/গানের লাইন। শুধু পোশাকের ক্ষেত্রেই নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় এবং জেলা শহরগুলোর রেস্টুরেন্ট বা কফিশপগুলো বাঙালি সাংস্কৃতিক আবহে সাজানো হচ্ছে। এমনকি তৈজসপত্রেও আনা হচ্ছে গ্রামবাংলার ছোঁয়া। সেখানে বাজানো হচ্ছে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, হাছন, লালনের গান।

কয়েক বছর আগেও ইন্ডিয়ান সিরিয়াল থেকে অনুপ্রাণিত পাখি, কিরণমালা ইত্যাদি বাহারি নামের ভারতীয় পোশাক কেনার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল ঈদ, পূজা-পার্বণে। এসব জামা কিনতে না পারার দুঃখে পত্রিকার পাতায় আত্মহত্যার খবরও শোনা যেত। এই অন্ধ অনুকরণ থেকে বের হয়ে নিজেদের কৃষ্টি কালচার বাঁচিয়ে রাখার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে দেশে, তা সত্যিই দেশের দৃষ্টান্তমূলক উন্নয়ন।

শিল্পায়ন-নগরায়ণের এ যুগে কোনো দেশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে ভোগবাদের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা আপাতদৃষ্টিতে নেই। ‘গ্রাম হয়ে যাবে শহর’-এটিই নগরায়ণের মূলনীতি। এভাবে দেশের গ্রামীণ সমাজ এবং সংস্কৃতিও হারিয়ে যাবে কালের বিবর্তনে মসলিন কাপড়ের মতো, যদি না এই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা হয় অর্থনীতি দিয়ে। তাই ব্যবসায় ক্ষেত্রে বাঙালিয়ানা নিঃসন্দেহে দেশের সংস্কৃতিতে একটি বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক পরিবর্তন।

শিক্ষার্থী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন