ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা
jugantor
ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা

  আর কে চৌধুরী  

০১ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৬ ডিসেম্বর আমাদের গৌরবদীপ্ত মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধের মহান বিজয়। এই বিজয় এক দিনে আসেনি। একটানা ৯টি মাস সশস্ত্র যুদ্ধ শুধু নয়, তারও আগে নিতে হয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রস্তুতি।

সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে জাতির রায় মেনে নিতে চায়নি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ‘যার হাতে যা আছে, তাই নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা’র আহ্বান জানান তিনি। ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাঙালির বুকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র বোনা হয়ে যায় সেই দিনই। সেদিন থেকে আর বাঙালিকে দাবিয়ে রাখা যায়নি। আর সে কারণেই ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের নামে বাঙালি নিধন শুরু হলেও রুখে দাঁড়াতে সময় নেয়নি বীর বাঙালি। ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠে মুক্তির যুদ্ধে শামিল হয় সমগ্র জাতি।

বাঙালি জাতি যে এক উপনিবেশ থেকে আরেক উপনিবেশের শোষণে পড়েছিল, সেটা ১৯৪৭ সালেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে চায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী-১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে এটাও স্পষ্ট হয়ে যায়। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জাতিকে একটু একটু করে প্রস্তুত করতে হয়েছে। এক দিনে হুট করে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে নেমে যায়নি জাতি। এ জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভেতর দিয়েই জাতি পেয়ে যায় দিকনির্দেশনা। সেদিনই স্থির হয়ে যায় বাঙালির ভাগ্য। পাকিস্তানি শোষণের জাঁতাকল থেকে মুক্তির পথ যেন খুঁজে পায় বাঙালি জাতি; যার ফলে আমরা দেখি, একাত্তরে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরই যেন হয়ে উঠেছিল একেকটি দুর্গ। ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে কাউকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দেশকে শত্রুমুক্ত করার প্রত্যয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল বাঙালি। স্বীকার করতে হয়েছিল অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা।

বাঙালি জাতির কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত। পাঁচ হাজার বছর আগেও এ ভূখণ্ডের অধিবাসীদের বীরত্ব সম্পর্কে সমীহ করা হতো। মহাবীর আলেকজান্ডারের সঙ্গীরা এই বীর জাতির শৌর্যবীর্যের প্রশংসা করেছেন। আড়াই হাজার বছর আগে রোমান কবি ভার্জিলের কবিতায় গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের অধিবাসীদের বীর বন্দনা প্রকাশ পেয়েছে। সেই প্রাচীনকালে বাঙালি বীর বিজয় সিংহ লঙ্কা জয় করে দূরদেশেও নিজেদের কৃতিত্ব দেখান। তারপরও বলা যায়, ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা এ ভূখণ্ডের মানুষের ভাগ্যের ইতিহাস খুব একটা সুখকর ছিল না। এ দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য বিদেশি হানাদাররা বারবার

আঘাত হেনেছে। বৈদেশিক আধিপত্যে এক পর্যায়ে বাঙালি তার স্বকীয় মর্যাদাও হারিয়ে ফেলে।

বাঙালি মুসলমানদের অগ্রণী ভূমিকায় ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও শুরুতেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয় পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-বুড়িগঙ্গা পাড়ের মানুষ। সংখ্যালঘিষ্ঠ পশ্চিম পাকিস্তানিরাই এ দেশের ভাগ্য-বিধাতা হয়ে ওঠে। শোষণ ও নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয় বাঙালিরা। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান বাঙালির সাহসী নেতা বঙ্গবন্ধু।

১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হলে পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। শুধু তাই নয়, তারা একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতের আঁধারে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় গণহত্যা। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয় এবং শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। জাতি এ বছর একাত্তরের মহান বিজয়ের ৫০তম বার্ষিকী পালন করবে। একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা। বিগত ৫০ বছরে দেশ অনেক এগিয়ে গেলেও কাক্সিক্ষত সে লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।

লাখো প্রাণের বিনিময়ে, রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন দারিদ্র্যমুক্ত হবে দেশ, দেশের সব মানুষ হবে স্বনির্ভর।

মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা

 আর কে চৌধুরী 
০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৬ ডিসেম্বর আমাদের গৌরবদীপ্ত মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধের মহান বিজয়। এই বিজয় এক দিনে আসেনি। একটানা ৯টি মাস সশস্ত্র যুদ্ধ শুধু নয়, তারও আগে নিতে হয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রস্তুতি।

সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে জাতির রায় মেনে নিতে চায়নি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ‘যার হাতে যা আছে, তাই নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা’র আহ্বান জানান তিনি। ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাঙালির বুকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র বোনা হয়ে যায় সেই দিনই। সেদিন থেকে আর বাঙালিকে দাবিয়ে রাখা যায়নি। আর সে কারণেই ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের নামে বাঙালি নিধন শুরু হলেও রুখে দাঁড়াতে সময় নেয়নি বীর বাঙালি। ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠে মুক্তির যুদ্ধে শামিল হয় সমগ্র জাতি।

বাঙালি জাতি যে এক উপনিবেশ থেকে আরেক উপনিবেশের শোষণে পড়েছিল, সেটা ১৯৪৭ সালেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে চায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী-১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে এটাও স্পষ্ট হয়ে যায়। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জাতিকে একটু একটু করে প্রস্তুত করতে হয়েছে। এক দিনে হুট করে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে নেমে যায়নি জাতি। এ জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভেতর দিয়েই জাতি পেয়ে যায় দিকনির্দেশনা। সেদিনই স্থির হয়ে যায় বাঙালির ভাগ্য। পাকিস্তানি শোষণের জাঁতাকল থেকে মুক্তির পথ যেন খুঁজে পায় বাঙালি জাতি; যার ফলে আমরা দেখি, একাত্তরে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরই যেন হয়ে উঠেছিল একেকটি দুর্গ। ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে কাউকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দেশকে শত্রুমুক্ত করার প্রত্যয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল বাঙালি। স্বীকার করতে হয়েছিল অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা।

বাঙালি জাতির কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত। পাঁচ হাজার বছর আগেও এ ভূখণ্ডের অধিবাসীদের বীরত্ব সম্পর্কে সমীহ করা হতো। মহাবীর আলেকজান্ডারের সঙ্গীরা এই বীর জাতির শৌর্যবীর্যের প্রশংসা করেছেন। আড়াই হাজার বছর আগে রোমান কবি ভার্জিলের কবিতায় গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের অধিবাসীদের বীর বন্দনা প্রকাশ পেয়েছে। সেই প্রাচীনকালে বাঙালি বীর বিজয় সিংহ লঙ্কা জয় করে দূরদেশেও নিজেদের কৃতিত্ব দেখান। তারপরও বলা যায়, ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা এ ভূখণ্ডের মানুষের ভাগ্যের ইতিহাস খুব একটা সুখকর ছিল না। এ দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য বিদেশি হানাদাররা বারবার

আঘাত হেনেছে। বৈদেশিক আধিপত্যে এক পর্যায়ে বাঙালি তার স্বকীয় মর্যাদাও হারিয়ে ফেলে।

বাঙালি মুসলমানদের অগ্রণী ভূমিকায় ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও শুরুতেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয় পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-বুড়িগঙ্গা পাড়ের মানুষ। সংখ্যালঘিষ্ঠ পশ্চিম পাকিস্তানিরাই এ দেশের ভাগ্য-বিধাতা হয়ে ওঠে। শোষণ ও নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয় বাঙালিরা। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান বাঙালির সাহসী নেতা বঙ্গবন্ধু।

১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হলে পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। শুধু তাই নয়, তারা একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতের আঁধারে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় গণহত্যা। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয় এবং শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। জাতি এ বছর একাত্তরের মহান বিজয়ের ৫০তম বার্ষিকী পালন করবে। একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা। বিগত ৫০ বছরে দেশ অনেক এগিয়ে গেলেও কাক্সিক্ষত সে লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।

লাখো প্রাণের বিনিময়ে, রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন দারিদ্র্যমুক্ত হবে দেশ, দেশের সব মানুষ হবে স্বনির্ভর।

মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন