বিত্তের পাশাপাশি গড়ে উঠুক চিত্ত
jugantor
বিত্তের পাশাপাশি গড়ে উঠুক চিত্ত

  ফেরদৌসী  

২৯ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মহান সাধক জালালউদ্দিন রুমির একটি বিখ্যাত উক্তি হলো-‘ভেতরটা শান্ত হতে দাও, তাহলে যা-কিছু দেখতে চাও, সবই ওখানে প্রতিবিম্বিত হবে।’ কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে শান্ত ও সুস্থির হওয়ার সুযোগ অনেকেরই কম। আমাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। বেড়েছে অসহিষ্ণুতা, তিক্ততা, সম্পর্কের টানাপোড়েন। যে কোনো কাজ দায়সারাভাবে করি, মন দিয়ে করতে পারি না। এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পড়ছে পারিবারিক, পেশাগত ও সামাজিক জীবনে।

সুখ ও প্রশান্তি শব্দ দুটি আমাদের অনেকেরই জীবনে অধরা। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এ থেকে উত্তরণের পথটি কোথায়? সুখ, প্রশান্তি এমনি এমনি আসে না। একে তৈরি করে নিতে হয়। একে আমন্ত্রণ জানাতে হয়। এই তৈরি করার কারিগর হচ্ছি আমরা নিজেরাই। নিজের মনরূপী সফটওয়্যারের প্রতি যত মনোনিবেশ করব এবং যত মনকে সুস্থির ও প্রশান্ত করতে পারব, আলাদীনের দৈত্যের মতো সে আমার হুকুম পালন করবে। সুখ ও সাফল্যের রচয়িতা হব আমি নিজেই।

মনকে প্রশান্ত করার এক চিরায়ত প্রক্রিয়া হলো ধ্যান-মোরাকাবা বা মেডিটেশন। মেডিটেশন মনকে স্থির করে। দেহকে শিথিল করে। মনকে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন করে তোলে। মনোযোগকে করে তোলে লক্ষ্যভেদী। মনের শক্তি হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। মেডিটেশনের স্তরেই একজন মানুষ তার মস্তিষ্ককে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাতে পারে। ৭৫ শতাংশ অসংক্রামক ব্যাধি বা রোগ থেকে মুক্ত করে, নিজের কাজ সবচেয়ে ভালোভাবে করার সামর্থ্য জোগায়, মস্তিষ্ককে করে শানিত, আচরণে করে বিনয়ী, হৃদয়কে করে সমমর্মী, আত্মাকে করে তৃপ্ত, চিত্তকে করে প্রশান্ত, ব্যক্তিত্বকে করে আর্কষণীয় ও শুদ্ধাচারী।

যে মেডিটেশনের উপকারিতা বহুমুখী ও অগণিত, সেই মেডিটেশন বা ধ্যানের ওপর ভ্যাট বা মূসক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। এর আগেও এমন প্রস্তাব এসেছিল, তবে বিজ্ঞ-বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিতে তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। কারণ, ধ্যান হলো মানসিক স্বাস্থ্য-সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকরী উপায়।

উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রণীত জাতীয় চিকিৎসা নীতিমালায় (পৃষ্ঠা ১৮) বলা হয়েছে, চিকিৎসকদের উচিত কার্যকরভাবে স্ট্রেসমুক্তি ও শিথিলায়নের জন্য উচ্চরক্তচাপের রোগীকে মেডিটেশনে উৎসাহিত করা। একটু যুক্তিবাদী ও বিবেচনাসম্পন্ন মানুষ হিসাবে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, একজন চিকিৎসকের কাছে যখন আমরা চিকিৎসাসেবা নিই, একজন শিক্ষকের কাছে যখন পড়তে যাই, আমরা কি তাকে ভ্যাট দিই? আসলে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা যেরকম মৌলিক অধিকার, মেডিটেশন বা ধ্যানও তেমনই মানুষের মৌলিক অধিকার। এটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য-সুরক্ষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর ওপর ভ্যাট আরোপিত হয় কীভাবে? মেডিটেশনের উৎস ভূমি হচ্ছে এ প্রাচ্য। প্রায় চার হাজার বছর আগে আমাদের মুনিঋষি, দরবেশ ও মহামানবেরা মেডিটেশনের চর্চা করেছেন। এ ধ্যান প্রক্রিয়া সবার জন্য এত কার্যকরী বলে পাশ্চাত্য তার চিকিৎসাসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসাবে মেডিটেশনকে গ্রহণ করছে। চিকিৎসাসেবার মান অক্ষুণ্ন রাখতে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা করছেন। পৃথিবীর বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ড, এমআইটি, স্ট্যানফোর্টের মতো বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় এখন সুখী জীবনের পাঠ দিচ্ছে। তাদের ক্যারিকুলামে সংযুক্ত করছে মেডিটেশন।

আমরা সব সময় প্রগতির পক্ষে, জ্ঞান ও সত্যের পক্ষে। যে ধ্যান থেকে সরে গেল, সে আলোকিত জীবন গড়ার ক্ষেত্রে অনেক ধাপ পিছিয়ে গেল। ধ্যানের পথে এগোলেই জ্ঞানের পথে বিচরণ করা সহজ হয়। সত্যনিষ্ঠ ও নৈতিকতার মানদণ্ডে নিজেকে গড়ে তুলতে ধ্যানের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের বিত্তবৈভব অনেক বেড়েছে; কিন্তু এখন সময় দেওয়ার প্রয়োজন পড়েছে চিত্ত তৈরির। এমন কোনো সিদ্ধান্ত যেন আমরা না নিই, যার ক্ষতিপূরণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দিলেও শোধ হবে না।

বর্তমানে আমাদের সন্তানদের হয়তো আমরা ভালো ছাত্র বানাতে পারছি; কিন্তু ভালো মানুষ বানাতে ব্যর্থ হচ্ছি। এই ভালো মানুষ, নৈতিক ও মানবিক মানুষ গড়তে মেডিটেশনকে সম্প্রসারিত করতে হবে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও সর্বস্তরের জনসাধারণকে মেডিটেশনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এজন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত আহ্বান জানাই-মেডিটেশনের ওপর স্থায়ীভাবে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে সমৃদ্ধ ও শুদ্ধাচারী জাতি গঠনে প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিন। কারণ, এ দেশ আমাদের মা; এ মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি। এ দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করুন। আসুন, মেডিটেশন করুন। মেডিটেশনের এ প্রশান্তি ও সুস্থতার বাণী ছড়িয়ে দিন চারপাশে। ধ্যানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে, সেই সঙ্গে ঘটবে সামগ্রিক পরিবর্তনের সূচনা।

মেডিটেশন চর্চাকারী

বিত্তের পাশাপাশি গড়ে উঠুক চিত্ত

 ফেরদৌসী 
২৯ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মহান সাধক জালালউদ্দিন রুমির একটি বিখ্যাত উক্তি হলো-‘ভেতরটা শান্ত হতে দাও, তাহলে যা-কিছু দেখতে চাও, সবই ওখানে প্রতিবিম্বিত হবে।’ কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে শান্ত ও সুস্থির হওয়ার সুযোগ অনেকেরই কম। আমাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। বেড়েছে অসহিষ্ণুতা, তিক্ততা, সম্পর্কের টানাপোড়েন। যে কোনো কাজ দায়সারাভাবে করি, মন দিয়ে করতে পারি না। এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পড়ছে পারিবারিক, পেশাগত ও সামাজিক জীবনে।

সুখ ও প্রশান্তি শব্দ দুটি আমাদের অনেকেরই জীবনে অধরা। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এ থেকে উত্তরণের পথটি কোথায়? সুখ, প্রশান্তি এমনি এমনি আসে না। একে তৈরি করে নিতে হয়। একে আমন্ত্রণ জানাতে হয়। এই তৈরি করার কারিগর হচ্ছি আমরা নিজেরাই। নিজের মনরূপী সফটওয়্যারের প্রতি যত মনোনিবেশ করব এবং যত মনকে সুস্থির ও প্রশান্ত করতে পারব, আলাদীনের দৈত্যের মতো সে আমার হুকুম পালন করবে। সুখ ও সাফল্যের রচয়িতা হব আমি নিজেই।

মনকে প্রশান্ত করার এক চিরায়ত প্রক্রিয়া হলো ধ্যান-মোরাকাবা বা মেডিটেশন। মেডিটেশন মনকে স্থির করে। দেহকে শিথিল করে। মনকে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন করে তোলে। মনোযোগকে করে তোলে লক্ষ্যভেদী। মনের শক্তি হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। মেডিটেশনের স্তরেই একজন মানুষ তার মস্তিষ্ককে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাতে পারে। ৭৫ শতাংশ অসংক্রামক ব্যাধি বা রোগ থেকে মুক্ত করে, নিজের কাজ সবচেয়ে ভালোভাবে করার সামর্থ্য জোগায়, মস্তিষ্ককে করে শানিত, আচরণে করে বিনয়ী, হৃদয়কে করে সমমর্মী, আত্মাকে করে তৃপ্ত, চিত্তকে করে প্রশান্ত, ব্যক্তিত্বকে করে আর্কষণীয় ও শুদ্ধাচারী।

যে মেডিটেশনের উপকারিতা বহুমুখী ও অগণিত, সেই মেডিটেশন বা ধ্যানের ওপর ভ্যাট বা মূসক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। এর আগেও এমন প্রস্তাব এসেছিল, তবে বিজ্ঞ-বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিতে তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। কারণ, ধ্যান হলো মানসিক স্বাস্থ্য-সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকরী উপায়।

উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রণীত জাতীয় চিকিৎসা নীতিমালায় (পৃষ্ঠা ১৮) বলা হয়েছে, চিকিৎসকদের উচিত কার্যকরভাবে স্ট্রেসমুক্তি ও শিথিলায়নের জন্য উচ্চরক্তচাপের রোগীকে মেডিটেশনে উৎসাহিত করা। একটু যুক্তিবাদী ও বিবেচনাসম্পন্ন মানুষ হিসাবে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, একজন চিকিৎসকের কাছে যখন আমরা চিকিৎসাসেবা নিই, একজন শিক্ষকের কাছে যখন পড়তে যাই, আমরা কি তাকে ভ্যাট দিই? আসলে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা যেরকম মৌলিক অধিকার, মেডিটেশন বা ধ্যানও তেমনই মানুষের মৌলিক অধিকার। এটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য-সুরক্ষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর ওপর ভ্যাট আরোপিত হয় কীভাবে? মেডিটেশনের উৎস ভূমি হচ্ছে এ প্রাচ্য। প্রায় চার হাজার বছর আগে আমাদের মুনিঋষি, দরবেশ ও মহামানবেরা মেডিটেশনের চর্চা করেছেন। এ ধ্যান প্রক্রিয়া সবার জন্য এত কার্যকরী বলে পাশ্চাত্য তার চিকিৎসাসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসাবে মেডিটেশনকে গ্রহণ করছে। চিকিৎসাসেবার মান অক্ষুণ্ন রাখতে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা করছেন। পৃথিবীর বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ড, এমআইটি, স্ট্যানফোর্টের মতো বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় এখন সুখী জীবনের পাঠ দিচ্ছে। তাদের ক্যারিকুলামে সংযুক্ত করছে মেডিটেশন।

আমরা সব সময় প্রগতির পক্ষে, জ্ঞান ও সত্যের পক্ষে। যে ধ্যান থেকে সরে গেল, সে আলোকিত জীবন গড়ার ক্ষেত্রে অনেক ধাপ পিছিয়ে গেল। ধ্যানের পথে এগোলেই জ্ঞানের পথে বিচরণ করা সহজ হয়। সত্যনিষ্ঠ ও নৈতিকতার মানদণ্ডে নিজেকে গড়ে তুলতে ধ্যানের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের বিত্তবৈভব অনেক বেড়েছে; কিন্তু এখন সময় দেওয়ার প্রয়োজন পড়েছে চিত্ত তৈরির। এমন কোনো সিদ্ধান্ত যেন আমরা না নিই, যার ক্ষতিপূরণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দিলেও শোধ হবে না।

বর্তমানে আমাদের সন্তানদের হয়তো আমরা ভালো ছাত্র বানাতে পারছি; কিন্তু ভালো মানুষ বানাতে ব্যর্থ হচ্ছি। এই ভালো মানুষ, নৈতিক ও মানবিক মানুষ গড়তে মেডিটেশনকে সম্প্রসারিত করতে হবে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও সর্বস্তরের জনসাধারণকে মেডিটেশনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এজন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত আহ্বান জানাই-মেডিটেশনের ওপর স্থায়ীভাবে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে সমৃদ্ধ ও শুদ্ধাচারী জাতি গঠনে প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিন। কারণ, এ দেশ আমাদের মা; এ মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি। এ দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করুন। আসুন, মেডিটেশন করুন। মেডিটেশনের এ প্রশান্তি ও সুস্থতার বাণী ছড়িয়ে দিন চারপাশে। ধ্যানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে, সেই সঙ্গে ঘটবে সামগ্রিক পরিবর্তনের সূচনা।

মেডিটেশন চর্চাকারী

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন