কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে
jugantor
কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে

  আবু আফজাল সালেহ  

০৩ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইদানীং দেশের বিভিন্ন রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। কয়েক মাসের উল্লেখযোগ্য কিছু সংবাদ শিরোনাম এমন-ভৈরবে এক বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে ৬৫ জনের মৃত্যু, নীলফামারীতে বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের ধাক্কায় প্রাণ গেল ৩ শ্রমিকের (২২ জানুয়ারি ২০২২), ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেনের ধাক্কায় সালমা (২৫) নামের এক যুবতী নিহত (২৭ জানুয়ারি, ২০২২), দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায় কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে প্রাইভেটকারের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন (২ ফেব্রুয়ারি ২০২২), রাজধানীর কাওরান বাজারে রেলগেট এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় মো. মনির হোসেন (৪৮) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন (২৪ জানুয়ারি, ২০২২), বগুড়ায় ট্রেনের ধাক্কায় জোহরা বেওয়া (৯০) নামের এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন (২০ জানুয়ারি, ২০২২), গাজীপুরের কালীগঞ্জ ও পূবাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত দুই যুবক নিহত হয়েছেন (১৮ জানুয়ারি, ২০২২), বগুড়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে মনিষা রহমান স্বর্ণা (১৬) নামের এক স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে (১৭ জানুয়ারি, ২০২২), ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ গেল এইচএসসি পরীক্ষার্থীর (১১ জানুয়ারি ২০২২), আখাউড়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে যুবকের মৃত্যু (৯ জানুয়ারি ২০২২), কুড়িলে ট্রেনের ধাক্কায় নারীর মৃত্যু (১০ জানুয়ারি ২০২২), রেললাইনে বসে ভিডিওগেম খেলার সময় কিশোরের মৃত্যু (১২ জানুয়ারি ২০২২), ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ গেল এইচএসসি পরীক্ষার্থীর (১১ জানুয়ারি ২০২২), আখাউড়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে যুবকের মৃত্যু (৯ জানুয়ারি ২০২২)। এসব খবর আমাদের সংকটের কথাই বলছে। তাই এসব দুর্ঘটনা নিয়ে ভাবতে হচ্ছেই।

রেলের হিসাবে, ২০১৪ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ছয় বছরে রেলে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৭৫ জন। এর মধ্যে ১৪৫ জনই প্রাণ হারিয়েছেন রেলক্রসিংয়ে।

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রতি বছর ১৭৮ জন মানুষ রেললাইনে মৃত্যুবরণ করছে। রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে মোট রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬১। এগুলোর মধ্যে অনুমোদন নেই ১ হাজার ৩২১টির। সরকারের কমবেশি পাঁচটি সংস্থা রেললাইনের ওপর সড়ক নির্মাণ করে থাকে।

এসব ক্রসিংয়ের বেশিরভাগই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়কে। এ ছাড়া গ্রামীণ সড়ক রয়েছে। রেল বিভাগেরও কিছু রেলক্রসিং আছে। হিসাব বলছে, দেশের ৮০ শতাংশের বেশি রেলক্রসিংই অরক্ষিত। লেভেলক্রসিং দিন দিন পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে। প্রতিনিয়তই প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। পঙ্গুত্ববরণ করছেন অনেকে। দুর্ঘটনা ঘটার পর বরাবর তদন্ত কমিটি গঠন করে দায় সারা হয়; কিন্তু পরে কী হলো, তা বেশিরভাগই ক্ষেত্রেই অন্ধকারে থেকে যায়।

বিভিন্ন পত্রিকার সূত্রমতে, রাজধানী ও আশপাশের ৩৫ কিলোমিটার রেলপথে ৫৮টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি অরক্ষিত ও অননুমোদিত। কিছু কিছু স্থানে গেটম্যান ও সিগনাল-বার নেই। এসব ক্রসিংয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।

নগরীতে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে যে ৯টি রেলক্রসিং চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো-মগবাজার, মালিবাগ, তেজগাঁও, সায়েদাবাদ, বিএফডিসি, বনানী, কুড়িল, মহাখালী ও খিলগাঁও রেলক্রসিং। শুধু ঢাকার কুড়িল রেলক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯০ বার ট্রেন চলাচল করে। নগরীতে শুধু রেলক্রসিংই অরক্ষিত নয়, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে রেললাইনও। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব রেলক্রসিংয়ে মানুষ ও যান চলাচল করে থাকে।

কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রেলওয়ে গতানুগতিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রায় সব প্রতিবেদনেরই ভাষা, সুপারিশ ও দায়ী করার পদ্ধতি একই। আবার জনবল সংকটও রয়েছে। রেলক্রসিংগুলোর অবস্থা কমবেশি এরকমই। গেট আছে তো গেটম্যান নেই। গেটম্যান আছে তো সিগনাল বাতি নেই।

ঝুঁকিপূর্ণ এসব লেভেল ক্রসিংয়ে রেল কর্তৃপক্ষ শুধু ‘সামনে রেলক্রসিং, সাবধানে চলাচল করুন’-এমন কিছু সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে থাকে। রেলওয়ে আইন অনুযায়ী লেভেলক্রসিংয়ের দুর্ঘটনার দায় নিতে রাজি নয় রেল কর্তৃপক্ষ।

লেভেলক্রসিংয়ে সড়ক নির্মাণের সময় রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বয় করা দরকার। সওজ অল্প কিছু মহাসড়কের উড়াল সড়ক নির্মাণ করেছে। এটার পরিমাণ আরও বাড়ানো যেতে পারে। রেলের নিজস্ব কিছু ক্রসিংয়ে পাহারাদার থাকলেও তাদের বেশিরভাগই অস্থায়ী। জনবল নিয়োগ, ব্যারিকেড বসানো, পাহারাদার নিয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে আরও চিন্তাভাবনা করা দরকার বলে মনে করি।

কবি ও প্রাবন্ধিক, গৌরীপুর, ময়মনসিংহ

abuafzalsaleh@gmail.com

কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে

 আবু আফজাল সালেহ 
০৩ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইদানীং দেশের বিভিন্ন রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। কয়েক মাসের উল্লেখযোগ্য কিছু সংবাদ শিরোনাম এমন-ভৈরবে এক বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে ৬৫ জনের মৃত্যু, নীলফামারীতে বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের ধাক্কায় প্রাণ গেল ৩ শ্রমিকের (২২ জানুয়ারি ২০২২), ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেনের ধাক্কায় সালমা (২৫) নামের এক যুবতী নিহত (২৭ জানুয়ারি, ২০২২), দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায় কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে প্রাইভেটকারের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন (২ ফেব্রুয়ারি ২০২২), রাজধানীর কাওরান বাজারে রেলগেট এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় মো. মনির হোসেন (৪৮) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন (২৪ জানুয়ারি, ২০২২), বগুড়ায় ট্রেনের ধাক্কায় জোহরা বেওয়া (৯০) নামের এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন (২০ জানুয়ারি, ২০২২), গাজীপুরের কালীগঞ্জ ও পূবাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত দুই যুবক নিহত হয়েছেন (১৮ জানুয়ারি, ২০২২), বগুড়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে মনিষা রহমান স্বর্ণা (১৬) নামের এক স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে (১৭ জানুয়ারি, ২০২২), ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ গেল এইচএসসি পরীক্ষার্থীর (১১ জানুয়ারি ২০২২), আখাউড়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে যুবকের মৃত্যু (৯ জানুয়ারি ২০২২), কুড়িলে ট্রেনের ধাক্কায় নারীর মৃত্যু (১০ জানুয়ারি ২০২২), রেললাইনে বসে ভিডিওগেম খেলার সময় কিশোরের মৃত্যু (১২ জানুয়ারি ২০২২), ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ গেল এইচএসসি পরীক্ষার্থীর (১১ জানুয়ারি ২০২২), আখাউড়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে যুবকের মৃত্যু (৯ জানুয়ারি ২০২২)। এসব খবর আমাদের সংকটের কথাই বলছে। তাই এসব দুর্ঘটনা নিয়ে ভাবতে হচ্ছেই।

রেলের হিসাবে, ২০১৪ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ছয় বছরে রেলে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৭৫ জন। এর মধ্যে ১৪৫ জনই প্রাণ হারিয়েছেন রেলক্রসিংয়ে।

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রতি বছর ১৭৮ জন মানুষ রেললাইনে মৃত্যুবরণ করছে। রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে মোট রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬১। এগুলোর মধ্যে অনুমোদন নেই ১ হাজার ৩২১টির। সরকারের কমবেশি পাঁচটি সংস্থা রেললাইনের ওপর সড়ক নির্মাণ করে থাকে।

এসব ক্রসিংয়ের বেশিরভাগই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়কে। এ ছাড়া গ্রামীণ সড়ক রয়েছে। রেল বিভাগেরও কিছু রেলক্রসিং আছে। হিসাব বলছে, দেশের ৮০ শতাংশের বেশি রেলক্রসিংই অরক্ষিত। লেভেলক্রসিং দিন দিন পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে। প্রতিনিয়তই প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। পঙ্গুত্ববরণ করছেন অনেকে। দুর্ঘটনা ঘটার পর বরাবর তদন্ত কমিটি গঠন করে দায় সারা হয়; কিন্তু পরে কী হলো, তা বেশিরভাগই ক্ষেত্রেই অন্ধকারে থেকে যায়।

বিভিন্ন পত্রিকার সূত্রমতে, রাজধানী ও আশপাশের ৩৫ কিলোমিটার রেলপথে ৫৮টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি অরক্ষিত ও অননুমোদিত। কিছু কিছু স্থানে গেটম্যান ও সিগনাল-বার নেই। এসব ক্রসিংয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।

নগরীতে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে যে ৯টি রেলক্রসিং চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো-মগবাজার, মালিবাগ, তেজগাঁও, সায়েদাবাদ, বিএফডিসি, বনানী, কুড়িল, মহাখালী ও খিলগাঁও রেলক্রসিং। শুধু ঢাকার কুড়িল রেলক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯০ বার ট্রেন চলাচল করে। নগরীতে শুধু রেলক্রসিংই অরক্ষিত নয়, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে রেললাইনও। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব রেলক্রসিংয়ে মানুষ ও যান চলাচল করে থাকে।

কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রেলওয়ে গতানুগতিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রায় সব প্রতিবেদনেরই ভাষা, সুপারিশ ও দায়ী করার পদ্ধতি একই। আবার জনবল সংকটও রয়েছে। রেলক্রসিংগুলোর অবস্থা কমবেশি এরকমই। গেট আছে তো গেটম্যান নেই। গেটম্যান আছে তো সিগনাল বাতি নেই।

ঝুঁকিপূর্ণ এসব লেভেল ক্রসিংয়ে রেল কর্তৃপক্ষ শুধু ‘সামনে রেলক্রসিং, সাবধানে চলাচল করুন’-এমন কিছু সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে থাকে। রেলওয়ে আইন অনুযায়ী লেভেলক্রসিংয়ের দুর্ঘটনার দায় নিতে রাজি নয় রেল কর্তৃপক্ষ।

লেভেলক্রসিংয়ে সড়ক নির্মাণের সময় রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বয় করা দরকার। সওজ অল্প কিছু মহাসড়কের উড়াল সড়ক নির্মাণ করেছে। এটার পরিমাণ আরও বাড়ানো যেতে পারে। রেলের নিজস্ব কিছু ক্রসিংয়ে পাহারাদার থাকলেও তাদের বেশিরভাগই অস্থায়ী। জনবল নিয়োগ, ব্যারিকেড বসানো, পাহারাদার নিয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে আরও চিন্তাভাবনা করা দরকার বলে মনে করি।

কবি ও প্রাবন্ধিক, গৌরীপুর, ময়মনসিংহ

abuafzalsaleh@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন