প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে যা করা প্রয়োজন
jugantor
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে যা করা প্রয়োজন

  ইউনুছ আলী  

২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিগত কয়েক বছরে দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় চমৎকার অগ্রগতি হয়েছে। এ অগ্রগতি সূচিত হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই। ১৯৭৩ সালে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা করেছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। শুধু কি তাই? প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বর্তমান সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের গৃহীত অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে, তিন দফার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই রঙিন বই তুলে দেওয়া, উপবৃত্তি কার্যক্রম, অনগ্রসর এলাকায় স্কুল ফিডিং চালু, সরকারি বিদ্যালয়ে দপ্তরি-কাম-প্রহরী নিয়োগ, সততা স্টোর, খুদে ডাক্তার কার্যক্রম ও স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করতে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু ও বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগও প্রশংসনীয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী প্রায় শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি, স্কাউটিং কার্যক্রম জোরদারকরণ, শিক্ষা ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সমতা আনা, নতুন শিক্ষাক্রমে নতুন পাঠ্যবই ও শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ নিঃসন্দেহে সরকারের অগ্রসর চিন্তার পরিচয় বহন করে। বলতে দ্বিধা নেই, বিভিন্ন ক্ষেত্রেই আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার সমধিক উন্নতি হয়েছে। তবে এত কিছুর পরও মানের দিক দিয়ে এখনো অনেক পিছিয়ে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার মাঠ পর্যায়ের একজন কর্মী হিসাবে নিচে কিছু বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরছি-

শুরুতেই বলা যায়, বেতন বৈষম্যের কথা। আমরা জানি, পশ্চিমা বিশ্বসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই শিক্ষকদের যথেষ্ট মূল্যায়ন করে এবং সম্মানজনক বেতন-ভাতা প্রদান করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। অনেক দাবিদাওয়ার পর ২০১৪ সালের ৯ মার্চ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। আমরা জানি, দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা মানে দশম গ্রেডের সুবিধাপ্রাপ্ত হওয়া। কিন্তু রহস্যজনক কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশটি অমান্য করা হলো। প্রধান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণবিহীন দুটি ভাগে ভাগ করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের দেওয়া হলো ১১তম গ্রেড এবং প্রশিক্ষণবিহীনদের দেওয়া হলো ১২তম গ্রেড। আর সহকারী শিক্ষদের ১৫তম গ্রেড থেকে এগিয়ে এনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের দেওয়া হলো ১৩তম গ্রেড এবং প্রশিক্ষণবিহীনদের দেওয়া হলো ১৪তম গ্রেড।

অতীতে প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড ব্যবধান ছিল এক। কিন্তু ২০১৪ সালের পর এসে সেই ব্যবধানটি তিনে গিয়ে ঠেকল। তারপর আবারও ঝামেলার শুরু। শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর ছেড়ে নেমে এলেন রাজপথে। সমাবেশ-মহাসমাবেশের পাশাপাশি হাইকোর্টে রিটও করা হলো। অবশেষে ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণবিহীন প্রথা বাতিল করে প্রধান শিক্ষকদের দেন ১১তম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষকদের দেন ১৩তম গ্রেড। কী এমন অসুবিধা ছিল-মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকদের এগারোতম গ্রেড দিয়ে দিলে? এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে প্রধান ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে। এ ছাড়া ডিপিএড ট্রেনিং করে বেতন কমে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ বিশাল সংখ্যক শিক্ষক। প্রকৃতপক্ষে এরা ক্ষতিগ্রস্তও। অন্যান্য সেক্টরে ট্রেনিং করলে আর্থিক সুবিধা বাড়ে; কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষকদের কমে যায়। কী অদ্ভুত! নিম্নধাপ-উচ্চধাপের মারপ্যাঁচে ফেলে বিরাট সংখ্যক শিক্ষককে এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা সত্যিই দুঃখজনক। ডিজিটাল বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণে অবিলম্বে এ অচলাবস্থার নিরসন হওয়া উচিত।

এবার আসা যাক শিক্ষক সংকটের কথায়। বর্তমান সরকার বিগত কয়েকবছরে অনেক শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশার তুলনায় তা অনেক কম। বর্তমানে সহকারী শিক্ষক নিয়োগদান চলমান থাকলেও প্রধান শিক্ষক পদে ২০১২ সালের পর আর কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অবশ্য ২০১৭ সালের ২৩ মে সিনিয়র সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে ১৬ হাজার জনকে চলতি দায়িত্ব দিয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাও প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। এখনো অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

লক্ষ করা যাচ্ছে, অনভিজ্ঞ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা দায়িত্ব পালনে যথারীতি হিমশিম খাচ্ছেন। অফিসিয়াল কাজের পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে বিদ্যালয় পরিচালনা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নিয়মিত প্রধান শিক্ষকরা লিডারশিপ ট্রেনিং পেলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের জন্য নেই কোনো ট্রেনিং। অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত। এ নিয়ে তারা প্রায়ই মনস্তাত্ত্বিক চাপে ভোগেন। মেজাজ হয় খিটখিটে। এদিকে অনেকেই পান না তার সহকারীর প্রয়োজনীয় সাপোর্ট। ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদেরও অনেক ক্ষেত্রে অসহযোগিতামূলক আচরণ করতে দেখা যায়। ম্যানেজিং কমিটির অনেক কর্তৃত্বপরায়ণ সদস্যকে বিভিন্ন অন্যায্য দাবি নিয়ে প্রধান শিক্ষকদের ওপর বল প্রয়োগ করতেও শোনা যায়। দাবি উঠেছে, শিক্ষা অফিসের মনিটরিং জোরদার করে ‘ম্যানেজিং কমিটি’ প্রথা বাতিল করার।

এমন হতাশাব্যঞ্জক অনেক কিছুই প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই অবগত যে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে আবার শিক্ষক বদলির বিষয়টি খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানেও দেখা যাচ্ছে শুভঙ্করের ফাঁকি। ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ১ঃ৪০-এর বেশি হলে এবং কর্মরত শিক্ষক চারজন বা তার কম হলে এ বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বদলি হতে পারছেন না। এতে হতাশার অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছেন বিরাটসংখ্যক শিক্ষক।

সরকার আন্তরিক; কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক কিছুই আলোর মুখ দেখছে না। এ অবস্থা কাম্য নয়। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান আরও বাড়ানো উচিত। চলমান পদ্ধতিতে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে যে ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে, তার আরও আধুনিকায়ন করা অত্যাবশ্যক। প্রশিক্ষণার্থী-শিক্ষকদের শুধু তাত্ত্বিকভাবে পড়ানোর প্রশিক্ষণ কাজে আসে না। ‘এভাবে পড়াতে হবে কিংবা ওভাবে’-এসব না বলে হাতেকলমে শিখিয়ে দিতে হবে। এর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

সম্প্রতি ইউনেস্কোর এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনাল ব্যুরো ফর এডুকেশন বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাবেই শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার নেপালে ৯০ শতাংশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় ৮২ শতাংশ, মালদ্বীপে ৭৮ শতাংশ, মিয়ানমারে ১০০ শতাংশ। আশা করছি, সরকার আরও সক্রিয়ভাবে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। হতাশার চোরাবালি দূরে সরিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি শুভ্রসফেদ বাংলাদেশ উপহার দেবেন ইনশাআল্লাহ।

প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)

কামালপুর (খ) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামালপুর, জকিগঞ্জ, সিলেট

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে যা করা প্রয়োজন

 ইউনুছ আলী 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিগত কয়েক বছরে দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় চমৎকার অগ্রগতি হয়েছে। এ অগ্রগতি সূচিত হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই। ১৯৭৩ সালে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা করেছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। শুধু কি তাই? প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বর্তমান সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের গৃহীত অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে, তিন দফার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই রঙিন বই তুলে দেওয়া, উপবৃত্তি কার্যক্রম, অনগ্রসর এলাকায় স্কুল ফিডিং চালু, সরকারি বিদ্যালয়ে দপ্তরি-কাম-প্রহরী নিয়োগ, সততা স্টোর, খুদে ডাক্তার কার্যক্রম ও স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করতে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু ও বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগও প্রশংসনীয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী প্রায় শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি, স্কাউটিং কার্যক্রম জোরদারকরণ, শিক্ষা ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সমতা আনা, নতুন শিক্ষাক্রমে নতুন পাঠ্যবই ও শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ নিঃসন্দেহে সরকারের অগ্রসর চিন্তার পরিচয় বহন করে। বলতে দ্বিধা নেই, বিভিন্ন ক্ষেত্রেই আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার সমধিক উন্নতি হয়েছে। তবে এত কিছুর পরও মানের দিক দিয়ে এখনো অনেক পিছিয়ে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার মাঠ পর্যায়ের একজন কর্মী হিসাবে নিচে কিছু বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরছি-

শুরুতেই বলা যায়, বেতন বৈষম্যের কথা। আমরা জানি, পশ্চিমা বিশ্বসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই শিক্ষকদের যথেষ্ট মূল্যায়ন করে এবং সম্মানজনক বেতন-ভাতা প্রদান করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। অনেক দাবিদাওয়ার পর ২০১৪ সালের ৯ মার্চ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। আমরা জানি, দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা মানে দশম গ্রেডের সুবিধাপ্রাপ্ত হওয়া। কিন্তু রহস্যজনক কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশটি অমান্য করা হলো। প্রধান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণবিহীন দুটি ভাগে ভাগ করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের দেওয়া হলো ১১তম গ্রেড এবং প্রশিক্ষণবিহীনদের দেওয়া হলো ১২তম গ্রেড। আর সহকারী শিক্ষদের ১৫তম গ্রেড থেকে এগিয়ে এনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের দেওয়া হলো ১৩তম গ্রেড এবং প্রশিক্ষণবিহীনদের দেওয়া হলো ১৪তম গ্রেড।

অতীতে প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড ব্যবধান ছিল এক। কিন্তু ২০১৪ সালের পর এসে সেই ব্যবধানটি তিনে গিয়ে ঠেকল। তারপর আবারও ঝামেলার শুরু। শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর ছেড়ে নেমে এলেন রাজপথে। সমাবেশ-মহাসমাবেশের পাশাপাশি হাইকোর্টে রিটও করা হলো। অবশেষে ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণবিহীন প্রথা বাতিল করে প্রধান শিক্ষকদের দেন ১১তম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষকদের দেন ১৩তম গ্রেড। কী এমন অসুবিধা ছিল-মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকদের এগারোতম গ্রেড দিয়ে দিলে? এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে প্রধান ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে। এ ছাড়া ডিপিএড ট্রেনিং করে বেতন কমে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ বিশাল সংখ্যক শিক্ষক। প্রকৃতপক্ষে এরা ক্ষতিগ্রস্তও। অন্যান্য সেক্টরে ট্রেনিং করলে আর্থিক সুবিধা বাড়ে; কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষকদের কমে যায়। কী অদ্ভুত! নিম্নধাপ-উচ্চধাপের মারপ্যাঁচে ফেলে বিরাট সংখ্যক শিক্ষককে এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা সত্যিই দুঃখজনক। ডিজিটাল বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণে অবিলম্বে এ অচলাবস্থার নিরসন হওয়া উচিত।

এবার আসা যাক শিক্ষক সংকটের কথায়। বর্তমান সরকার বিগত কয়েকবছরে অনেক শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশার তুলনায় তা অনেক কম। বর্তমানে সহকারী শিক্ষক নিয়োগদান চলমান থাকলেও প্রধান শিক্ষক পদে ২০১২ সালের পর আর কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অবশ্য ২০১৭ সালের ২৩ মে সিনিয়র সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে ১৬ হাজার জনকে চলতি দায়িত্ব দিয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাও প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। এখনো অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

লক্ষ করা যাচ্ছে, অনভিজ্ঞ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা দায়িত্ব পালনে যথারীতি হিমশিম খাচ্ছেন। অফিসিয়াল কাজের পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে বিদ্যালয় পরিচালনা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নিয়মিত প্রধান শিক্ষকরা লিডারশিপ ট্রেনিং পেলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের জন্য নেই কোনো ট্রেনিং। অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত। এ নিয়ে তারা প্রায়ই মনস্তাত্ত্বিক চাপে ভোগেন। মেজাজ হয় খিটখিটে। এদিকে অনেকেই পান না তার সহকারীর প্রয়োজনীয় সাপোর্ট। ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদেরও অনেক ক্ষেত্রে অসহযোগিতামূলক আচরণ করতে দেখা যায়। ম্যানেজিং কমিটির অনেক কর্তৃত্বপরায়ণ সদস্যকে বিভিন্ন অন্যায্য দাবি নিয়ে প্রধান শিক্ষকদের ওপর বল প্রয়োগ করতেও শোনা যায়। দাবি উঠেছে, শিক্ষা অফিসের মনিটরিং জোরদার করে ‘ম্যানেজিং কমিটি’ প্রথা বাতিল করার।

এমন হতাশাব্যঞ্জক অনেক কিছুই প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই অবগত যে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে আবার শিক্ষক বদলির বিষয়টি খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানেও দেখা যাচ্ছে শুভঙ্করের ফাঁকি। ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ১ঃ৪০-এর বেশি হলে এবং কর্মরত শিক্ষক চারজন বা তার কম হলে এ বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বদলি হতে পারছেন না। এতে হতাশার অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছেন বিরাটসংখ্যক শিক্ষক।

সরকার আন্তরিক; কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক কিছুই আলোর মুখ দেখছে না। এ অবস্থা কাম্য নয়। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান আরও বাড়ানো উচিত। চলমান পদ্ধতিতে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে যে ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে, তার আরও আধুনিকায়ন করা অত্যাবশ্যক। প্রশিক্ষণার্থী-শিক্ষকদের শুধু তাত্ত্বিকভাবে পড়ানোর প্রশিক্ষণ কাজে আসে না। ‘এভাবে পড়াতে হবে কিংবা ওভাবে’-এসব না বলে হাতেকলমে শিখিয়ে দিতে হবে। এর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

সম্প্রতি ইউনেস্কোর এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনাল ব্যুরো ফর এডুকেশন বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাবেই শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার নেপালে ৯০ শতাংশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় ৮২ শতাংশ, মালদ্বীপে ৭৮ শতাংশ, মিয়ানমারে ১০০ শতাংশ। আশা করছি, সরকার আরও সক্রিয়ভাবে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। হতাশার চোরাবালি দূরে সরিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি শুভ্রসফেদ বাংলাদেশ উপহার দেবেন ইনশাআল্লাহ।

প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)

কামালপুর (খ) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামালপুর, জকিগঞ্জ, সিলেট

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন