আর কত মৃত্যু সড়কে?
jugantor
আর কত মৃত্যু সড়কে?

  সাইফুল ইসলাম তানভীর  

২৫ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২২ জানুয়ারি রাজধানীর কুড়িল এলাকায় সড়কে ভিক্টর পরিবহণের চাপায় নিহত হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাদিয়া আক্তার। খবরটি দেখে আমার অনেক কষ্ট লেগেছে। এভাবে আমাদের তরুণ ভাইবোন রাজপথে হত্যার শিকার হচ্ছেন নিয়মিত; ভাবতেই কেমন যেন লাগে! আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা কি এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য রক্ত দিয়েছিলেন, যে রাষ্ট্রের রাজপথে নাগরিকদের এভাবে নিয়মিত হত্যা করা হবে? এই কুড়িল এলাকায়ই ২০১৮ সালে কয়েকজন শিক্ষার্থী বাস চাপায় নিহত হন এবং সেই ঘটনা নিয়ে বিশাল ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলনে রাষ্ট্র মেরামতের কথাও আসে। একপর্যায়ে নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে ফুটওভার ব্রিজও নির্মাণ হয়, যেটির নামকরণ করা হয়েছে রাস্তা পারাপারের সময় নিহত হওয়া এক ছাত্রের নামে।

রাজীব নামে এক ছাত্রের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বিআরটিসির বাসের ড্রাইভার। আমরা নিয়মিত দেখি, বাসের ড্রাইভাররা বেপরোয়াভাবে বাস চালায়। শুধু বাসই নয়, অন্যান্য যানবাহনও বেপরোয়াভাবে চালানো হয়। এ রাষ্ট্রে যেন কোনো নিয়মকানুন ও আইন বলে কিছু নেই! ট্রাফিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ঘুসের ওপর চলে। হয়তো বা ট্রাফিকে দু-চারজন ঘুসবিহীন আছেন। তারা নিঃসন্দেহে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অধিকার রাখেন। বিআরটিএ ঘুসের মহাআখড়া। বিআরটিএ-এর অফিসারদের ঢাকায় শতশত কোটি টাকার সম্পদ আছে। একাধিক প্লট/ফ্ল্যাট, গাড়ি ইত্যাদি রয়েছে। তাদের বেতনের টাকা তুলে খেতে হয় না। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৮-১০ হাজার নাগরিক সড়কে হত্যার শিকার হচ্ছেন। করোনাকে মহামারি ঘোষণা করলেও রাজপথে এত অধিক সংখ্যক নাগরিক হত্যার শিকার হলেও রাষ্ট্র জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেনি এবং যথাযথ পদক্ষেপও নেয়নি, যাতে এমন হত্যা আর না হয়।

রাস্তায় মানুষ নিয়মিত হত্যার শিকার হচ্ছেন; আর চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে সতর্ক করছেন; কিন্তু রাষ্ট্র এসবকে পাত্তাই দিচ্ছে না! বাংলাদেশ বাদে বিশ্বের অন্য কোনো রাষ্ট্রে কি সড়কে এত মানুষ প্রাণ হারায়? আমরা কীভাবে নিজেদের ‘ডিজিটাল উন্নত’ বলে দাবি করি; আর কীভাবেই বা স্মার্ট করছি? আমরা তো ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া এনালগ পদ্ধতিটাকে পর্যন্ত যত্ন করে রাখতে পারিনি। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানের রেখে যাওয়া রেলের সেই পুরোনো ব্যবস্থাটুকুও তো এখন নেই। ডেমু ট্রেনে ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে। মেট্রোরেল ইউরোপ-আমেরিকায় এসেছে এখন থেকে ১১০ বছর আগে। আর আমাদের এখানে এখন কোনোমতে এসেছে; কিন্তু তার খরচ শুনলে আমেরিকা-ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রীরাও আশ্চর্য হতে পারেন!

বিআইডব্লিউটিসিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া গাজী, টান, শহীদ বেলায়েত, মধুমতি, লেপচা, এমভি অস্ট্রিচ, পিএস মাহসুদ খেয়ে সাবাড় করে দেওয়া হয়েছে। ওই রুটে ভালো যাত্রীবাহী জাহাজ নতুন করে স্বাধীন বাংলাদেশ আর তৈরি করা হয়নি। এতে যাত্রীর চাপ বেড়েছে সড়কে। নদীগুলো তার গতি হারিয়েছে। অনেক নদী আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার অভাবে মরে গেছে। এসব ঠিকঠাক করার কথা সরকারের; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে যারা সরকারে আসছেন, তারা কেউ রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও যথাযথ উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন না। আমরা দেখি-লোকজন রাজনীতিতে এসে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের মালিক হচ্ছেন। নাগরিক অধিকার কী, তা এদেশের নাগরিকরা জানেন না।

টোটাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা নাজুক। বিআরটিসির বাস অল্পতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কেনাকাটায় লুট আর লুট। বাংলাদেশ বিমানের নাট খুলে পড়ে, চাকা ঢিলে হয়ে যায়। সিট খালি থাকে অথচ টিকিট থাকে না। টিকিটে সিন্ডিকেট। তিন-চারগুণ দামে বিমানের টিকিট বিক্রি হচ্ছে। প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিমানের কাছে অসহায়। বিমানের কর্মচারীদের কাছে নাগরিকরা ভালো আচরণও পাচ্ছেন না। বিমানের শিডিউলও ঠিক থাকে না। লুটপাটের কারণে বিমান রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। অর্থাৎ এ রাষ্ট্রে প্রতিটি সেক্টরে মহাদুর্নীতি চলছে। সেবা খাতগুলোয় মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। দুমাস আগে একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কায় আমার মামাতো ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। তার জানাজা পড়ে কবর দিয়ে এসেছি; এরপর আর বাড়ি যাইনি। নিয়মিত পত্রিকায় মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পড়ছি। এসব মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটছে সড়কে। লেভেল ক্রসিংগুলোয় বাসচালক শৃঙ্খলা মানেন না। লেভেল ক্রসিংয়ের ওপরেই যাত্রী উঠাচ্ছেন-নামাচ্ছেন। মহাখালী লেভেল ক্রসিংয়ে এ দৃশ্য প্রায়ই দেখি।

আমরা এমন একটি কল্যাণ রাষ্ট্র দেখতে চাই-যেখানে নাগরিকদের নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থা থাকবে। এজন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেটির কথা বারবার বলে আসছে।

গুলশান, ঢাকা

আর কত মৃত্যু সড়কে?

 সাইফুল ইসলাম তানভীর 
২৫ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২২ জানুয়ারি রাজধানীর কুড়িল এলাকায় সড়কে ভিক্টর পরিবহণের চাপায় নিহত হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাদিয়া আক্তার। খবরটি দেখে আমার অনেক কষ্ট লেগেছে। এভাবে আমাদের তরুণ ভাইবোন রাজপথে হত্যার শিকার হচ্ছেন নিয়মিত; ভাবতেই কেমন যেন লাগে! আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা কি এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য রক্ত দিয়েছিলেন, যে রাষ্ট্রের রাজপথে নাগরিকদের এভাবে নিয়মিত হত্যা করা হবে? এই কুড়িল এলাকায়ই ২০১৮ সালে কয়েকজন শিক্ষার্থী বাস চাপায় নিহত হন এবং সেই ঘটনা নিয়ে বিশাল ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলনে রাষ্ট্র মেরামতের কথাও আসে। একপর্যায়ে নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে ফুটওভার ব্রিজও নির্মাণ হয়, যেটির নামকরণ করা হয়েছে রাস্তা পারাপারের সময় নিহত হওয়া এক ছাত্রের নামে।

রাজীব নামে এক ছাত্রের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বিআরটিসির বাসের ড্রাইভার। আমরা নিয়মিত দেখি, বাসের ড্রাইভাররা বেপরোয়াভাবে বাস চালায়। শুধু বাসই নয়, অন্যান্য যানবাহনও বেপরোয়াভাবে চালানো হয়। এ রাষ্ট্রে যেন কোনো নিয়মকানুন ও আইন বলে কিছু নেই! ট্রাফিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ঘুসের ওপর চলে। হয়তো বা ট্রাফিকে দু-চারজন ঘুসবিহীন আছেন। তারা নিঃসন্দেহে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অধিকার রাখেন। বিআরটিএ ঘুসের মহাআখড়া। বিআরটিএ-এর অফিসারদের ঢাকায় শতশত কোটি টাকার সম্পদ আছে। একাধিক প্লট/ফ্ল্যাট, গাড়ি ইত্যাদি রয়েছে। তাদের বেতনের টাকা তুলে খেতে হয় না। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৮-১০ হাজার নাগরিক সড়কে হত্যার শিকার হচ্ছেন। করোনাকে মহামারি ঘোষণা করলেও রাজপথে এত অধিক সংখ্যক নাগরিক হত্যার শিকার হলেও রাষ্ট্র জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেনি এবং যথাযথ পদক্ষেপও নেয়নি, যাতে এমন হত্যা আর না হয়।

রাস্তায় মানুষ নিয়মিত হত্যার শিকার হচ্ছেন; আর চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে সতর্ক করছেন; কিন্তু রাষ্ট্র এসবকে পাত্তাই দিচ্ছে না! বাংলাদেশ বাদে বিশ্বের অন্য কোনো রাষ্ট্রে কি সড়কে এত মানুষ প্রাণ হারায়? আমরা কীভাবে নিজেদের ‘ডিজিটাল উন্নত’ বলে দাবি করি; আর কীভাবেই বা স্মার্ট করছি? আমরা তো ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া এনালগ পদ্ধতিটাকে পর্যন্ত যত্ন করে রাখতে পারিনি। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানের রেখে যাওয়া রেলের সেই পুরোনো ব্যবস্থাটুকুও তো এখন নেই। ডেমু ট্রেনে ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে। মেট্রোরেল ইউরোপ-আমেরিকায় এসেছে এখন থেকে ১১০ বছর আগে। আর আমাদের এখানে এখন কোনোমতে এসেছে; কিন্তু তার খরচ শুনলে আমেরিকা-ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রীরাও আশ্চর্য হতে পারেন!

বিআইডব্লিউটিসিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া গাজী, টান, শহীদ বেলায়েত, মধুমতি, লেপচা, এমভি অস্ট্রিচ, পিএস মাহসুদ খেয়ে সাবাড় করে দেওয়া হয়েছে। ওই রুটে ভালো যাত্রীবাহী জাহাজ নতুন করে স্বাধীন বাংলাদেশ আর তৈরি করা হয়নি। এতে যাত্রীর চাপ বেড়েছে সড়কে। নদীগুলো তার গতি হারিয়েছে। অনেক নদী আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার অভাবে মরে গেছে। এসব ঠিকঠাক করার কথা সরকারের; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে যারা সরকারে আসছেন, তারা কেউ রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও যথাযথ উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন না। আমরা দেখি-লোকজন রাজনীতিতে এসে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের মালিক হচ্ছেন। নাগরিক অধিকার কী, তা এদেশের নাগরিকরা জানেন না।

টোটাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা নাজুক। বিআরটিসির বাস অল্পতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কেনাকাটায় লুট আর লুট। বাংলাদেশ বিমানের নাট খুলে পড়ে, চাকা ঢিলে হয়ে যায়। সিট খালি থাকে অথচ টিকিট থাকে না। টিকিটে সিন্ডিকেট। তিন-চারগুণ দামে বিমানের টিকিট বিক্রি হচ্ছে। প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিমানের কাছে অসহায়। বিমানের কর্মচারীদের কাছে নাগরিকরা ভালো আচরণও পাচ্ছেন না। বিমানের শিডিউলও ঠিক থাকে না। লুটপাটের কারণে বিমান রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। অর্থাৎ এ রাষ্ট্রে প্রতিটি সেক্টরে মহাদুর্নীতি চলছে। সেবা খাতগুলোয় মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। দুমাস আগে একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কায় আমার মামাতো ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। তার জানাজা পড়ে কবর দিয়ে এসেছি; এরপর আর বাড়ি যাইনি। নিয়মিত পত্রিকায় মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পড়ছি। এসব মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটছে সড়কে। লেভেল ক্রসিংগুলোয় বাসচালক শৃঙ্খলা মানেন না। লেভেল ক্রসিংয়ের ওপরেই যাত্রী উঠাচ্ছেন-নামাচ্ছেন। মহাখালী লেভেল ক্রসিংয়ে এ দৃশ্য প্রায়ই দেখি।

আমরা এমন একটি কল্যাণ রাষ্ট্র দেখতে চাই-যেখানে নাগরিকদের নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থা থাকবে। এজন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেটির কথা বারবার বলে আসছে।

গুলশান, ঢাকা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন