অ্যালুমিনিয়াম শিল্প রক্ষায় পদক্ষেপ নিন

  আলী আজম ভূঁইয়া ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অ্যালুমিনিয়াম শিল্প রক্ষায় পদক্ষেপ নিন

এক সময় পূর্ববঙ্গে কোনো অ্যালুমিনিয়াম কারখানা ছিল না। ব্রিটিশ মালিকানাধীন কলকাতার ক্রাউন অ্যালুমিনিয়াম কারখানা সম্ভবত পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে প্রথম অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র তৈরির কারখানা বা শিল্প।

বলতে গেলে ব্রিটিশরাই এ দেশের মানুষকে প্রথম অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র উপহার দেয়। তার পূর্বে কুমারদের দ্বারা প্রস্তুত মাটির হাঁড়ি-পাতিল বা বাসনপত্রই দেশের সাধারণ মানুষ ব্যবহার করত। জমিদার শ্রেণী ও ধনী পরিবারগুলো ব্যবহার করত তামা-কাঁসার হাঁড়ি ও বাসনপত্র।

চীন দেশ থেকে আসত কিছু চীনা মাটির বাসনপত্র, বর্তমানে আমরা যাকে বলি ‘সিরামিকস’। ধনু বাবু বা ধনু আগরওয়াল নামে এক মাড়োয়ারির মালিকানায় ’৪০-এর দশকে ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গে ঢাকার টিকাটুলিতে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় হরদেও গ্লাস অ্যালুমিনিয়াম অ্যান্ড সিলিকেট ওয়ার্কস।

হরদেওকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গে ও ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানে অ্যালুমিনিয়াম শিল্প গড়ে ওঠার ভিত্তি। তবে ধনু বাবুরা মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) ও কলকাতা থেকে কারিগর ও ব্যবস্থাপক নিয়ে আসতেন কারখানা পরিচালনার জন্য।

১৯৪৭ সালে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র আমদানি হতো। নব্য স্বাধীন দেশে পশ্চিম পাকিস্তানি অবাঙালিরা এ দেশে ব্যাপকভাবে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা স্থাপন করলেন। বলা চলে, ১৯৫৫ সালের পূর্বে কোনো বাঙালি এ দেশে কোনো অ্যালুমিনিয়াম কারখানার মালিক ছিলেন না। ১৯৫৫ সালের দিকে উদীয়মান উদ্যোক্তা খায়ের উল্যাহ ভূঁইয়াসহ কিছু বাঙালির মালিকানায় এ দেশে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা গড়ে ওঠে এবং গড়ে উঠতে শুরু করে।

তবে অবাঙালিদের বৃহৎ কারখানা ও ব্যবসায়িক দক্ষতার কাছে বাঙালিরা খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। চট্টগ্রামের হক, দৌলতগঞ্জ, ভূঁইয়া এবং ঢাকায় ইমামগঞ্জে ঢাকা অ্যালুমিনিয়াম, হাবিব ও সামদানী অ্যালুমিনিয়াম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে।

পাকিস্তান আমলে কোনো বাঙালি দ্বারা অ্যালুমিনিয়াম শিল্প গড়ে ওঠা কঠিন ছিল। শিল্পের সঙ্গে আমদানি লাইসেন্স, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কারিগর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার প্রায় সবকিছুই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে নিয়ন্ত্রিত। তাই শিল্প গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় ছিল প্রশাসন।

১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে পরিত্যক্ত শিল্প আইনে বৃহৎ অ্যালুমিনিয়াম শিল্পগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে চলে আসে। নব্য স্বাধীন দেশে নানা অবকাঠামোগত, ব্যবস্থাপনা ও শিল্পের কাঁচামাল সংকট এবং সমস্যার কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত ও ধীরগতির জন্য বাজারে শিল্পপণ্যের সংকট দেখা দেয়। এই সুযোগে দেশে ব্যাপক অ্যালুমিনিয়াম শিল্প গড়ে ওঠে। এই গড়ে ওঠা অব্যাহত থাকে ’৮০-র দশক পর্যন্ত।

তখন দেশে অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের সংখ্যা ছিল প্রায় চার হাজার, যাতে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছিল। আশির দশক অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের স্বর্ণ যুগ। আশির দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতির বদৌলতে দেশে ব্যাপক ও কিচেন ডায়নিং টেবিল ওয়্যার আমদানি শুরু হয়। পাশাপাশি স্টেনলেস স্টিল, মেলামাইন, প্লাস্টিক ও সিরামিকস শিল্পের বিকাশ ঘটে। এই বিকাশ ও আমদানির ফলে দেশীয় অ্যালুমিনিয়াম শিল্পে উৎপাদনে ভাটা পড়ে। একে একে কারখানা বন্ধ ও উৎপাদন সংকুচিত হয়। ফলে এই শিল্পের লাখ লাখ কর্মজীবী বেকার হয়ে পড়ে। অনেক মালিক পুঁজি হারিয়ে বর্তমানে দিশেহারা। এই শিল্পের কারিগর ও শ্রমিকরা জীবিকার জন্য অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন। কেউ কেউ মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

মুক্তবাজার ও অবাধ আমদানি নীতিতে বিদেশি তৈজসপত্র শিল্প আমদানির ফলে দেশীয় উৎপাদন সংকুচিত হয়ে কল-কারখানা বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রাও ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশে তিলে তিলে গড়ে ওঠার ফসল এই অ্যালুমিনিয়াম শিল্প। এই শিল্পের সব যন্ত্রপাতি বাংলাদেশেই তৈরি হয়। বাঙালিরাই এখন এই শিল্পের দক্ষ ব্যবসায়ী, কারিগর ও প্রকৌশলী। গ্রামগঞ্জের মানুষ এই শিল্পপণ্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই দেশের এই মৌলিক শিল্পটি বাঁচিয়ে রাখা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

তাই গ্রামগঞ্জে ব্যবহার্য অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র রক্ষা, এই শিল্পে শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবিকা বাঁচাতে হলে শিল্প রক্ষা করে শিল্পের মালিকদের বাঁচানো সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সে উদ্দেশে সরকার অ্যালুমিনিয়াম শিল্প এলাকা বা জোন গড়ে সুলভ মূল্যে লিজে জমি প্রদান, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, রফতানির লক্ষ্যে আমদানিকৃত কাঁচামালে কর রেয়াতসহ নানাভাবে সহায়তা করে অ্যালুমিনিয়াম শিল্পকে রক্ষা করে এই শিল্পের মালিক-শ্রমিকদের বাঁচাতে পারে।

এই শিল্প রক্ষার জন্য আমদানিকৃত ‘ইনগটে’ ভ্যাট, ট্যাক্স রেয়াত; ব্যাংক ঋণে সুদ কমানো এবং অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র রফতানিতে প্রণোদনার ব্যবস্থার পাশপাশি সংরক্ষণ নীতির মাধ্যমে বিদেশি কিচেনওয়্যার, ডাইনিং টেবিলওয়্যার ইত্যাদি আমদানিতে করারোপের মাধ্যমে মৃতপ্রায় দেশের অ্যালুমিনিয়াম শিল্প রক্ষা করে মালিক-শ্রমিকদের বাঁচানোর দাবি জানাচ্ছি। সরকারের কাছে।

ভূঁইয়া অ্যালুমিনিয়া ওয়ার্কস লিমিটেড, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter