যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মো. গাউছুল আজম

প্রতীকী ছবি

সাধারণত কোনো নারী বা কিশোরীকে তার স্বাভাবিক চলাফেরা বা কাজকর্ম করা অবস্থায় অশালীন মন্তব্য করা, ভয় দেখানো, নাম ধরে ডাকা ও চিৎকার করা, বিকৃত নামে ডাকা, কোনো কিছু ছুঁড়ে দেয়া, ব্যক্তিত্বে লাগে এমন মন্তব্য করা, যোগ্যতা নিয়ে টিটকারী করা, তাকে নিয়ে অহেতুক হাস্যরসের উদ্রেক করা, রাস্তায় হাঁটতে বাধা দেয়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা, ইঙ্গিতপূর্ণ ইশারা দেয়া, গায়ে সিগারেটের ধোঁয়া ত্যাগ করা, উদ্দেশ্যেমূলকভাবে পিছু নেয়া, অশ্লীলভাবে প্রেম নিবেদন করা, উদ্দেশ্যেমূলকভাবে গান, ছড়া বা কবিতা আবৃত্তি করা, চিঠি লেখা, পথরোধ করে দাঁড়ানো, প্রেমে সাড়া না দিলে হুমকি প্রদান ইত্যাদি কর্মকাণ্ড যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে।

দণ্ডবিধি আইন, ১৮৬০-এর ৫০৯ ধারায় যৌন হয়রানি সম্পর্কে বলা হয়েছে- যদি কোনো কোনো ব্যক্তি কোনো নারীর শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে সে নারী যাতে শুনতে পায় এমনভাবে কোনো কথা বলে বা শব্দ করে কিংবা সে নারী যাতে দেখতে পায় এমনভাবে কোনো অঙ্গভঙ্গি করে বা কোনো বস্তু প্রদর্শন করে কিংবা অনুরূপ নারীর গোপনীয়তার অনাধিকার লঙ্ঘন করে, তাহলে সে ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে কিংবা অর্থদণ্ডে কিংবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ৭৬ ধারায় যৌন হয়রানি বা উত্ত্যক্ততা বিষয়ে বলা হয়েছে- যদি কেউ কোন রাস্তায় বা সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে বা সেখান হতে দৃষ্টিগোচরে স্বেচ্ছায় এবং অশালীনভাবে নিজদেহ এমনভাবে প্রদর্শন করে, যা কোনো গৃহ বা দালানের ভিতরে থেকে হোক বা না হোক, কোনো মহিলা দেখতে পায় বা স্বেচ্ছায় কোনো রাস্তায় বা সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে কোনো নারীকে পীড়ন করে বা তার পথরোধ করে বা কোনো রাস্তায় বা সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে কোনো অশালীন ভাষা ব্যবহার করে, অশ্লীল আওয়াজ, অঙ্গভঙ্গি বা মন্তব্য করে কোনো মহিলাকে অপমান বা বিরক্ত করে, তবে সেই ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত মেয়াদের কারাদণ্ডে অথবা ২ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ৭৫ ধারায় সর্বসমাজে অশালীন বা উচ্ছৃঙ্খল আচরণের শাস্তি হিসেবে তিন মাস মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

১৮৬০ সনের দণ্ডবিধি আইনের ৩৫৪ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারীর শালীনতা নষ্ট করার অভিপ্রায়ে বা সে এর দ্বারা তার শালীনতা নষ্ট করতে পারে জেনেও তাকে আক্রমণ করে বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করে, তাহলে সে ব্যক্তি ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে বা জরিমানা দণ্ডে বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ (খ) ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ১০ বছর কিন্তু অন্যূন ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯ ধারা অনুযায়ী যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। ধর্ষণ পরবর্তী নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ২৯৪ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি অন্যদের বিরক্তি সৃষ্টি করে কোনো প্রকাশ্য স্থানে কোনো অশ্লীল কার্য করে অথবা কোনো প্রকাশ্য স্থানে বা তার সন্নিকটে কোনো অশ্লীল গান, গাথা, সঙ্গীত বা পদাবলী গায়, আবৃত্তি করে বা উচ্চারণ করে, তাহলে সে ব্যক্তি ৩ মাস পর্যন্ত যে কোনো ধরনের কারাদণ্ডে বা জরিমানা দণ্ডে বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

শিশু, কিশোরী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী ছাত্রী, বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত নারী শ্রমিক, নারী কর্মচারী, কর্মকর্তা, আইনজীবী, সাংবাদিক, ডাক্তারসহ সব পর্যায়ের নারী। গণপরিবহনেও নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যৌন হয়রানি বন্ধে যারা ভূমিকা রাখতে পারেন-

১. পরিবারের সদস্যরাও একে অপরকে সচেতন করতে পারেন।

২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা।

৩. কর্মক্ষেত্রের সহকর্মী।

৪. রাস্তাঘাটে চলাচলকারী সাধারণ জনগণ।

৫. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

৬. বিজ্ঞ আদালত।

৭. ভ্রাম্যমাণ আদালত।

৮. জনপ্রতিনিধি।

৯. সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর সচেতন মানুষ।

যেভাবে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ করা যেতে পারে-

১. যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ক্লাসরুমে যৌন হয়রানি সম্পর্কে আলোচনা করা এবং এর নেতিবাচক বিষয়গুলো তুলে ধরা।

৩. যৌন হয়রানি উৎসাহিত হয়- গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য, বিজ্ঞাপন, নাটক ইত্যাদি প্রচার না করার পক্ষে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সচেতন ও কার্যকর করা।

৫. যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে সবাই ভিকটিমের পাশে দাঁড়ানো।

৬. স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা।

যৌন হয়রানির শিকার হলে কী করবেন?

যৌন হয়রানির শিকার হলে সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ডায়াল করলে পুলিশি সহয়তা পাবেন। আপনার আশেপাশের র‌্যাব ব্যাটালিয়নে জানাতে পারেন।

উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর লিখিতভাবে এবং উপস্থিত হয়ে লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। জেলা পর্যায়ে বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করতে পারেন। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদেরকেও জানাতে পারেন।

Report 2 RAB এই Apps-এ জানাতে পারেন। আশা করি এতে প্রতিকার পাবেন। আসুন, সবাই যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আমাদের কন্যা, জায়া ও জননীদের পথচলা নিরাপদ করতে সবাই এগিয়ে আসি।

লেখক: উপসচিব  (র‌্যাবের আইন বিষয়ক কর্মকর্তা, ঢাকা)