লেগুনার বিকল্প কী?

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  খালিদ জামান সেজান

আমাদের রাজধানী ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত একটি মেগাসিটি। ৮১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোটো এই শহরে প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতকালে নগরবাসীকে পোহাতে হয় সীমাহীন ভোগান্তি। ভয়াবহ যানজট যেন ঢাকার অলিখিত নিয়তি। প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় নতুন করে যুক্ত হচ্ছে গড়ে ৩৬০টি যানবাহন। তারপরও গণপরিবহনে ভোগান্তি ও তীব্র সংকটে দিশেহারা হচ্ছি আমি, আপনি এবং আমরা সবাই।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিএ-র দেয়া তথ্য অনুসারে ঢাকার রাস্তায় প্রায় ১৯ ধরনের মোটরচালিত যান রয়েছে। এসব যানের একেকটির ধরন আবার একেকরকম। যার কারণে সড়ক-মহাসড়কে আলাদা লেন করেও শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হয়নি। আর তাই প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোটবড় বিভিন্ন দুর্ঘটনা। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের পরিচালক ড. মিজানুর রহমান দাবি করেছেন, সিএনজি-লেগুনার মতো হালকা যান ঢাকার গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা বাড়াচ্ছে। এদিকে গত মঙ্গলবার ডিএমপির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, ঢাকা মহানগরীতে কোনো ধরনের লেগুনা চলতে দেয়া হবে না। পরে অবশ্য শর্তসাপেক্ষে কিছু এলাকায় লেগুনা চলাচলের কথা বলা হয়েছে। আমরাও লেগুনা বন্ধের পক্ষে। কিন্তু প্রশ্ন হল, লেগুনার বিকল্প কী?

রাজধানীতে হিউম্যান হলার বা লেগুনা সার্ভিসগুলো বেশ জনপ্রিয়। যেসব রাস্তায় বাস চলাচল করে না, সেসব রুটে লেগুনা একমাত্র গণপরিবহন। লেগুনাগুলো মূলত মেয়াদোত্তীর্ণ এবং ফিটনেসবিহীন মাইক্রোবাস আর পিকআপের নতুন সংস্করণ। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের কাছে লেগুনার আবেদন রয়েছে। এমন অবস্থায় লেগুনা বন্ধ ঘোষণা করা হলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প বাহন খুঁজবে। বিআরটিএ-র দেয়া তথ্যে জানা যায়, রাজধানীতে এখন নিবন্ধিত লেগুনার সংখ্যা ৫ হাজার ১৫৬টি। এগুলো ১৫৯টি রুটে চলাচল করে। এসব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন এবং ফিটনেস লাইসেন্সও দিয়েছে বিআরটিএ। যেহেতু এসব গাড়ির ফিটনেস আছে, রেজিস্ট্রেশন আছে; তাহলে কেন এসব গাড়ি চলাচলে হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হল? ৫ হাজার লেগুনার ওপর নির্ভর করছে অন্তত ২৫ হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকা। এসব মানুষের বেঁচে থাকার উপায় কী হবে তাহলে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি এর কোনো বিকল্প ভেবেছেন?

ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে এর আগেও বহুবার বিভিন্ন যানবাহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রথম কয়েক মাস সেসব নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে পালন করা হলেও ধীরে ধীরে তা শিথিল হয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেছে। প্রধান সড়কে এখন দেদারসে চলে সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশা। এখন নিষিদ্ধ রিকশাই হচ্ছে যানবাহনের রাজা, বিবিসির বিশ্লেষণে হয়েছে সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন। লেগুনা বা হিউম্যান হলারগুলোর ভাগ্যেও কি এমনটা হতে চলেছে? নাকি বিকল্প কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা করতে চলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? এসব প্রশ্নের সুরাহা হওয়া এখন খুবই জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু আমাদের কারোরই যেমন কাম্য নয়, তেমনি গণপরিবহন সংকটে দিনাতিপাত করাও অনাকাক্সিক্ষত। জনমনে এখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া- বিকল্প যানের ব্যবস্থা না করে লেগুনা-রিকশা নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্র কি প্রকারান্তরে মধ্যবিত্তকেই নিষিদ্ধ করে দিল?

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়