কতটা সভ্য হয়েছি আমরা?

  শফিউল আল শামীম ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কতটা সভ্য হয়েছি আমরা?
প্র্রতীকী ছবি

দীর্ঘদিনের আচার-আচরণ ও চলাফেরায় মানুষ যা অর্জন করে, এক সপ্তাহ বা মাসের ব্যবধানে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। আমাদের পরিবহন ও ট্রাফিকের অনিয়ম দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততাকেই প্রমাণ করে। অর্থাৎ সময়ের ব্যবধানে আমরা অনিয়মকেই নিয়মে পরিণত করে ফেলেছি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আমাদের বিবেককে ক্ষণিকের জন্য হলেও জাগ্রত করেছিল। তারা আমাদের গণপরিবহনের নৈরাজ্য ও ট্রাফিক সংক্রান্ত নিত্যদিনের গলদগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আমরা বোধহয় তাদের দেয়া আইডিয়াগুলো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। সড়ক-মহাসড়কের বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে সহজেই এটা বোঝা যায়।

গত ২৯ জুলাই শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া ও রাজীবের মর্মান্তিক মৃত্যু থেকে শুরু, অতঃপর এ সময় পর্যন্ত মাঝখানে ঘটে গেছে অনেক কিছু। শিক্ষার্থীরা গাড়ির লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ ও চালকের লাইসেন্স চেক করেছিল। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের উদ্বুদ্ধ করেছে, উল্টোপথে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে চালকদের অনুরোধ করেছে। তাদের কাজকে সাধুবাদ জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার গত ৫ থেকে ১১ আগস্ট ট্রাফিক সপ্তাহ ঘোষণা করেছিলেন। এরই অংশ হিসেবে সারা দেশে প্রায় লক্ষাধিক মামলা এবং প্রায় ৫ কোটি টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই হয়েছে ৬৫ হাজার মামলা। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মামলার পরও চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রবণতা কমেনি। থামেনি মৃত্যুর মিছিলও।

ট্রাফিক সপ্তাহ চলাকালীন কৌতূহলবশত ঢাকা শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট পরিদর্শন করেছিলাম। এর মধ্যে অন্যতম ব্যস্ত এলাকা ফার্মগেট। লক্ষ করে দেখলাম- পথচারীদের মধ্যে সচেতনতার বিন্দুমাত্র রেশ নেই। যে যার মতো চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে বানরের মতো লাফিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। ফুটওভার ব্রিজের অধিকাংশ জায়গা হকারদের দখলে। ব্রিজের সিঁড়িগুলো ক্ষয়ে একেবারে মসৃণ হয়ে গেছে। যে কেউ পিছলে পড়লে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। আরেকটি ব্যস্ততম স্থান কারওয়ান বাজার। প্রচুর টাকা ব্যয়ে আন্ডারপাস তৈরি হলেও যেন সবকিছুই বৃথা। এখানেও দেখি একই অবস্থা; দু’একজন মানুষ আন্ডারপাস ব্যবহার করলেও সিংহভাগ রাস্তা পারাপার করছে সরাসরি। বিশেষ করে কারওয়ান বাজারের শ্রমিকরা দিনের মধ্যে কমপক্ষে একশ’বার এভাবেই ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার হচ্ছেন।

এ তো গেল পথচারীদের অসাবধানতার কথা। এবার আসা যাক ট্রাফিকের কথায়। শাহবাগ, সায়েন্সল্যাবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে দেখা গেল, সিগন্যাল বাতিগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। কোথাও কোথাও বাতিই নাই অথবা ভেঙে ঝুলে আছে। ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় চলছে বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন। মোটরসাইকেল আরোহীদের অধিকাংশের মাথায় হেলমেট নেই। পাল্লা দিয়ে এখনও বাস চলছে, একে অপরকে টেক্কা দিয়ে। এর ফলে একসময় হয়তো বাস দুটির মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় এক গাড়ি অন্য গাড়িকে আটকে রাখে। ফলে এখনও আগের মতোই তীব্র যানজট লক্ষণীয়। ট্রাফিক সপ্তাহ শেষ হল, কিন্তু সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামেনি। এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন করা যেতে পারে, এত কিছুর পর আমরা আসলে কতটা সভ্য হতে পেরেছি?

রেলক্রসিংগুলোয় দেখা গেল ট্রেন আসার কয়েক সেকেন্ড আগেও প্রতিবন্ধকের নিচ দিয়ে কসরত করে বের হওয়ার চেষ্টা করছে মোটরসাইকেল চালকরা। ফ্লাইওভারের উপরও উল্টোপথে চলে মোটরসাইকেল, সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহন। যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে এখনও সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। তাহলে এ বিশৃঙ্খলার সমাধান কী? এ ব্যাপারে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- কেবল গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা ও আটক কোনো সমাধান নয়। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর ভূমিকা।

যেহেতু এ সমস্যা দীর্ঘদিনের, তাই হঠাৎ করেই এটি সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সড়কের সঠিক ব্যবহারের জন্য ব্যাপক প্রচার- প্রচারণার মাধ্যমে জনমনে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ট্রাফিক আইন ও নিয়ম-কানুন সম্পর্কিত পাঠদানের ব্যবস্থা করলে শিক্ষার্থীরা সচেতন হবে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জংশনগুলোর সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। ফুটওভার ব্রিজগুলোয় চলন্ত সিঁড়ি স্থাপন করে হকারমুক্ত করলে মানুষ তা ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হবে। মূলত সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই পারে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে। অন্যথায় সড়কে কান্নার অবসান ঘটবে না।

শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter