বিদেশি টিভি সিরিয়ালের লাগাম টানুন

  মো. জাহেদ হোসেন রনি ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদেশি টিভি সিরিয়ালের লাগাম টানুন

এক-দেড় যুগ আগের বাংলাদেশে যদি ফিরে যাই- চোখের সামনে ভেসে ওঠে গ্রামবাংলার মা-বোনদের নকশিকাঁথা সেলাইয়ের দৃশ্য, বৌ-ঝিরা জটলা বেঁধে এখানে-ওখানে গল্প করছে, এমন চিত্র, উঠানের শেষপ্রান্তে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের গোল্লাছুট আর লুকোচুরির স্মৃতি।

কিন্তু হায়! সেই দিনগুলো এইদিনের কাছে ক্রমেই ম্রিয়মাণ হচ্ছে। আর এর অন্যতম কারণ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। দেশে ভারতীয় অসুস্থ টিভি সিরিয়ালের একাধিপত্য আগ্রাসন চলছে। এসবের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে ছয় বছরের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পর্যন্ত। জরিপে বলা হয়েছে- নারীরাই এগুলোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট।

বিশ্বায়নের এই যুগে মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির অবাধ বিস্তার আমাদের চিন্তা-চেতনাকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে সমাজ কলুষিত হচ্ছে। সমাজের জন্য ভারতীয় বেশ ক’টি টিভি চ্যানেল মাদকাসক্তির মতোই ক্ষতিকর।

নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির যেমন কোনো হিতাহিত জ্ঞান থাকে না; তেমনি এসবে আসক্তদেরও কোনো সময় জ্ঞান থাকে না। যখন সিরিয়াল চলে, তখন তারা নাওয়া-খাওয়ার কথা পর্যন্ত ভুলে যায়। ‘চ্যানেলের সিডিউলে’ চলে তাদের সংসার। তাদের ঠোঁটের পরতে পরতে লেগে থাকে পটল কুমার, কটকটি আর ঝিলিকদের কাহিনী। এমন একাগ্রচিত্তে তারা সিরিয়াল দেখে যে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা ভুলে যায়। এর ফলে ঘটে নানা দুর্ঘটনা।

নিজের ঘরে টেলিভিশন না থাকায় প্রতিবেশীর ঘরে সিরিয়াল দেখতে গিয়ে ওই মহিলার রান্নাঘর পুড়ে ছাই হওয়ার মতো ঘটনাও এদেশে ঘটেছে। ওপার বাংলার কথিত সুপারহিট এক নায়কের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বাংলাদেশি মেয়ের আত্মহত্যার চেষ্টা আমাদের কী বার্তা দিচ্ছে- ভেবে দেখা প্রয়োজন। বস্তুত খুব সহজেই বোঝা যায়, ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বর্তমানে প্রবল আকার ধারণ করেছে এবং আমাদের মন-মনন-মস্তিষ্কে তা গেড়ে বসেছে।

অপ্রিয় হলেও সত্য- ভারতীয় টিভি সিরিয়াল বেশ প্রাধান্য বিস্তার করেছে আমাদের এখানে আর এর দর্শক প্রধানত নারী সমাজ। বিভিন্ন বয়সের নারীর পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারতীয় টিভি সিরিয়াল। বাদ যায়নি ছোট্ট শিশুরাও। আজকাল তাদের মুখে মুখে শোনা যায় পটল কুমারের কাহিনী।

এদেশের অনেক পুরুষও নাকি অবসর সময়ে ভারতীয় সিরিয়ালে মগ্ন থাকেন। দুঃখজনক হল, এর কুপ্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে এক ছাত্রী টিভি রুমে গিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখতে না পেরে আক্ষেপ করে ফেসবুকে নিজ ওয়ালে পোস্ট করেছেন- গেলাম খেলা দেখতে; দেখে এলাম ভারতীয় সিরিয়াল।

ভারতীয় টিভি চ্যানেলের কুপ্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছে না শিক্ষা উপকরণও। যে খাতার মলাটে থাকতে পারত দেশীয় ঐতিহ্যের ছবি; সেখানে স্থান পাচ্ছে ভারতীয় সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকাদের ছবি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে এসব উপস্থাপন করে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী মুনাফা লুটায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। আগেই বলেছি, এসব বিদেশি চ্যানেল মাদকের মতোই ভয়ানক।

মাদকের অর্থ জোগাড় করতে না পেরে মাদকসেবীরা চুরি, ছিনতাই, এমনকি খুন পর্যন্ত করে; তেমনিভাবে নিজের পছন্দের সিরিয়াল দেখতে না পেয়ে অনেক কিশোরী ক্ষোভে-অভিমানে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে থাকে। মাদক যেমন কাউকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়, তেমনি ভারতীয় সিরিয়ালগুলোর নেশা এই সমাজ ও এখানকার মানুষকে ক্রমেই অধঃপতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ‘পাখি’ জামা না পাওয়ায় এদেশের নারীর স্বামীর সংসার ত্যাগ ও এই একই নামের জামা কিনতে না পারায় তরুণী আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে, ভাবা যায়? ফরিদপুরের সৌমিতা, চাঁপাই নবাবগঞ্জের হালিমা ও জয়পুরহাটের মাইশার কথা আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই! তারা ‘পাখি’ ড্রেস কিনতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল।

শাশুড়িদের খাটিয়ে এবং স্বামীদের ঠকিয়ে স্বামীর বন্ধুর সঙ্গে কিভাবে পরকীয়া করতে হয়- ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর কল্যাণে তা এখন প্রায় সব নারীরই জানা। আগে মায়েরা সন্ধ্যায় বাচ্চাদের শিখাতো বর্ণমালা আর এখনকার নারীরা একে অপরকে ডেকে বলে- ভাবি, তাড়াতাড়ি আসেন; কিরণমালা শুরু হইছে। ভারতীয় সিরিয়ালের কুপ্রভাবে এদেশের নারীরা শিখছে বিভিন্ন কূটকৌশল, পরকীয়া ও হিংসাত্মক আচরণ। তারা এটাও শিখে নিচ্ছে- কিভাবে একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে একক পরিবার গড়া যায়।

ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোয় প্রচারিত বিভিন্ন সিরিয়ালের কারণে নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে- এমনটাই মনে করেন পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমাদের দেশের সমাজবিজ্ঞানীরা ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের নানাবিধ অসঙ্গতি ও ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করলেও কেন বন্ধ হচ্ছে না ভিনদেশি এসব টিভির সম্প্রচার, তা এক রহস্যই বটে।

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter