রাজনীতি যখন গরিবের বউ

  শাহজাহান আলী মূসা ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতি যখন গরিবের বউ

মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেছেন- রাজনীতি এখন গরিবের বউ, যে সবার ভাউজ মানে ভাবি। কথাটি অপ্রিয় হলেও ১০০ ভাগ সত্য।

কারণ দেশে সব পেশার ক্ষেত্রেই নিয়মনীতি ও বিধিবিধান আছে, যোগ্যতার প্রশ্ন আছে; কিন্তু রাজনীতি করতে গেলে কোনো যোগ্যতা, বিধিবিধান ও নিয়মনীতি লাগে না। টাকাওয়ালা হলেই সে বিরাট রাজনীতিবিদ। এমনকি সে এমপি-মন্ত্রীও হয়ে যাচ্ছে হরহামেশাই, যা রাজনীতির জন্য তো বটেই; দেশের জন্যও বিপজ্জনক।

তাই দেশে আজ প্রকৃত রাজনীতিবিদ গড়ে উঠছে না। রাজনীতিবিদ গড়ে না ওঠায় দেশের কথাও কেউ ভাবছে না, জনগণের কথাও কেউ ভাবছে না। সবাই টাকা ইনকামের ধান্ধায় আছে। টাকা হলেই সব হবে- এ ভাবনায় তারা বুদ হয়ে আছে।

দেখা যাচ্ছে- রাজনীতি এখন আর রাজনীবিদদের হাতে নেই। রাজনীতি চলে গেছে ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা এবং বিদেশ ফেরতসহ অন্যান্য পেশাজীবীর হাতে। এ চিত্র প্রত্যক্ষ করে রাষ্ট্রপতি স্বাভাবিকভাবেই উম্মা প্রকাশ করেছেন।

একজন ব্যবসায়ী- সে শুধু তার ব্যবসার কথাই চিন্তা করবে। সে চিন্তা করবে না নিজ দেশের সঙ্গে বহির্বিশ্বের সম্পর্ক কিভাবে স্থাপন করতে হয়। পেশাজীবীরা জানবে না জনগণের আবেগ-অনুভূতির কথা। তারা শুধু নিজ পেশা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, থাকছেও তাই। এসব কারণে আজ দেশে রাজনীবিদ গড়ে উঠছে না। দেশে রাজনীতির সঠিক চর্চাও তাই হচ্ছে না। এসব কথাই বুঝাতে চেয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে। রাষ্ট্রপতির উপলব্ধি ও আকুতি আমরা কতটুকু মূল্যায়ন করব, এখন সেটাই হচ্ছে দেখার বিষয়।

ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা যে রাজনীতিতে আসবেন না, তা কিন্তু নয়। তারাও রাজনীতিতে আসতে পারেন। কিন্তু তাদেরকে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, মাঠের রাজনীতির সঙ্গে একটা নির্দিষ্ট সময় কাটিয়ে তবেই রাজনীতিতে আসতে হবে। সেই মোতাবেক রাজনৈতিক দলগুলোকে কাজ করতে হবে। একজন নমিনেশন চাইল আর তাকে নমিনেশন দিয়ে দেয়া হল, তা কিন্তু ঠিক নয়।

সব পেশার ক্ষেত্রে যেমন শিক্ষার বিষয় থাকে, তেমন রাজনীতিতেও শিক্ষার বিষয় আছে। রাষ্ট্রপতির কথায় এটা স্পষ্ট যে, রাজনীতিও একটি পেশা। তাই তিনি বলেছেন- রাজনীতি করতে চাও, চাকরিতে না ঢুকে রাজনীতিতে ঢুকো। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন- ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়াতে আসল রাজনীতিবিদ সৃষ্টি হচ্ছে না। তাই তিনি ডাকসু নির্বাচন চলমান রাখতে নির্দেশ দেন। এরপর প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন। আমি মনে করি, মহামান্য রাষ্ট্রপতির এসব কথা একটু ভাবা দরকার।

আসল রাজনীতিবিদ সৃষ্টি না হওয়ায় দেশে তৈরি হচ্ছে ভূইফোঁড় রাজনীতিবিদ; যারা হঠাৎ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি হয়ে উঠছে তাদের টাকা বানানোর মেশিন, যে কারণে দেশে দুর্নীতি বেশি হচ্ছে। সরকারি সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে, বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে, বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে, জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে ইত্যাদি। কারণ তারা রাজনীতির চেয়ে টাকাকেই মুখ্য করে দেখে। টাকার গরমের কাছে বর্তমানে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, জ্ঞান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আত্মমর্যাদা, সামাজিক মর্যাদা, দূরদর্শিতা ইত্যাদি গৌণ।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, সাংবাদিক, ডাক্তার, আমলা, ইঞ্জিনিয়াররা রাজনীতিতে প্রথমে এডভাইজার হিসেবে কাজ করে, পরে মূল রাজনীতিতে প্রবেশ করে। তাতে ভারতের রাজনীতির ভিত শক্তিশালী হচ্ছে।

পক্ষান্তরে বাংলাদেশের রাজনীতির ভিত দুর্বল হচ্ছে। কারণ একটাই- কেউ রাজনীতি শিখে রাজনীতিতে আসছে না। গুটিকয়েকজন এলেও নমিনেশনের সময় বৃহৎ রাজনৈতিক দলের কাছে তার রাজনৈতিক জ্ঞান গৌণ হয়ে যায়, যখন টাকার ওপর ভরসা করে দলগুলো। এ সুযোগে টাকাওয়ালাদের কাছে রাজনীতি বিক্রি হয়ে যায়। এটা দেখে প্রকৃত রাজনীতিবিদ হতাশায় ডুবে এবং এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর রাজনীতির দিকে ফিরে তাকায় না। মনোযোগী হয় টাকা কামাতে।

কেউ কেউ আবার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আদর্শ ও ব্যক্তিত্বের সুবাদে নমিনেশন পেয়ে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার পর টাকা বানাতে মত্ত হয়ে পড়ে। কারণ পরবর্তী সময়ে নমিনেশন পেতে হলে, টাকাওয়ালাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলে টাকার প্রয়োজন হবে। এ ভাবনায় তারা রাজনীতি বিসর্জন দিয়ে টাকা ইনকামের দিকে ধাবিত হয় এবং বিভিন্ন অন্যায় কাজ ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে।

যোগ্য ও আদর্শবাদী না হওয়ায় অনেকে রাজনীতিতে এসে বড় ব্যবসায়ী বনে যায়, যা রাজনীতির জন্য বড় ক্ষতির বিষয়। সুস্থ রাজনীতি চর্চার জন্য দরকার সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ, যার অভাব প্রকট। একদিকে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই, অন্যদিকে ছাত্ররা দলীয় রাজনীতির শিকার হয়ে নষ্ট করছে সুস্থ রাজনীতির পরিবশে। তাই ছাত্রদের দলীয় রাজনীতির প্রভাব মুক্ত রাখতে হবে। ছাত্র রাজনীতিকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করতে না পারলে তাদের দিয়ে দেশের (বায়ান্ন-একাত্তরের মতো) বৃহৎ কোনো অর্জন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস্ অ্যান্ড সার্জনস্, মহাখালী, ঢাকা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×