শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা : তত্ত্বে ও মাহাত্ম্যে

  স্বামী ধ্রুবেশানন্দ ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা : তত্ত্বে ও মাহাত্ম্যে

শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক সার্বজনীন উৎসব। ব্যক্তিগত আনন্দ যেন সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। উৎসবমুখর হয়ে ওঠে সব জনপদ। আনন্দের হিল্লোল ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে স্পর্শ করে সব মানুষের হৃদয়।

জনমনে প্রশ্ন ওঠে কেন এই পূজা? কী-ইবা তার উদ্দেশ্য? কেউ বা সরাসরি বলে- এ তো পৌত্তলিকতা। আমরা এখানে সেসব বিষয়ে অনুধ্যান করার চেষ্টা করব।

স্বামীজী বলেছেন : ‘মূর্তিকে মূর্তি হিসাবে এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে পূজা করা হল পৌত্তলিকতা। কিন্তু মূর্তিতে, মানুষে এবং সর্ববস্তুতে সর্বব্যাপী চৈতন্য রয়েছেন- এই জেনে প্রার্থনা বা পূজা করা হল আস্তিকতা।’ তাই সনাতন ধর্মে মাটির প্রতিমা থেকে শুরু করে নিখুঁত মানব চরিত্রে ঈশ্বর আরাধনা করা হয়। ঈশ্বর সর্বভূতে রয়েছেন বটে; কিন্তু পবিত্র ও নিখুঁত মানবচরিত্রেই আমরা ঈশ্বর সম্বন্ধে বেশি সচেতন হই। কারণ সেখানে তার বেশি প্রকাশ। স্বামীজী সে জন্য শ্রীশ্রী মায়ের ভেতর ঐশী গুণাবলীর বিকাশ দেখে ‘জ্যান্ত দুর্গা’ এবং শ্রী রামকৃষ্ণদেবকে ‘বেদমূর্তি’ বলেছিলেন।

প্রতিটি ধর্মকে বিশ্লেষণ করলে আমরা তিনটি দিক দেখতে পাই :

১. দর্শন বা তত্ত্ব,

২. পৌরাণিক কাহিনী, উপাখ্যান বা লীলা,

৩. আনুষ্ঠানিকতা বা রূপ।

এখানে পৌরাণিক কাহিনী বা আনুষ্ঠানিকতার সাহায্যে দর্শনকে সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে তোলা হয়। স্থূল বস্তুর সাহায্য ছাড়া আমরা সূক্ষ্ম বস্তু চিন্তা করতে পারি না। যেমন মানব মনের সীমাবদ্ধতা হল কোনো ধরনের বাহ্য অবলম্বন ছাড়া নিরাকার কল্পনা করতে না পারা। আমরা মানুষ হিসেবে সবসময় আমাদের উপাস্য ঈশ্বরকে মানবভাবাপন্ন করে তুলি এবং নিজের প্রকৃতি অনুযায়ী রূপ দিই।

দর্শন বা ঋষিদের অনুভবলব্ধ সত্য হচ্ছে, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান ও অনন্ত। তিনি সাকার, নিরাকার এবং সাকার-নিরাকারের হতে পারে; তার কখনও ইতি করা যায় না। কিন্তু সেই সর্বশক্তিমান অনন্ত ঈশ্বরের কল্পনা আমরা করতে পারি না।

তাই মাতৃরূপী দুর্গা প্রতীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈশ্বর আরাধনা করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন মতবাদ, অনুষ্ঠান-পদ্ধতি, শাস্ত্র, মন্দির ও অন্যান্য বাহ্য ক্রিয়াকলাপ চিত্তশুদ্ধির জন্য আমরা অনুসরণ করে থাকি। কারণ হৃদয় শুদ্ধ না হলে সত্য স্পষ্টভাবে প্রতিভাসিত হয় না।

শ্রী রামকৃষ্ণকথামৃতে উল্লেখ আছে মহামায়া দুর্গার দুটি শক্তি :

এক. বিদ্যা শক্তি (জ্ঞান, ভক্তি, বিবেক, বৈরাগ্য), যা সত্যকে উন্মোচন করে।

দুই. অবিদ্যা শক্তি (কামিনী ও কাঞ্চন), যা সত্যকে আড়াল করে এবং বিক্ষেপ সৃষ্টি করে।

ঈশ্বর উপাসনা বিভিন্নভাবে হতে পারে। কিন্তু শ্রী রামকৃষ্ণদেবের মতে, ‘মাতৃভাব অতি শুদ্ধভাব’। মাতৃভাবেই সবচেয়ে বেশি পবিত্রতা এবং নিঃস্বার্থ পরায়ণতার প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় এবং মাতৃশক্তিই জগতের একমাত্র পক্ষপাতহীন মহাশক্তি। এ ভাবের আরাধনার মাধ্যমে আমাদের মনের মলিনতা দূরীভূত হয় এবং বিদ্যা শক্তির বিকাশ ঘটে। তখন সর্ববস্তুতে আমরা ঈশ্বরকে বা চৈতন্যকে অনুভব করি।

উল্লেখ্য, শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা কোথাও কোথাও নবরাত্রি পূজা হিসেবে পালিত হয়। নবরাত্রিতে ভক্তেরা অভীষ্ট ফল লাভের আশায় মাকে ৯টি নামে ও রূপে পূজা করে থাকেন। জগৎমাতা সর্বফলদায়িনী। তিনি তার সন্তানকে চতুর্বর্গ (ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ) ফল প্রদান করে পরিতৃপ্ত করেন।

কিন্তু যিনি শুদ্ধ ভক্ত, তিনি সব দুঃখ-কষ্টের মধ্যে মায়ের কাছে জ্ঞান, ভক্তি, বিবেক ও বৈরাগ্যই প্রার্থনা করেন। নরেন্দ্রনাথ দত্ত পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ যখন পারিবারিক অসচ্ছলতায় ভুগছিলেন, তখন শ্রী রামকৃষ্ণদেব তাকে মা ভবতারিণীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। যেন সে তার সমস্যার কথা মাকে জানাতে পারে। কিন্তু তিনি সমস্যার কথা মাকে বলতে গিয়ে বললেন- ‘মা জ্ঞান দাও; ভক্তি দাও; বিবেক দাও; বৈরাগ্য দাও।’ এবং ভক্তিভাবে বিহ্বল হয়ে তখন নিুোক্ত গানটি গেয়েছিলেন।

‘মা ত্বং হি তারা, তুমি ত্রিগুণধরা পরাৎপরা।

আমি জানি গো দীনদয়াময়ী তুমি দুর্গমেতে দুঃখহরা॥

তুমি জলে তুমি স্থলে, তুমি আদ্যমূলে গো মা,

আছ সর্বঘটে অক্ষপুটে সাকার আকার নিরাকারা॥

তুমি সন্ধ্যা তুমি গায়ত্রী, তুমি জগদ্ধাত্রী গো মা,

অকূলের ত্রাণকর্ত্রী, সদা শিবের মনোহরা।’

গানটি শুনে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেব খুব খুশি হয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন যে জগতে শক্তির সাহায্য ছাড়া কোনো কার্যই সম্পাদন করা যায় না। তবে সকাম বা নিষ্কাম যে কোনোভাবে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হওয়াই কল্যাণদায়ক।

কারণ মনের শুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনের রূপান্তর ঘটে, তখন সকাম প্রার্থনা নিষ্কামে পরিণত হয়। অর্থাৎ জাগতিক বাসনা ঈশ্বর লাভের বাসনায় পরিণত হয়। ভক্ত অনুভব করেন যে একমাত্র ঈশ্বর লাভেই আত্যন্তিক দুঃখ নিবৃত্ত হতে পারে। এই চৈতন্য বা ঈশ্বর উপলব্ধি হলে আমাদের দেহবুদ্ধি নাশ হয় এবং আমরা পরমানন্দ লাভ করি। কিন্তু শ্রীশ্রী মা বলেছেন- সময় না হলে তা হয় না।

একটি বিষয় অনুধাবনযোগ্য যে, ওপরের আলোচনায় আমরা কখনও দুর্গা, কখনও ভবতারিণী আবার কখনও ঈশ্বর বা চৈতন্য ব্যবহার করেছি। কারণ তত্ত্ব এক। আমরা যে নামেই ডাকি না কেন? যেমন জলকে আমরা জল, ওয়াটার, পানি, অ্যাকুয়া যা বলেই পান করি না কেন, আমাদের সমান তৃষ্ণা নিবারণ করে।

শ্রী রামকৃষ্ণদেবের ভাষায় : ‘ব্রহ্ম ও শক্তি অভেদ। যখন সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় করেন, তখন তাকে আদ্যাশক্তি বা মা বলি।’

সনাতন ধর্মে এ জন্য সাধকের উন্নতির জন্য নানাভাবে উপাসনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সব ভাবের লক্ষ্য রাখা হয়েছে ‘ঈশ্বর’। তাকে লাভ করার একমাত্র উপায় বলা হয়েছে ‘তীব্র ব্যাকুলতা’।

প্রতিবছরের মতো এবারও দুর্গা পূজায় আমরা মায়ের কাছে অনন্যচিত্তে প্রার্থনা করব মা যেন আমাদের বিপরীত ভাবনা দূর করেন এবং শুদ্ধাভক্তি প্রদান করেন।

স্বামী ধ্রুবেশানন্দ : অধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণ মঠ, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter