আশার ছলনে ভুলি

  আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের দাবিতে জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকদের মানববন্ধন। ছবি: যুগান্তর
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের দাবিতে জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকদের মানববন্ধন। ছবি: যুগান্তর

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘আত্মবিলাপ’ কবিতার কথা মনে আছে? কবিতাটির শুরুটা এরকম- ‘আশার ছলনে ভুলি, কী ফল লভিনু, হায়?’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সরকার ও সম্পাদক পরিষদ বা সংবাদ কর্মীতে যে ম্যারাথন বাহাসটা চলছে, তাতে বারবার ওই লাইনটি মনে পড়ছে। অবশ্য বাহাসটা আজকের নয়। সেই ২০১৩ সালে শুরু। ওই বছর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা সংশোধন করে শাস্তির মেয়াদ ১০ বছর থেকে ১৪ বছরে উন্নীত করা হয়।

লাগাতার অপপ্রয়োগে বিচিত্র অস্পষ্টতায় দুষ্ট ধারাটি তখন দ্রুতই বিরোধী রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য মূর্তমান আতঙ্ক হয়ে ওঠে। স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশে হয়ে ওঠে প্রধান হুমকি। ফলে ধারাটি বাতিলের দাবি ওঠে। দাবিটি শুরুতে গণমাধ্যম কর্মীদের থাকলেও, পরবর্তীকালে তা পরিণত হয় জনদাবিতে।

শুরু হয় মিটিং, মিছিল, লেখালেখি, মানববন্ধন। যখনই বিক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে, তখনই পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করতে সরকার তা বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রতিবাদের মুখে তথ্যমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী কতবার যে ৫৭ ধারা বাতিলের আশ্বাস দিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু ওই আশ্বাসের ফল আর কেউ দেখেনি। দুই মন্ত্রীর ‘দেখছি, দেখব’ গান শুনতে শুনতে কেটে গেল ৪ বছর।

২০১৬ সাল আসলে শোনা গেল নতুন গান- নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হবে। সেখানে আর ৫৭ ধারা থাকছে না। কিন্তু খসড়া প্রকাশ পেতেই দেখা গেল, বিতর্কিত ৫৭ ধারা বহাল তবিয়তে ঠাঁই পেয়েছে নতুন আইনে। আবার শুরু সেই প্রতিবাদ, লেখালেখি। সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হল, আপত্তিগুলো বিবেচনায় নেয়া হবে এবং মন্ত্রিসভায় পাঠানোর আগে সব ঠিকঠাক করা হবে। কিন্তু ২৯ জানুয়ারি যখন মন্ত্রিসভায় ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’-এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়, তখন আবিষ্কার হল এ ‘নতুন বোতলে পুরনো মদ’। সঙ্গে যোগ হয়েছে, গুপ্তচরবৃত্তিজনিত ৩২ ধারাসহ এক গাদা আপত্তিকর ধারা। তাতে সমালোচনার ঝড় উঠল।

গণমাধ্যম কর্মী, মানবাধিকার কর্মী, বিদেশি কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সচেতন মহল বা সংগঠন সরকারের এই হঠকারী উদ্যোগের তীব্র নিন্দা ও আপত্তি জানায়। সরকারের তরফ থেকে তখন যথারীতি প্রস্তাবিত আইনটির আপত্তিকর ধারাগুলো বাতিল বা সংশোধনের আশ্বাস দেয়া হয়।

৯ এপ্রিল যখন বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়, তখন আবিষ্কার হল অবস্থা ‘যেই লাউ, সেই কদু’। সরকার যথারীতি এবারও কথা রাখেনি। বিতর্কিত ধারাগুলো প্রায় একইরূপে জায়গা করে নেয় নতুন কালো আইনের খসড়ায়।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও সরকারের একরোখা মনোভাব দেখে ১৯ এপ্রিল দেশের শীর্ষ ও বরেণ্য সম্পাদকবৃন্দ ‘সম্পাদক পরিষদ’-এর ব্যানারে আইনমন্ত্রীসহ তিন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৬টি ধারার (২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৩) বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপত্তি ও উদ্বেগ জানায়। তাদের অভিযোগ, ওই ৬টি ধারা, ‘বাকস্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনতার পরিপন্থী’।

ওই দিন আইনমন্ত্রী নিজেও আপত্তিগুলোকে ‘অনেকাংশে যৌক্তিক’ আখ্যা দিলেন। সঙ্গে ২২ এপ্রিল এ বিষয়ক সংসদের স্থায়ী কমিটিতে আপত্তিগুলো উদ্বেগকে বিবেচনার আশ্বাস দেন। পরবর্তীকালে ওই স্থায়ী কমিটির সঙ্গে সম্পাদক পরিষদ দুই দফা বৈঠক করে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো জানায়। যথারীতি এবারও ‘আশার বাণী’ শোনানো হয়। একই সময়ে অন্যান্য সাংবাদিক সংগঠনের নেতারাও একই দাবিতে তথ্যমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলে, তাদেরও সেই ‘আশ্বাস সঙ্গীত’ শুনিয়ে বিদায় করা হয়।

১৯ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে পাস হতেই দেখা গেল; এত চেষ্টা, উদ্যোগ, আয়োজন সব ‘কেঁচে গন্ডুস’। সাজা সামান্য কম-বেশির বিষয়টি বাদ দিলে পাসকৃত আইনটি প্রস্তাবিত আইনটির চেয়ে ভয়ংকর। তাতে আপত্তিকর সব বিষয় তো আছেই, সঙ্গে ‘ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধের’ জায়গা নিয়েছে ‘সরকারের গোপনীয়তা লঙ্ঘনজনিত অপরাধ’।

প্রতিবাদে সম্পাদক পরিষদ ২৯ সেপ্টেম্বর, মানববন্ধনের ঘোষণা দিল। তথ্যমন্ত্রী মানববন্ধনের বদলে আলোচনার অনুরোধ জানালেন। তাতে আশার নিবু নিবু বাতিটা আবার জ্বলে উঠল। ৩০ সেপ্টেম্বর, তথ্যমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, ডাক-টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তিমন্ত্রী, তথ্য উপদেষ্টা এবং তথ্য সচিবের সঙ্গে সম্পাদক পরিষদ ৩ ঘণ্টা মিটিং করল।

মিটিং শেষে তিন মন্ত্রী আশ্বাস দিলেন, ৩ অক্টোবরের পরের মন্ত্রিসভার বৈঠকে আপত্তিগুলো তুলে ধরা হবে এবং আইনটি সংশোধনের লক্ষ্যে আরও আলোচনা হবে। ওই দিন আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে যে উদ্বেগ ও আশঙ্কা জেগেছে, তা দূর করা শেখ হাসিনা সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার’। এ সময় তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারবেন বলে তারা মনে করেন।’

পরে বিলটি অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে গেলে সেখানেও এক দফা চেষ্টা করা হয়, যাতে রাষ্ট্রপতি বিলটি সই না করেন। এ সময় একাধিক সংগঠন রাষ্ট্রপতিকে এ কাজে বিরত থাকতে অনুরোধ জানায়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বিলটি লাগাতার আপত্তির মুখে পূর্ণাঙ্গ আইনের শিরোপা পরল। তখন তথ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিলেন, ‘সরকার চাইলে আইনটি যে কোনো সময় যে কোনো বিষয় সংযোজন-বিয়োজন করতে পারে।’

কিন্তু তিন মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও মন্ত্রিসভার দুই বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে সম্পাদক পরিষদের আপত্তিগুলো আলোচনা না হওয়ায় ১৩ অক্টোবর প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সম্পাদক পরিষদ বলেছে, ‘এটা প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ।’

জবাবে ওই দিনই আইনমন্ত্রী বললেন, ‘আমার কথা রাখার সময় কিন্তু এখনও শেষ হয়নি। আমি কথার বরখেলাপ করিনি।’ একই সুরে পরদিন তথ্যমন্ত্রী বললেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়নি। আলোচনা চালু আছে। আশা করছি যে কোনো সময় আলোচনা হবে। আবারও সম্পাদক পরিষদ ও সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হবে।’

১৫ অক্টোবর সম্পাদক পরিষদ প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন করল। একই দিন সচিবালয়ে ছিল মন্ত্রিসভার বৈঠক। সেখানে আইনমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী মানববন্ধনের বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ‘পাসকৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারার পরিবর্তন চেয়ে সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিক নেতারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরা আলোচনার কথা বলেছিলাম।’ তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংসদে পাস হয়ে যাওয়ার পর এখন আর কী কথা বলবেন, কী আলোচনা করবেন? আইন পাস হয়ে গেছে, এখন কী করার আছে?’

তিনি আরও বলেন, ইংল্যান্ডে এই আইন আরও কঠিন। এ আইন কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য নয়। তবে যারা সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কড়া অবস্থানে থাকবে। যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে সরকার, দেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাদের জন্য এ আইন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে এত উদ্বেগ কেন? ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থচিন্তা থেকে বিবেচনা করলে হবে না। সমগ্র রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কোনো বাধা হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর আশাটা কোথায়? দুই মন্ত্রী কিসের ভিত্তিতে বললেন, আলোচনার পথ এখনও বন্ধ হয়নি। মন্ত্রিগণ সাংবাদিক নেতাদের সামনে যেভাবে এতদিন ধরে আশার মুলোটা ঝুলিয়ে রাখলেন, যেভাবে আশ্বাসের সিরিয়ালে সম্পাদক পরিষদকে ভুলিয়ে রাখলেন, তাতে তাদের কাছে সান্ত্বনা সঙ্গীত বুঝি এখন একটাই- ‘আশার ছলনে ভুলি, কী ফল লভিনু, হায়?’ কিংবা কিশোর কুমারের কালজয়ী গান ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর, বেদনার বালুচরে...’।

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও প্রাবন্ধিক

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×