৭ নভেম্বর: ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে

  মুশতাক হোসেন ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

৭ নভেম্বর: ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার ৪৩ বছর পরও তা ক্রমেই নতুন নতুনভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে উদ্ভাসিত হচ্ছে। ৭ নভেম্বরের সাংগঠনিক উত্তরাধিকার ও দায় বহন করে সমাজতান্ত্রিক দলসহ জাসদের তিনটি অংশই। বাংলাদেশ জাসদ এ দিনটিকে সিপাহি জনতার অভ্যুত্থান দিবস নামে পালন করে। বিএনপি দিনটিকে বিপ্লব ও সংহতি দিবস নামে পালন করলেও এবং ক্ষমতার সুফল ভোগ করলেও এর সাংগঠনিক দায় বহন করে না এবং ৭ নভেম্বরের রাজনীতিকে তাদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে। তাদের কথা শুনলে মনে হয় অদৃশ্য কোনো শক্তি এসে ৭ নভেম্বর ঘটিয়ে দিয়ে গেছে! আর আওয়ামী লীগ একে দেখে প্রতিকূল ঘটনা হিসেবে। আওয়ামী লীগ পরিবারের কেউ কেউ ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা খালেদ মোশাররফকে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখে থাকেন। যেহেতু ৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতার অভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ ফল ছিল খালেদ মোশাররফের ক্ষমতাচ্যুতি, তাই ৭ নভেম্বরকে তারা বৈরী ঘটনা হিসেবে চিত্রিত করেন।

৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতার অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যারা বহন করেন, তাদের অনেকের মাঝে সিপাহি গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লবী গণবাহিনী, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে একটা দ্বিধা কাজ করে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আবু তাহেরের বীরত্ব, ফাঁসির মঞ্চে বীরোচিত আত্মদান প্রভৃতি গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করতে তারা অকপট হলেও ৭ নভেম্বরের রাজনীতি নিয়ে তারা আলোচনা করতে বিব্রত বোধ করেন। বিভিন্ন কারণে এমনটি হয় বলে আমার ধারণা।

একটি কারণ হচ্ছে, কেউ কেউ মনে করেন সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানকে গৌরবান্বিত করলে বাংলাদেশ জাসদ পুনরায় সিপাহিদের নিয়ে রাজনীতি করবে এমন একটা ধারণা রাজনৈতিক মহলে বদ্ধমূল হবে। ফলে যে রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন, সে রাজনীতিতে জাসদ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলের কাছে বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে বিবেচিত হবে না বলে তারা মনে করেন। এরা আরও মনে করেন ৭ নভেম্বর ও তাহের নিজেদের রাজনীতির পূর্বসূরি বলে গণ্য করলে দেশি-বিদেশি মহল ধরে নেবে জাসদের রাজনীতির সাধারণ রূপ হিসেবে বুঝি সশস্ত্র গণবাহিনী গঠন, সিপাহিদের মাঝে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা জাসদের নিত্যকার রাজনৈতিক কাজ! গণতন্ত্রমনা মহলের কাছে জাসদ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী একটা দল বলে স্বীকৃতি পাবে না। ফলে জাসদের রাজনৈতিক বিকাশে অনাবশ্যক বাধার সৃষ্টি হবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী জাসদকে সব সময় সন্দেহের চোখে দেখবে এ কারণে যে, সুযোগ পেলেই তারা গণবাহিনী গঠন করবে ও সিপাহিদের নিয়ে রাজনীতি করবে। এ আশঙ্কা থেকেই কোনো কোনো নেতা ৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকে নিজেদের বিযুক্ত করতে চান, দূরে থাকতে চান। আর দল ভাগাভাগির রাজনীতির সুযোগ নিয়ে অতীত বৈপ্লবিক তৎপরতার জন্য একে অপরের ওপর দায় চাপাতে চান। এটা একটা আত্মঘাতী প্রবণতা বটে!

দ্বিতীয় কারণটা অনেকটা প্রথম কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেটা হচ্ছে- জাসদের দুটি অংশ এখন ১৪ দলের শরিক হিসেবে মহাজোট সরকারের অংশীদার। আরেকটি অংশ নিকট অতীতে ঐকমত্যের সরকারে অংশীদার ছিল। এ বিবেচনা থেকে তাদের কেউ কেউ ৭ নভেম্বরকে তুলে ধরেন ১৫ আগস্টের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে ৭ নভেম্বর ঘটেছিল ৩ নভেম্বরের ক্যু দেতার বিপরীত পক্ষে দাঁড়িয়ে। এটা ঠিক যে, ১৫ আগস্টের ক্যু দেতার পরে খন্দকার মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে জাসদের বিপ্লবী প্রক্রিয়া (কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি-সিওসি) বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে ১৫ আগস্টের পরমুহূর্ত থেকেই। কিন্তু পূর্ণ প্রস্তুতির সুযোগ পাওয়ার আগেই ঘটে যায় ৩ নভেম্বরের ক্যু দেতা।

জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কর্নেল তাহেরের বোঝাপড়ার (সেটা যদিও স্বল্পস্থায়ী ছিল) ভিত্তিতে যে সিপাহি গণঅভ্যুত্থান ঘটে, সেটা এ মতের নেতারা খুব একটা আলোচনা করেন না অথবা প্রসঙ্গটি সংক্ষিপ্ত করে তাহের ও জাসদ নেতাদের গোপন সামরিক বিচারের বিস্তারিত আলোচনায় চলে আসেন। কারণ বিচারের প্রসঙ্গটি এলে জিয়াউর রহমানের বিশ্বাসঘাতকতার কালিমালিপ্ত ইতিহাস সামনে এসে যায়, যেটা বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে সেসব নেতার জন্য অস্বস্তিদায়ক। সেদিন কোন বাস্তবতায় সেনাপ্রধান জিয়াকে সঙ্গে নিতে হয়েছিল তাকে সময়ের বিবেচনায় না এনে যারা বলে বসেন ‘জিয়ার সঙ্গে তাহেরের ঐক্য ভুল ছিল’, তাদের এ অতি সরলীকৃত বক্তব্য পাল্টা প্রশ্নের জন্ম দেয়। জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতার দায় যদি তাহেরকে নিতে হয়, তাহলে খন্দকার মোশতাকের দায় কি বঙ্গবন্ধু নেবেন, মীর জাফরের দায় নেবেন সিরাজুদ্দৌলা! এমনকি তারা একথাও বলে বসেন যে, বঙ্গবন্ধুকে ত্যাগ করে জাসদ গঠনটাই ভুল ছিল। কিন্তু ইতিহাস বলে, বঙ্গবন্ধুকে জাসদ প্রতিষ্ঠাতাগণ ত্যাগ করেননি, বঙ্গবন্ধু তাদের ত্যাগ করেছেন!

তৃতীয় কারণটা হচ্ছে, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী কোনো কোনো তাত্ত্বিক মনে করেন, ৭ নভেম্বর তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা যে সিপাহি বিদ্রোহ ঘটিয়েছে, তার কোনো বিপ্লবী তাৎপর্যই নেই, এটা স্রেফ নৈরাজ্য। কারণ মার্কস-লেনিন-মাওয়ের বইয়ে এ ধরনের ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই! তারা সৈনিকদের ১২ দফা দাবিনামাকে নিছক ট্রেড ইউনিয়ন মার্কা দাবিদাওয়া বলে একে উপেক্ষা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ যখন ৭ নভেম্বর ও আবু তাহেরের বিপ্লবী অভিঘাতের ওপর আলোক ফেলতে শুরু করেন, তখন তারা একটু একটু করে নড়েচড়ে বসেন। তবে সেখানেও পুরোপুরি তারা ৭ নভেম্বরের বাস্তবটা মানতে চান না। তাহেরকে জাসদ থেকে আলাদা করে দেখাতে চান। ভাবটা এই- তাহের ভালো, জাসদ খারাপ! তাহের বিপ্লবী, জাসদ বিপ্লববিরোধী! আবার উল্টো প্রবণতাও আছে। যারা প্রথম ও দ্বিতীয় কারণে ৭ নভেম্বরকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তারা বলেন, জাসদ নিয়মতান্ত্রিক পথেই ছিল; তাহেরই জাসদকে গণবাহিনী গঠন, সৈনিক সংস্থা গঠন ও সিপাহি বিপ্লবের দিকে টেনে নিয়ে গেছেন। নইলে আজ আমরা সংসদীয় রাজনীতিতে বড় দল থাকতাম ... ইত্যাদি। তারা জাসদকে ১৯৭২-এর আওয়ামী লীগের তরুণ সংস্করণ মনে করেন, ৩১ অক্টোবর আওয়ামী লীগ থেকে গুণগতভাবে আলাদা একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের জন্মটা যে ছিল অনিবার্য এবং মুক্তিযুদ্ধের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ, সমাজ বদলের আকাক্সক্ষাই যে ছিল মূল প্রেরণা- সেটা এখনকার অনেক জাসদ নেতা স্বীকার করেন না। আবার কেউ কেউ জাসদের জন্মকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলারও চেষ্টা করেন।

এ থেকে শুরু হয় জাসদ, ৭ নভেম্বর ও কর্নেল তাহেরকে দৈত্যায়ন (demonize) করার চেষ্টা। দু-একজন লেখক এ চেষ্টা শুরু করেছেন। কেউ কেউ টেলিভিশন টকশো বা পত্রিকা সাক্ষাৎকারে তা করার চেষ্টা করছেন। কর্নেল তাহেরকে জাসদ থেকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করেন।

আসলেই কি গণতান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতিতে সফলতার জন্য অতীতের সশস্ত্র বিপ্লবী প্রচেষ্টার উত্তরাধিকার থেকে নিজেকে ত্যাজ্য করা জরুরি? নেপালের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি কীভাবে ২০০৮ সাল থেকে নিজেদের সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে খাপখাইয়ে দু-দুবার সরকার গঠন করেছে ও বাকি সময়টাতে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় আছে, যে দলটি ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল! লাতিন আমেরিকায় ষাটের দশক থেকে শুরু করে নব্বই দশক পর্যন্ত (সর্বশেষ কলম্বিয়া) যেসব দেশে বিপ্লবীরা সশস্ত্র গেরিলাযুদ্ধ করেছেন, তারা কীভাবে সশস্ত্র যুদ্ধে ইতি টেনে সংসদীয় রাজনীতিতে সফলতা পেয়েছেন? তারা কি নিজেদের অতীত বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামকে প্রকাশ্যে নিন্দা করে নাকে খত দিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন? নাকি বাস্তবতা অনুধাবন করে শান্তিপূর্ণ প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার জন্য যথাযথ রাজনৈতিক নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছেন? তারা তো গর্ব ভরে তাদের অতীত লড়াই ও শহীদদের স্মরণ করেন।

কর্নেল আবু তাহেরের বিপ্লবী প্রচেষ্টা ও ৭ নভেম্বর নিয়ে অনেক প্রশ্ন, তাত্ত্বিক বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কর্নেল তাহের কেন স্মরণীয়? তিনি বিপ্লবী সাহস দেখিয়েছিলেন প্রচলিত শোষণমূলক ব্যবস্থাটাকে ঝাঁকি দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিতে। লরেন্স লিফশুলৎজের ভাষায়, ‘৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানকে এখন নতুন দৃষ্টিতে দেখতে হবে, বিশ্লেষণ করতে শিখতে হবে। ইতিহাসের এ পর্যায় থেকে শিক্ষা নেয়াটা খুবই তাৎপর্যবহ’।

মুশতাক হোসেন : বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter