নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রত্যাশা

  বিমল সরকার ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন ভবন

নির্বাচন কমিশন বলতে গেলে সব দেশেই স্বাধীন ও সাংবিধানিক একটি সংস্থা। মূলত দেশে কোনো জাতীয় নির্বাচনের সময় এলেই সংস্থাটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশেও এমনই।

স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১২ ব্যক্তি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাদের মধ্যে যার যার ভূমিকার কারণে দু-চারজনের নাম যেমন ইতিহাসের উজ্জ্বল পাতায় স্থান করে নিয়েছে, একই কারণে অজস্র নিন্দাও কুড়িয়েছেন বেশ কয়েকজন।

বিচারপতি এম ইদ্রিস, মোহাম্মদ আবু হেনা এবং এটিএম শামসুল হুদার মতো ব্যক্তিরা সিইসির চেয়ারটির উপযুক্ত মর্যাদা বহুলাংশেই রক্ষা করে বস্তুত দেশে-বিদেশে গোটা জাতির গৌরবময় ভাবমূর্তিটি তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে এ গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন আসনটিতে বসা কারও কারও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য সমগ্র জাতির মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে অনেকবার। ফলে হতাশা ও লজ্জায় আমরা ম্রিয়মাণ হই। তবুও আমরা বারবার নতুন করে আশায় বুক বাঁধি।

অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, আমাদের মতো দেশে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বহুলাংশে নির্ভর করে সিটিং সরকারের ইচ্ছা ও মনোভাবের ওপর।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তথা নির্বাচন কমিশনের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও সাহস-দৃঢ় মনোবলের বিষয়টিকে কোনোক্রমেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। সর্বশেষ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে একেএম নুরুল হুদা দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন।

একইদিন তার সহযোগী চারজন নির্বাচন কমিশনারেরও কার্যকাল শুরু হয়। সে অনুযায়ী বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ এখনও এক বছর পূরণ হয়নি। এরই মধ্যে সামনে জাতীয় নির্বাচন, বড় রকমের চ্যালেঞ্জ।

সবারই বেশ ভালোভাবেই জানা সরকারি ও বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান-মনোভাব এবং কী পরিস্থিতিতে ও কীভাবে কমিশনটি নিয়োগ করা হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই এ কমিশনের কাছে দেশি-বিদেশি সচেতন সব মহলের প্রত্যাশার পরিমাণ একটু বেশিই। এ সময়ে ভাবনা একটাই- অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

ভারতে ১৯৫০ সাল থেকে গণনা শুরু করলে মোট ২৩ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে টিএন সেশান ছিলেন দেশটির দশম সিইসি।

১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি সাংবিধানিক ওই গুরুত্বপূর্ণ পদটিতে আসীন ছিলেন। কেবল প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেই নন, তার সহকর্মী হিসেবে অপরাপর কমিশনার তথা গোটা নির্বাচন কমিশনকেই সেদেশে সবসময় অত্যন্ত সম্মান, মর্যাদা ও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু নানা কারণে টিএন সেশান তার মেয়াদে কেবল নিজের দেশেই নন; পার্শ্ববর্তী দেশগুলো, এমনকি দূরবর্তী গণতান্ত্রিক অনেক রাষ্ট্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেন। আমাদের দেশেও টিএন সেশান খুবই আলোচিত একটি নাম।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, বিশেষ করে কোনো নির্বাচনের প্রসঙ্গ এলেই কোনো না কোনোভাবে আলোচনায় চলে আসে তার নাম। নির্বাচনী ঘটনা পরম্পরায় উদাহরণ হিসেবে বারবার টেনে আনা হয় সেশানকে।

স্বাভাবিকভাবেই যে কারও মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে, তার নামটি কেন এত আলোচনায় আসে?

ভারতের জাতীয় অর্থবছর শুরু হয় পহেলা এপ্রিল। এর আগে প্রতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী লোকসভায় বাজেট পেশ করে থাকেন।

১৯৯৫ সালের কথা। মার্চ মাসের প্রথমদিকে ৬টি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত থাকায় এ নিয়ে দেখা দেয় বিপত্তি। দিল্লিতে তখন পিভি নরসিমা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার অধিষ্ঠিত।

বাজেট উপস্থাপন আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনে ভোটারদের আচরণ প্রভাবিত করতে পারে আশঙ্কা করে সিইসি সেশান কংগ্রেস সরকারকে ঝটপট বাজেট পেশ পিছিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। আর ওই নির্দেশ মেনে সরকারও সময়ক্ষেপণ না করে তা পিছিয়ে দেয়।

অতঃপর ৬টি রাজ্যের নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর এবং ৩১ মার্চের আগে ১৯৯৫-১৯৯৬ অর্থবছরের সাধারণ বাজেট ও গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে বাজেট লোকসভায় উপস্থাপন করা হয়।

ওই ঘটনা দেশের ভেতরে ও বাইরে ফলাও করে প্রচার হয়। ঘটনাটি আজও স্মরণীয় হয়ে আছে (আমার চোখের সামনে আমাদের দেশের তৎকালীন পাঠকপ্রিয় খ্যাতনামা জাতীয় দৈনিক ‘সংবাদে’ প্রকাশিত খবরের শিরোনামটি এখনও ভাসছে- ‘সেশানের নির্দেশ মেনে ভারত সরকার বাজেট পিছিয়েছে’, ২৮ জানুয়ারি, ১৯৯৫)।

ইংরেজিতে একটি কথা আছে- ‘উই লিভ ইন ডিডস, নট ইন ইয়ারস’। আমরা বেঁচে থাকি আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে, কতদিন বাঁচলাম এই পৃথিবীতে বয়সের সেই পরিসংখ্যান দিয়ে নয়।

মানুষের জীবনের নিত্য-অনিত্য নিয়ে সংস্কৃতে সুন্দর একটি শ্লোক আছে, যার মর্মার্থ হচ্ছে : চিত্ত চঞ্চল; বিত্তও তা-ই। আজ যে আমির, কাল সে ফকির।

জীবন-যৌবন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। সবই ক্ষণস্থায়ী। যিনি কীর্তিমান, শুধু তারই মরণ নেই। তিনি থাকেন মানুষের মনের মন্দিরে চিরজীবী হয়ে।

ভারতেও জাতীয় নির্বাচন সমাসন্ন। লোকসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ সরগরম। গত ২ ডিসেম্বর সেদেশের ২৩তম সিইসি হিসেবে দায়িত্বভার নিয়েছেন সুনীল অরোরা।

তার সামনেও অবশ্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। কথায় আছে, সব ভালো যার, শেষ ভালো তার। সংকীর্ণতা, ভীরুতা ও সীমাবদ্ধতা কখনও শেষ কথা হতে পারে না। সবার মাঝেই আমরা উদারতা, সাহস ও দৃঢ়তা দেখতে চাই।

সরকারের সুনাম-দুর্নাম যেমন নির্বাচন কমিশনের ওপর, তেমনি নির্বাচন কমিশনের সুনাম-দুর্নামও বহুলাংশে সরকারের ওপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশ ও ভারতের শত কোটি মানুষের চোখ এখন এম ইদ্রিস-আবু হেনা-শামসুল হুদাদের উত্তরসূরি একেএম নুরুল হুদা এবং টিএন সেশানদের উত্তরসূরি সুনীল অরোরার দিকে।

আশা করি এক্ষেত্রে নতুন করে ইতিহাস সৃষ্টি হবে। দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×