কণ্টকমালায় কাঁটার খোঁচা লাগবেই

  এ কে এম শাহনাওয়াজ ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কণ্টকমালা
কণ্টকমালা। ছবি: যুগান্তর

ঘটনাটি মোটেও কাম্য নয়। বরং নিন্দার। নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় বিরোধী দল নিপীড়িত হচ্ছে- এ সত্য অকুস্থলের মানুষ প্রত্যক্ষ করছে এবং সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচার করছে। বুদ্ধিজীবী দিবসে মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের গাড়িবহরে হামলা খুবই নিন্দনীয় কাজ বলে আমরা মনে করি।

কে বা কারা এ অপকর্ম করেছে, তা উন্মোচন করে প্রতিবিধান করা সরকারের দায়িত্ব। বলতে হবে, সেদিন এ ঘটনা ঘটতে পারাটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হবে। পাশাপাশি অকুস্থলে ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেনের সাংবাদিকদের প্রতি রাখা ক্ষুব্ধ বক্তব্য এর মধ্যে সর্বত্র প্রচারিত হয়েছে। এ সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করব লেখাটির শেষ পর্বে।

প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলো কিছু আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে একধরনের হতাশা কাজ করে। আমি একবার টকশো করতে গিয়ে একটি টিভি চ্যানেলের লিফটে আটকে গিয়েছিলাম। আটকে ছিলাম মিনিট তিনেক। কিন্তু আতঙ্কে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।

প্রযোজকের টেলিফোন নম্বর আমার মোবাইল ফোনে। কিন্তু আমি ওই মুহূর্তে নাম-নম্বর সব ভুলে গিয়েছিলাম। পরে বুঝেছি সামান্য কারণে আতঙ্কিত হওয়াটা অনেক বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পথে হাঁটতে চাইলে মনের ভেতরের শক্তি আর আত্মবিশ্বাস কমে যায়। তখনই বেড়ে যায় যুক্তিহীন আচরণ।

এই যে নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন পক্ষ নানা পদ্ধতিতে বিরোধী পক্ষকে আতঙ্কিত করতে চাচ্ছে, এতে লাভের পাল্লা কি বাড়বে? রাজনীতি-অভিজ্ঞ মানুষরা রাজনীতি ও কুরাজনীতি সবই ভালো বোঝেন। আমাদের মতো রাজনৈতিক দলবিচ্ছিন্ন মানুষের বক্তব্য বোকার প্রলাপ হিসেবেই তারা মনে করেন। কিন্তু তবুও বলব, মোহাবিষ্ট পরিবেশে বসে সবসময় মুক্তচিন্তা করা যায় না।

পাশাপাশি বুঝতে হবে সাধারণ মানুষ বাহ্যত রাজনৈতিক দলবিচ্ছিন্ন হলেও রাজনৈতিক চেতনা ও জ্ঞানবিচ্ছিন্ন নয়। এদের একটি বাড়তি সুবিধা হচ্ছে তারা কোনো দলের প্রতি অন্ধ থাকেন না বলে অন্তত কিছুটা মুক্তভাবে চারপাশটা দেখতে পান। শেষ পর্যন্ত এই দেখাটাই সত্য হয়। আমরা কলাম লেখার চর্চা করি বলে বিভিন্ন সময় ফলাফলে এর প্রমাণ পেয়ে থাকি। পাঠক তা অনুভব করেন।

আমরা সাধারণ চোখে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার তেমন কারণ দেখি না। ভোটারদের মধ্যে দলান্ধ ভোটার সব পক্ষেই আছে। তাদের ভোটে মোটামুটি কাটাকাটি হয়ে যায়। বাকি ফল নির্ধারিত হয় দলনিরপেক্ষ সাধারণ ভোটারদের ভোটে। আবার কখনও কখনও আরেকটি শক্তিশালী উপাদান যুক্ত হয়।

যেমনটি হয়েছিল ২০০৮-এর নির্বাচনে আর তেমনটি ঘটার কথা এবারের নির্বাচনেও। তা হচ্ছে বিপুলসংখ্যক নতুন ভোটারের ভোট। অবশ্য আমার এ বক্তব্যে বাঁকা হাসতে পারেন শক্তিমান রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা বলবেন তুরুপের তাসের খোঁজটাই তো আপনি পেলেন না। নানা রকম ম্যাকানিজমের রাস্তাটা কী, তা আমরা জানি- এসবের তল গোবেচারা আপনারা পাবেন কেন! তবে আমরা বুঝি ‘ম্যাকানিজম’ শব্দের সঙ্গে ‘ম্যাকানিকাল’ শব্দের মিল আছে।

অর্থাৎ একটি যান্ত্রিক ব্যাপার আছে এখানে। আর যন্ত্রের যে যন্ত্রণা থাকে, তা কে না জানে! যে কোনো সময় বিগড়ে যেতে পারে যন্ত্র। এসব কারণে আমরা মনে করি, মানুষের স্বাভাবিক শক্তিকেই মূল্য দেয়া উচিত। আমরা এ সাধারণ ভোটারদের মন যতটা বুঝি- রাজনৈতিক মোহগ্রস্ত মানুষ ততটা বোঝেন বলে আমাদের মনে হয় না।

এর বাইরে অতিরিক্ত একটি মূল্যায়ন আছে আমাদের। যে পর্যন্ত বিএনপি ও এর ২০ দলীয় জোট ছিল, ততক্ষণ তাদের দলীয় ভোটাররা শর্তহীনভাবে নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। যে যুক্তিতেই হোক আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের বিরাগ রয়েছে। এবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর বিশেষ করে পাঁড় বিএনপিভক্ত নন তবে আওয়ামী-বিদ্বেষী ভোটাররা কিন্তু কিছুটা দ্বিধায় পড়েছেন। বরাবরই এ ধারার ভোটার ২০ দলীয় জোটে ভোট দিয়েছেন।

এবার আওয়ামী-গন্ধী মানুষ এসে বিএনপিতে ভাগ বসানো তারা পছন্দ করছে না। আমি এরকম কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তারা মনে করেন তাদের চেতনাবিরোধী এ মানুষগুলো নিজ স্বার্থে দলে ভিড়েছেন। নিজ দলের ব্যানারে নির্বাচন করলে এরা জামানত হারাতেন। এখন ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ধানের শীষে নির্বাচন করলে জিতেও যেতে পারেন। অন্তত জামানত বেঁচে যাবে।

এ ধরনের ব্যাখ্যার পর আমার মনে হল এই ঐক্যফ্রন্টের কারণে বিএনপির ধরাবাঁধা ভোটও কিছুটা কক্ষচ্যুত হবে। গণফোরাম আর নাগরিক ঐক্যের হাতেগোনা ক’টি ভোট দিয়ে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যাবে না। আমাদের বিশ্বাস এ দুই দলের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ অনেক ভোটার জামায়াতের সঙ্গে একই কাতারে ধানের শীষে নির্বাচন করাকে মেনে নিতে পারেননি। তাদের পক্ষে ধানের শীষে ভোট দেয়া কঠিন হবে। সাধারণ ও নতুন ভোটাররা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্নাত।

তাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের নানা সমালোচনা করলেও নৌকার বাইরে ভোট দেয়া তাদের জন্য কঠিন হবে। অন্তত ধানের শীষে তারা ভোট দেবে না। তৃতীয় অপশন হিসেবে তারা ভোটদানে বিরত থাকতে পারে। তরুণ ভোটার অনেকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি দল হিসেবে বর্তমান আওয়ামী লীগের প্রতি তেমন ঝোঁক না থাকলেও ওদের হিসাব পরিষ্কার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ওদের অহংকার আছে- আবেগও আছে।

এ কারণে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়া বিএনপির প্রতি আদর্শিক কারণে ওদের কোনো সহানুভূতি নেই। আদর্শ খুইয়ে সুবিধাবাদী চরিত্র নিয়ে কিছুসংখ্যক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে ঘর বাঁধাকে ওরা অনেকেই নিন্দার চোখে দেখছে। পাশাপাশি ওদের মূল্যায়ন দীর্ঘ ক্ষমতায় থেকে বিএনপি-জামায়াত জোট দেশের অবকাঠামোগত আর অর্থনৈতিক উন্নতি দেখাতে পারেনি। এ সময়ের মতোই সন্ত্রাস-দুর্নীতি করেছে। সুতরাং বিএনপি জোটের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মতো তেমন কারণ ওরা দেখছে না।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কম নয়। তবুও শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় তারা দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের মতো আধুনিকতার দিকে যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে এ সময়ে। তাই নতুন ভোটারদের একটি বড় সমর্থন নৌকার দিকে যাওয়ার কথা। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাস ওদের অনেককে আহত করে।

এসব কারণেও বিক্ষুব্ধ নতুন ভোটারদের অনেকে ভোটদানে বিরত থাকার কথাও ভাবছে। এমন বাস্তবতা একীভূত করলে এবারের নির্বাচনে নৌকার পক্ষেই ফল যাওয়ার কথা। তাহলে আওয়ামী লীগ নেতাদের হতাশ হয়ে বেপথে হাঁটা কেন! তারা বরং দেশবাসী আর বিশ্ববাসীর সামনে একটি সুন্দর নির্বাচন দিয়ে নিজেদের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে পারেন। দলীয় সরকারের অধীনেও যে একটি ভালো নির্বাচন হতে পারে, তা প্রমাণের বড় সুযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগের সামনে। তবে এতটা দ্বিধা কেন? তাহলে কি লীগ নেতৃত্ব নিজ দলের ভেতর থেকে কোনো শঙ্কা আঁচ করছে?

এবার সূচনা পর্বের কথায় আসি। শ্রদ্ধেয় ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য, সংবিধানের অন্যতম রচনাকারী। আওয়ামী লীগের একসময়ের একনিষ্ঠ কর্মী। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রীও ছিলেন তিনি। কিন্তু ঘোড়েল রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি নিজেকে কখনও প্রমাণ করতে পারেননি। তিনি যে জনগণসংশ্লিষ্ট, তেমনও বলা যাবে না। তাই নির্বাচন করে কখনও জেতার রেকর্ড তার নেই।

দলের ভেতর থেকে অভিমানের সূত্রে তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়েন। গঠন করেন গণফোরাম নামের দল। দীর্ঘদিনেও এই দলের তেমন বলবৃদ্ধি ঘটেনি। তবুও সাধারণ মানুষের মনে তার প্রতি একটি সম্মান ছিল। তিনি যদি আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাচারী শাসনের বিরুদ্ধে তার দল ও সমমনাদের নিয়ে দেশপ্রেমিকের মতো আওয়াজ তুলতেন তবে মানুষ অনেকটা স্বস্তি পেত। জাতির বিবেক হিসেবে তাকে সম্মানের জায়গায় রাখত। কিন্তু শেষ বয়সে কাদের প্ররোচনায় তার এমন স্খলন ঘটল আমরা বুঝতে পারি না।

নির্বাচনে তার দলীয়দের জেতার প্রত্যাশায় এমন এক দলের সঙ্গে হাত মেলালেন, যে দলের সঙ্গে তার আদর্শিক বৈপরীত্য প্রবল। বিশেষ করে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের সঙ্গেও একাকার হয়ে গেলেন এ মুক্তিযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট মানুষটি। জামায়াতের সঙ্গে অভিন্ন শামিয়ানার নিচে তার দলের নেতারা ধানের শীষ মার্কায় নির্বাচনে নেমেছেন। এ স্খলনের কালিমাকে কোনো যুক্তি দিয়েই মোছা যাবে না।

আমার ধারণা, এ বিষয়টি তাকে আত্মপীড়নে দগ্ধ করছে। এরই বহিঃপ্রকাশ দেখলাম বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে। সাংবাদিকদের যৌক্তিক প্রশ্নে তিনি যেভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন, একে সুস্থ চিন্তার বক্তব্য বলা যাবে না। কাদায় পা ডুবিয়ে হয়তো বুঝতে পেরেছেন কী ভুলটি তিনি করেছেন! তাই জামায়াত প্রসঙ্গে করা প্রশ্নকে তিনি অসঙ্গত মনে করলেন। ঘোড়েল রাজনীতিবিদ নন বলে রাজনৈতিক বক্তব্যের চাতুর্যে নিজেকে আড়াল না করে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। আবার মনে হল, চারপাশের মানুষ কি তাকে এ ধারণা দিয়েছেন যে নির্বাচনে জিতে তারা সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন! তাই সাংবাদিকদের নাম-ঠিকানা জানতে চাইছেন! তাদের দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন!

কিন্তু এ সত্যটি তাকে মানতে হবে যে, জামায়াত-বিএনপির বলয়ে একবার যখন পা দিয়েছেন, নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করুন বা বিরোধী দলে অবস্থান নিন, জামায়াতের সঙ্গে হাত মেলানোর সূত্রে এমন প্রশ্ন শুধু সাংবাদিক নন, ইতিহাসের পাতাও তাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। আদালতেও স্বীকৃত জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধী দল। এদেশের রাজনীতিতে নিবন্ধন হারিয়েছে।

এ দলের নেতারা মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে আদালত কর্তৃক সর্বোচ্চ শাস্তি পেয়েছে। আর এ জামায়াতের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়িয়ে ধানের শীষ প্রতীককে বরণ করেছেন ড. কামাল হোসেন। অর্থাৎ জেনেশুনেই কণ্টকহার গলায় পরেছেন। তাই শত ক্ষুব্ধ হলেও তাকে এবং তাদের কাঁটার খোঁচা সইতেই হবে।

এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×