রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার উত্তেজনা এবার সমুদ্রে

  ইয়াসির ইয়াকাস ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাশিয়া

ফের রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে- এবার সমস্যাটি সমুদ্রকেন্দ্রিক। আজভ সাগরে ওডেসা থেকে মারিউপোল যাওয়ার পথে ২৫ নভেম্বর রাশিয়ার নৌবাহিনী ক্রিমিয়া উপদ্বীপে ইউক্রেনের একটি উদ্ধার ও দুটি সাধারণ জাহাজে হামলা করে এবং জব্দ করে নিয়ে যায়।

ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউ বলেছে, ‘রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার শারীরিক ও মানসিক চাপের জবাবে পাল্টা গোয়েন্দা অপারেশন চালানোর দায়িত্বে ছিলেন জাহাজ দুটিতে থাকা কর্মকর্তারা।

রাশিয়ার ফেডারেল নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইউক্রেনের নৌবাহিনীর জাহাজগুলো রাশিয়ার সমুদ্রসীমায় প্রবেশ করার কারণে তাদের দিকে হামলা করা হয়। এ দুটি বিবৃতি থেকে এটি স্পষ্ট যে, এ বিতর্কে দুটি সত্য আছে, একটি নয়। রাশিয়ার মতে সত্য হল, ক্রিমিয়া ২০১৪ সালে রুশ ফেডারেশনে যোগদান করে; এ কারণে এর সমুদ্রসীমায় যে কোনো বিদেশি জাহাজ প্রবেশে বাধাদানের দায়িত্ব রাশিয়ার ওপর ন্যস্ত। ইউক্রেনের দিক থেকে দেখা হলে সত্য হবে, দেশটি রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি স্বীকার করে না এবং এ কারণে দেশটি সমুদ্রসীমার বিষয়ে মস্কোর দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছে।’

তারপরও এসবিইউ’র বিবৃতি মোতাবেক, নিজেদের জাহাজ মারিউপোল যাওয়ার পথে কারচপ্রণালি অতিক্রম করবে- বিষয়টি আগেই রাশিয়াকে অবহিত করা হয়েছিল। এ ব্যাকগ্রাউন্ড বিবেচনায় নিলে এটা স্পষ্ট যে, উভয়পক্ষ নিজেদের দাবিকে বিরাজিত রাখার প্রচেষ্টা থেকে সংঘর্ষটির উদ্রেক হয়েছে।

২০০৩ সালে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তির আওতায় কারচপ্রণালি ও আজভ সাগর দু’পক্ষের যৌথ সমুদ্র অঞ্চল। আজভ সাগরের মারিউপোল ও বারদিয়ানস্ক বন্দর ইউক্রেনের শস্য ও ধাতব পণ্য রফতানির এবং যে কোনো পণ্য আমদানির প্রধান মাধ্যম। যা হোক, রাশিয়ার দাবি মোতাবেক কারচপ্রণালি দিয়ে ট্রানজিট হতে হবে আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মনীতির সাধারণ পদ্ধতিতে, যা ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ (সমুদ্রবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইনের ধারা-১৯ মোতাবেক উপকূলীয় দেশের সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ যুক্ত) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

এ মোতাবেক সমুদ্র উপকূলীয় নয় এমন দেশগুলোর জাহাজ উপকূলীয় দেশের সমুদ্রসীমা দিয়ে চলাচল করতে পারবে; কিন্তু উপকূলীয় দেশের অধিকার রয়েছে জাহাজ ও কার্গো জাহাজ পরিদর্শনের এবং উপকূলীয় দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে এমন সামরিক যন্ত্রপাতিবাহী কার্গোর চলাচলে বাধা দেয়ার অধিকারও রয়েছে দেশটির। মাঝেমধ্যে এ ধরনের পরিদর্শন পূর্ণমাত্রায় হয়রানিমূলক হয়ে পড়তে পারে।

বিষয়গুলোকে আরও জটিল করার লক্ষ্যে কারচপ্রণালির ওপর দিয়ে একটি ব্রিজ তৈরি করেছে রাশিয়া, যার মাধ্যমে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে সংযুক্ত করা হয়েছে। মস্কো ব্রিজের নিচে নোঙর করানোর জন্য একটি খালি ট্যাঙ্কার পাঠিয়েছে, যা প্রণালিটিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান নিজের মার্কিন ও রুশ প্রতিপক্ষ- ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। রাশিয়া চাচ্ছে সংঘর্ষটিকে ইউক্রেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে এবং তৃতীয় পক্ষের যে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ এড়িয়ে যেতে।

ভিয়েনাভিত্তিক ‘অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ’ রাশিয়া এবং ইউক্রেন- উভয় পক্ষকেই আরও উত্তেজনা তৈরি ও উসকানি দেয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। ন্যাটো ইউক্রেনকে শক্ত সমর্থন দিয়েছে এবং রাশিয়াকে দোষারোপ করেছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী প্রধান লর্ড ওয়েস্ট একটি রয়্যাল নেভি ডেস্ট্রয়ার পাঠানোর প্রস্তাব করেছেন; কিন্তু এটি বলা যত সহজ, করা ততই কঠিন কৃষ্ণসাগরের আন্তর্জাতিক মর্যাদার কারণে। আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী, নদীতীরস্থ দেশ না হলে নৌবাহিনী মোতায়েনে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর অর্থ হল, কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় দেশ না হলে এর জাহাজের উপস্থিতি ৪৫ হাজার টন ছাড়াতে পারবে না। এর বাইরে এ ধরনের জাহাজ কৃষ্ণসাগরে ২১ দিনের বেশি সময় অবস্থান করতেও পারবে না।

২০০৮ সালের রাশিয়া-জর্জিয়া সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল জর্জিয়া উপকূলে ৬৮ হাজার টনের একটি সামরিক হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর জন্য; কিন্তু তুরস্ক সরকার তাদের উপকূলীয় তার্কিশপ্রণালি দিয়ে এটি যাওয়ার অনুমতি দেয়নি এই দাবিতে যে, এটি মনট্রেক্স কনভেনশন অনুযায়ী যাওয়ার মতো নয়।

পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে এবং অনেক প্রশ্ন উঠতে পারে যদি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ন্যাটোর হস্তক্ষেপের মতো বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের দিকে ধাবিত হয়। তুরস্ক কি রাশিয়ায় সেনা পাঠাতে রাজি হবে, যেখানে সিরিয়ায় তারা খুবই ঘনিষ্ঠভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে? মনট্রেক্স কনভেনশন অনুযায়ী রুমানিয়া ও বুলগেরিয়ার জাহাজ কি ন্যাটো বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে, অকৃষ্ণসাগরীয় জাহাজ হিসেবে ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন রাশিয়াবিরোধী অপারেশনে তাদের কি অংশ নিতে হবে?

ন্যাটো ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর বিষয়টিও বিবেচনা করছে; তবে সেটি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নয়, ইউক্রেনের বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে। তুরস্ক কি এতে সেনা দিয়ে অবদান রাখবে? রাশিয়া বিষয়টিকে শত্রুতামূলক মনোভাব হিসেবে বিবেচনা করবে; যদিও এতে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের কোনোকিছু নেই। এটি হয়ে পড়বে একটি রাজনৈতিক সংঘাত।

মনট্রেক্স চুক্তি আরও একটি স্বতন্ত্র পরিস্থিতি তৈরি করছে- এর ২০ ধারা অনুযায়ী তুরস্ক যুদ্ধে অন্তর্ভুক্ত কি না। ধারাটি অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় তুরস্ক যুদ্ধে সহায়তাকারী দেশে পরিণত হবে তার্কিপ্রণালি দিয়ে যুদ্ধজাহাজ চলাচল করলে। ফলে তুরস্ক সরকারের বিচক্ষণতা হবে এ সুযোগ না দেয়া। এ ধারাটির কারণে কঠিন একটি পছন্দ বেছে নেয়ার মুখে পড়বে তুরস্ক। এটি কি ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর জাহাজের জন্য নিজেদের প্রণালি খুলে দিতে পারবে?

আরব নিউজ থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

ইয়াসির ইয়াকাস : তুরস্কের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন একেপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×