স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থায়নের ভূমিকা

  বানকি মুন ২২ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্য

স্বাস্থ্য একটি মানবাধিকার। যখন প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় মানুষ, বিশেষত বিষয়টি যখন ঘটে আর্থিক সমস্যার কারণে, তখন তাদের মানবাধিকার অস্বীকার করা হয়। অধিকার এবং ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়নের পক্ষে বিস্তৃত লড়াইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল এ বিষয়টি জেনে নীতিনির্ধারকদের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উদ্যাপন করেছে ১০ ডিসেম্বর। তারপরই একটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ১২ ডিসেম্বর- জাতিসংঘ কর্তৃক অনুমোদিত প্রথম বৈশ্বিক হেলথ প্রতিবেদন প্রচার বা ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) দিবস। ইউএইচসি গ্রহণ করা হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে সমতা ও স্বচ্ছতার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে, যেখানে মানুষের সামর্থ্য ও প্রয়োজন মোতাবেক স্বাস্থ্যসেবা বণ্টন হয়।

২০১৫ সালে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও ভালো একটি পৃথিবীর লক্ষ্যে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করার সময় জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে আমি গৌরবান্বিত ছিলাম। যখন লক্ষ্যমাত্রাগুলোতে স্বাক্ষর করছিলেন, তখন বিশ্বনেতারা ইউএইচসি সরবরাহ করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এবং নিজেদের করা প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এখন তাদের হাতে ১২ বছর সময় আছে।

মেয়াদ শেষ করে জাতিসংঘ থেকে আসার পর নেলসন ম্যান্ডেলা প্রতিষ্ঠিত শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের জন্য কাজ করা স্বতন্ত্র বিশ্বনেতাদের গ্রুপ দ্য এল্ডার্সে যোগদান করি আমি। দ্য এল্ডার্সের শীর্ষ অগ্রাধিকারের একটি হল ইউএইচসি, যাতে আমি ভীষণ আনন্দিত।

দক্ষিণ কোরিয়ায় বেড়ে ওঠার সময় তরুণ হিসেবে নিজেদের ইউএইচসিতে উত্তীর্ণ হওয়ার ক্রান্তিকাল আমি প্রত্যক্ষ করেছি। ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট পার্ক চাং হি দেশজুড়ে স্বাস্থ্য সংস্কার উদ্বোধন করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল জীবন রক্ষাকারী স্বাস্থ্যসেবায় প্রতিটি ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তির অধিকার থাকবে।

এ প্রক্রিয়াটি এখন বিশ্বজুড়ে সব ধরনের আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে ঘটছে, কারণ সরকারগুলো ইউএইচসিতে পৌঁছার বিষয়টি অনুভব করছে। এখন প্রয়োজন অপরিহার্য সরকারি অর্থায়নসহ একে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্য অর্থায়নে স্থলাভিষিক্ত করা।

কঠিন শোনালেও একমাত্র সম্পদশালী দেশ যে কিনা এখনও এ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেনি, সেটি হল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র। জিডিপির ১৭ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা সত্ত্বেও ৩ কোটি আমেরিকান স্বাস্থ্য বীমাহীন, সেখানে আরও অনেকে বীমার আওতায় থাকলেও আনুষঙ্গিক খরচাদি বেশি হওয়ায় এ সেবাটি ব্যবহার করে না।

যখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতাম, তখন আমি প্রায়ই বিস্মিত হয়ে যেতাম। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা এত বেশি ব্যয়বহুল ও অস্বচ্ছ ছিল যে, আমি ও আমার পরিবার যেমন স্বাস্থ্যসেবা পেতাম, সেটি সবার জন্য সহজলভ্য ছিল না। দুঃখজনকভাবে, প্রেসিডেন্ট ওবামার নেয়া সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা বা ওবামাকেয়ার অ্যাক্ট বাতিল করতে বর্তমান প্রশাসনের দৃঢ়প্রত্যয় এ পরিস্থিতিকে কেবল আরও খারাপের দিকে নিতে যাচ্ছে। এটি আমেরিকাকে বৈশ্বিক ইউএইচসি লক্ষ্যমাত্রা থেকে আরও দূরে নিয়ে যাবে।

তবে গত এক বছরে নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ায় দুটি অনুষ্ঠানে নিজের সহ-এল্ডার্সদের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রোগ্রামে আমি অংশ নিয়েছিলাম। যাতে দেখা গেছে যে, রাজ্য পর্যায়ে আরও দ্রুত ইউএইচসির দিকে পদক্ষেপের একটি তাড়না রয়েছে। স্বাস্থ্যসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এখন শীর্ষ রাজনৈতিক এজেন্ডা হল প্রগতিশীল রাজ্য পর্যায়ে সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যপদ্ধতির সত্যিকারের সুযোগ করে দেয়া, যা দেশজুড়ে একই ধরনের সংস্কারের পথে অনুঘটক হতে পারে। আমি চূড়ান্তভাবে বিশ্বাস করি, তারা সেটি করবে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজ্যগুলোই কেবল ইউএইচসির উন্নয়নের দিকে চলার জন্য একমাত্র প্রচেষ্টার উপযুক্ত স্থান নয়। অনেক মধ্যম আয়ের দেশ, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে অন্যায্য ও বেসরকারি অর্থায়নের পদ্ধতি ছিল, সেখানে এখন অর্থনৈতিক সম্পদ রয়েছে সরকারি অর্থায়নের পদ্ধতি চালু করার। এটি করার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুঘটক হিসেবে যা দরকার তা হল রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যেমনটি ১৯৭৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় আমরা দেখেছিলাম।

গত তিন বছর থেকে দ্য এল্ডার্স বিশ্বনেতাদের সঙ্গে কাজ করছে যাতে করে নিজেদের জনগণের জন্য সরকারি অর্থে ইউএইচসি প্রবর্তনে তাদের উৎসাহী করে তোলা যায়। ইউএইচসির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতার ভালো একটি উদাহরণ হলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদাদো, যিনি জ্বালানি তেলের ভর্তুকি কমিয়ে জমানো অর্থ এবং টোব্যাকোতে কর বাড়িয়ে প্রাপ্ত অর্থ ইউএইচসির অর্থায়নে ব্যবহার করছেন।

বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়া আরেকটি দেশ ভারত। সহকর্মী এল্ডার গ্রো হারলেম এবং আমার সুযোগ হয়েছে গত সেপ্টেম্বরে দিল্লি ও আহমদাবাদ সফরে যাওয়ার। সেখানে আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ে স্বাস্থ্য সংস্কারের উন্নয়নের বিষয়টি।

কয়েক দশকের স্বল্প ও ঘাটতি অর্থায়নের পর এটি অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার সরকার জনস্বাস্থ্যের ব্যয় ২০২৫ সালে জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করবে। যাহোক, আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে দেখেছি যে, অনেক কম ব্যয়বান্ধব প্রাথমিক সেবা কেন্দ্রের চেয়ে বরং ব্যয়বহুল তৃতীয় পর্যায়ভুক্ত হাসপাতালগুলোতে বীমার জন্য জোর দেয়া হচ্ছে।

আমরা দেখেছি, প্রাথমিক সেবা সেন্টারগুলো (পিএইচসি) দিল্লিতে অনেক ভালো ফল দিচ্ছে, যেখানে মানুষ সরকারি খাতের ফ্রি পিএইচসি সেবা কেন্দ্রগুলোতে আসছে রাজ্য সরকারের চিত্তাকর্ষক মহল্লা ক্লিনিকে। গরিব মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য এটি একটি পরীক্ষিত কৌশল, যা চীন, শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ডে ইউএইচসি পদ্ধতিকে নিয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকায় এ খাতের উন্নয়নের বিষয়ে আমরা অনেক বেশি আশান্বিত, যেখানে গত কয়েক মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা ও কেনিয়ার সরকার ইউএইচসিকে তাদের শীর্ষ অগ্রাধিকারে রেখেছে। দুটি দেশেই খোদ প্রেসিডেন্ট সংস্কারের তদারকি করছেন, যাতে করে বেশিরভাগ করের অর্থে নেয়া বৈশ্বিক ফ্রি স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যেক মানুষের জন্য নিশ্চিত করা যায়।

ইউএইচসির পথে থাকা সব দেশ ক্রসরোডের মুখে রয়েছে- একটি পথ চালিত করছে মার্কিন পদ্ধতির দিকে যাতে বেসরকারি অর্থায়নে ভঙ্গুর পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসেবায় ধনীদের জন্য সীমাহীন পছন্দের ব্যয়বহুল পদ্ধতি রয়েছে; কিন্তু দরিদ্ররা ব্যর্থ হচ্ছে সে সেবা নিতে বা নিতে গেলে তাদের দেউলিয়া হতে হচ্ছে। অন্যদিকে অবশিষ্ট পথটি ক্রমবর্ধমানভাবে নেয়া হচ্ছে বাকি বিশ্বে, যেখানে সর্বোচ্চ পুঁজিবাদের অর্থনীতিতেও সবাই স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পাচ্ছে। কারণ, রাষ্ট্র ধনীদের কাছ থেকে দরিদ্রদের জন্য অর্থ আদায় করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্যগুলো, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া এবং অন্যান্য দেশ, যারা পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো ক্রসরোডের দিকে এ পথটি নিতে অগ্রসর হচ্ছে তাদের সবার প্রতি আমাদের উপদেশ- সবার জন্য স্বাস্থ্য এবং ন্যায্য, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ সমাজের প্রতি একমাত্র চলাচলের উপযোগী হিসেবে এই পথটি যেন তারা গ্রহণ করে।

পাকিস্তানের দ্য ডন থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

বান কি মুন : জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×