নির্বাচন ও গণতন্ত্র

  ড. খুরশিদ আলম ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন

গণতন্ত্র ও নির্বাচন সমার্থক শব্দ নয়, তবে দ্বিতীয়টি প্রথমটির পরিপূরক। নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র হয় না আবার গণতন্ত্র ছাড়া নির্বাচন প্রায় অর্থহীন। গণতন্ত্র ছাড়া নির্বাচন আত্মাহীন দেহের মতো। তাই দেশে দেশে গণতন্ত্র পাওয়ার আশায় হাজার বছর ধরে নির্বাচনচর্চা অব্যাহত রয়েছে। ২০১৭ সালের গণতান্ত্রিক ইনডেক্সে দেখা যায়, ১৬৮টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৯টিতে (১১.৩ শতাংশ) গণতন্ত্র আছে।

ওই ইনডেক্সে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক দেশের শ্রেণী থেকে বেরিয়ে গেছে। আসলে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও সব মানুষ সমান সুযোগ-সুবিধা পায় এমন কোনো নজির নেই। সেসব দেশে বসবাসরত সবার ভোটের অধিকার নেই কিংবা অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও সমাজজীবনে তাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত।

রাষ্ট্রদর্শন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গ্রিক দার্শনিক প্লেটো গণতন্ত্রকে সমর্থন করেননি। তিনি মনে করতেন, গণতন্ত্র থেকে স্বৈরতন্ত্র তৈরি হয়। তিনি আদর্শ রাষ্ট্রে বিজ্ঞের শাসন দরকার বলে মনে করতেন। অ্যারিস্টটল বলেছেন, গণতন্ত্র হচ্ছে এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে কোনো একজনকে (নির্বাচিত) দোষী বলার সুযোগ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, যত রকমের সরকার পরীক্ষা করা হয়েছে, তন্মধ্যে এটি অধমের মধ্যে উত্তম। গ্রিক-পরবর্তী ইসলামী দর্শন গণতন্ত্র সমর্থন করে কিনা এ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে।

রাষ্ট্র দর্শনের সেই গ্রিক ধারা পরবর্তী সময়ে অব্যাহত থাকেনি। টমাস একুইনাস বলেছেন, যদিও রাজতন্ত্র একটি উত্তম সরকার, তবে সম্ভাব্য উত্তম সরকার হচ্ছে রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও গণতন্ত্রের মিশ্র সরকার। সম্ভবত তার সেই দর্শনের প্রভাব এখনও কিছু কিছু দেশে রয়েছে। অন্যদিকে টমাস হবস গণতন্ত্রের বিরোধিতা করেছেন এবং একনায়কতান্ত্রিক সরকার সমর্থন করেছেন। ঠিক তার বিপরীতে জন লকের দর্শনের সঙ্গে পাশ্চাত্যের বর্তমান গণতন্ত্রের মিল রয়েছে। ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো ছিলেন আদর্শ গণতন্ত্রের একজন প্রবক্তা। ইমানুয়েল কান্ট ব্যক্তির অধিকারের কথা এবং রাষ্ট্রের সীমিত ক্ষমতা রাখার কথা বলেছেন। জার্মান দার্শনিক হেগেল ব্যক্তিস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা ইত্যাদির কথা বলেছেন। কার্ল মার্কস সর্বহারার গণতন্ত্রের কথা বলেছেন, যা প্রায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

টকভেলি গণতন্ত্রকে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরশাসন’ বলে অভিহিত করেছেন। ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল কোনটি উত্তম সরকার তা নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন। তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে কিছু যুক্তি প্রদর্শন করেছেন। স্যামুয়েল হানটিংটন কিছুদিনের জন্য হলেও গণতন্ত্র বাদ দিয়ে উন্নয়নের জন্য স্বৈরতন্ত্র চালু করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকারের প্রথম জনগণকে শাসন করা দরকার তারপর নিজেকে। কিন্তু সরকারের পক্ষে প্রথমটি অর্জন করলে আর দ্বিতীয়টি অর্জন করা সম্ভব হয় না।

অপরদিকে জন রউল সব নাগরিকের সমান অধিকার দাবি করেছেন। অমর্ত্য সেন গণতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি খুঁজে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে একটি সম্পর্ক নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, উন্নয়ন করার জন্য গণতান্ত্রিক সরকার থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই, তবে সে ক্ষেত্রে যদি ওই উন্নয়নকারী সরকারের সঙ্গে গণতন্ত্র যোগ হয় তাহলে তা হবে উত্তম।

আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফরিদ জাকারিয়া গণতন্ত্র সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করে বলেছেন, দেশে দেশে ‘অবিকশিত গণতন্ত্র’ রয়েছে। ভারতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, সেখানে গণতন্ত্র অনেক সংকটের জন্ম দিয়েছে। তার মতে, গণতন্ত্র বর্তমান বিশ্বের অনেক সংকট যেমন জাতিগত সংঘাত, দারিদ্র্য, অত্যাচার, যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ তৈরি করেছে, যাকে তিনি ‘সংঘাতের গণতন্ত্রায়ন’ বলেছেন। উড্রো উইলসন বলেছেন, পৃথিবীটাকে গণতন্ত্রের জন্য নিরাপদ করতে হবে। আর ফরিদ জাকারিয়া বলেছেন, গণতন্ত্রকে পৃথিবীর জন্য নিরাপদ করতে হবে।

নির্বাচিত সরকারের বিষয়ে আরেকটি বড় অভিযোগ হচ্ছে, গণতান্ত্রিক সরকার তৈরি করা হলেও তা কদাচিৎ টিকে থাকে। ২০১৮ সালে ১১২টি নব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ওপর মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আলী কাদিবারের এক গবেষণায় দেখা যায়, যদি জনগণকে সংগঠিত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে, নতুন শাসনব্যবস্থার জন্য নেতৃত্ব গড়ে ওঠে, সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ তৈরি হয় এবং ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি হয়।

আরও বলা হয়, গণতন্ত্র থেকে অগণতান্ত্রিক সরকারে পরিবর্তন অব্যাহত থাকবে না, যদি সেখানে জনগণের উত্থানের বা বিবর্তনের ফলে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা পায়। আর যদি সেখানে বিপ্লব বা সংঘাতের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার তৈরি হয়, তাহলে তা টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এ তত্ত্বকে বিবেচনায় নিলে একথা বলা যায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে জন্ম হয়েছে বলে এ দেশে গণতন্ত্র টেকসই হয়নি।

মোটকথা, পুরো রাষ্ট্রদর্শনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথম দিককার দার্শনিকরা গণতন্ত্রের বিপক্ষে বা গণতন্ত্রকে ‘মন্দের মধ্যে ভালো’র শাসন বলে অভিহিত করেছেন। আর দ্বিতীয় দিককার দার্শনিকরা রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমিত করা এবং জনগণের স্বাধীনতা বা অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। তবে তাদের মধ্যে আবার একদল আছেন যারা জনগণের অবাধ ক্ষমতার বিরোধিতাও করেছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শাসকশ্রেণীর মধ্যকার লড়াই থামাতে নির্বাচন খুব কাজে লাগে। এটি হচ্ছে একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করার একটি ভালো প্রক্রিয়া। এতে শাসকশ্রেণী ক্ষমতা ভোগ করে আর ভোটাররা অক্ষমতা। তাদেরই নির্বাচিত সরকারের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন রকমের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দলীয় ভিত্তিতে ভোটের কারণে যারা নমিনেশন পায়, তাদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ নির্বাচিত হয়। দেখা যায়, সমাজবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী ব্যক্তিরাও নির্বাচিত হয়ে যায়। তাই একটি সংসদ নির্বাচন শেষ হলেই তখন লোকদের মধ্যে কাউন্টডাউন শুরু হয়ে যায়। অনেকে বাংলাদেশের সংসদের মেয়াদ চার বছর রাখার পক্ষে যুক্তি দেখান, যাতে অল্প সময়ের মধ্যে তাদের আবার জনগণের সামনে জবাবদিহির জন্য হাজির করা যায়। দেখা যায়, নির্বাচনের আগে রাজনীতিকরা কাঁদে আর নির্বাচনের পর জনগণ।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সরকারের মধ্যে জনগণকে সমীহ না করার প্রবণতা। বাংলাদেশের জন্য একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করাই যথেষ্ট নয়, বরং এমন একটি গণতান্ত্রিক সরকার থাকা দরকার, যারা জনগণকে সমীহ করে। আবার রাষ্ট্রের সব ক্ষমতাকে জনগণের কর্তৃত্বের অধীন করা প্রয়োজন বললেও তা থেকে রাষ্ট্রটি নৈরাজ্যের দিকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। শাসকের সর্বময় ক্ষমতা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি জনগণের সর্বময় ক্ষমতাও বিপজ্জনক। সরকার যদি বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে তা জনগণের জন্য মঙ্গলজনক নয়, আর জনগণ যদি বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনীতির গণতন্ত্রায়ন হচ্ছে, দেশের গণতন্ত্রায়ন নয়। কারণ প্রথমটি না হলে দ্বিতীয়টির কোনো সম্ভাবনা নেই। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী জনগণও অসহিষ্ণু, সাম্প্রদায়িক, আইনের প্রতি কম শ্রদ্ধাশীল এবং কম উদারতাবাদী হতে পারে। নির্বাচিত সরকারের সময়েও একপক্ষ যেমন সরকারের অর্জনকে সামান্য সম্মান করে আবার আরেক পক্ষ সরকারের ব্যর্থতাকে বেশি উল্লেখ করে। তাদের মধ্যে এটি কেবল ভিন্নমত নয়, বিবাদ বা বিরোধরূপে দেখা যায়। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামাজিক শান্তি ও সংহতি অর্জন যতটা হওয়ার কথা ততটা হয় না। সাধারণত রাজনৈতিক বিষয়ে জনগণ তথ্যের (ইনফরমেশন) চেয়ে নিজ নিজ ধারণা (ইমপ্রেশন) দ্বারা বেশি পরিচালিত হয়।

নির্বাচনকে গণতন্ত্র বলে বিবেচনা করলে ভুল হবে। তাকে বাদ দিয়ে যেমন গণতন্ত্র হবে না, তাকে গণতন্ত্র বলে ভুল করলে এর জন্য জনগণকে মাশুল দিতে হবে। বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে সবাই আশা করছেন। তাহলে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নিরসন না হয়ে দ্বন্দ্বমূলক একটি রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় থাকার আশঙ্কাই বেশি। নির্বাচিতদের মধ্যে প্রতিযোগিতা না হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সম্পর্ক বজায় থাকতে পারে। তাই আগামী নির্বাচন থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক সরকার পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

ড. খুরশিদ আলম : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×