বড়দিনের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে

  বাবু মার্কুজ গমেজ ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বড়দিন
ফাইল ছবি

বড়দিন এলেই যে গানটি আমাদের হৃদয়ে বারবার অনুরণিত হতে থাকে সেটি হল- ‘শীত মাঝে এলো বড়দিন এলো বুঝি ওই ফিরে, বাঙালির ঘরে ঘরে, কুয়াশার জাল ছিড়ে, এলো বুঝি ওই ফিরে।’ শীতের সঙ্গে বড়দিন উদ্যাপনের যেন আলাদা একটা আবেগ আছে! আর সেই আবেগটি দেশ থেকে দেশান্তরে সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে।

আজ ২৫ ডিসেম্বর, শুভ বড়দিন। খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক ও মহামানব যিশুর শুভ জন্মদিন। বড়দিন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবও। সারা বিশ্বের খ্রিস্টান সম্প্রদায় বর্ণিল আর নানা আয়োজনে যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন ‘বড়দিন’ উদ্যাপন করে থাকে।

দু’হাজার বছর আগে যোসেফ আর মাতা মেরির কোলজুড়ে যে ফুটফুটে শিশুটির জন্ম হয়েছিল তিনিই যিশুখ্রিস্ট। পবিত্র বাইবেলের মতে, মহামহিম ঈশ্বর মানুষের মুক্তির জন্য তার প্রিয় পুত্র যিশুকে মর্তে প্রেরণ করেছিলেন। যিশুর জন্মতিথির দিনটিই বড়দিন হিসেবে উদ্যাপিত হয়। তার জন্ম খুব সাধারণ ঘরে।

এক সময় সাধারণ থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন অসাধারণ এক মানুষ। হয়ে ওঠেন সত্য, ন্যায় ও আলোর প্রদর্শক। মহামানব হয়েও তিনি জন্ম নিয়েছিলেন গোয়ালঘরের ছোট্ট এক গোশালায়। রাজাধিরাজ যিশুর জীবনের গল্প কিন্তু খুবই সাদাসিধে। ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার বাধ্য সন্তান যিশুর নম্রতা, সরলতা, অধ্যবসায়, প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা মানুষকে তাক লাগিয়ে দিত।

তিনি ছোট-বড়র মাঝে বিভেদের কোনো দেয়াল রাখেননি। তার কাজ আর আদর্শের মধ্য দিয়ে তিনি সবার মনের রাজা হতে পেরেছিলেন। জীবদ্দশায় মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেছেন, দীন-দুঃখী সব শ্রেণীর মানুষকে সমান ভালোবেসেছেন, সাহায্য করেছেন।

নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে তিনি মানবজাতিকে মুক্তি দিয়ে গেছেন। রেখে গেছেন ভালোবাসা আর ক্ষমার উজ্জ্বল সব নিদর্শন। তার জন্মের সুসংবাদে স্বর্গলোকেও আনন্দের ফল্গ–ধারা বয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন দেশের পণ্ডিতরা আকাশের উজ্জ্বল তারা দেখে সোনা, রুপা, ধূপ আর উপহার নিয়ে তাকে দেখতে গিয়েছিলেন, তাকে প্রণাম জানিয়েছিলেন।

যিশুর জন্মের মধ্য দিয়ে আমরা ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হই। বড়দিন মানে ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন। তাই বড়দিনে আমরা এত আনন্দ করি।

ষড়ঋতুর এ অপরূপ বাংলায় বড়দিন আসে ভিন্ন এক আবহ নিয়ে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সর্বত্র বাংলার আকাশে-বাতাসে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। ডিসেম্বরের প্রথম ভাগে উত্তরের কনকনে আর ঝিরিঝিরি হাওয়া, শাপলা শালুকে শিশির বিন্দুর ওপর সূর্যের আলতো আভা যেন বড়দিনের আগমনী বার্তাকেই জানান দেয়।

নানা সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময়তায় তাকে বরণ করতে চলে নানা প্রস্তুতি। বাড়ির আঙিনা, ঘর পরিষ্কার থেকে শুরু করে বড়দিনের বিশেষ উপাসনার জন্য চলে গান প্র্যাকটিস। প্রতিটি ঘর আর সেলফোনে বড়দিনের গান বাজতে থাকে। ক্রিস্টমাস ট্রিসহ রঙ-বেরঙের বেলুন আর আলোয় সেজে ওঠে উপাসনাগৃহসহ আমাদের প্রতিটি ঘর।

কীর্তনের মধুর ছন্দে প্রাণ ফিরে পায় প্রতিটি গ্রাম। দেশের পাঁচ তারকা হোটেল আর শপিং মলগুলোও সেজে ওঠে ক্রিস্টমাস ট্রি আর রং-বেরঙের আলোয়। গণভবন আর বঙ্গভবনে সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বড়দিনের সাক্ষাৎ আর শুভেচ্ছা বিনিময় বাড়তি আনন্দ যোগ করে।

বড়দিনের দিন নতুন জামাকাপড় পরে খ্রিস্টযাগে যোগ দেয়া, সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করা নতুন এক মাত্রা এনে দেয়। মন-প্রাণ আনন্দে দুলে ওঠে। ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে বড়দিনের খুশি আর আনন্দ যেন বেশি পরিলক্ষিত হয়। বড়দের সালাম করে সেলামি নেয়। প্রতিটি ঘর নানা দেশীয় পিঠা আর বাহারি রান্নায় মৌ মৌ করতে থাকে।

কোথাও কোথাও সারা রাত জেগে যিশুখ্রিস্টের জন্মতিথি উদ্যাপন করা হয়। যে কোনো জিনিসই ভাগাভাগিতে আনন্দ বেশি। বড়দিনের বেলায়ও তাই।

‘Merry Christmas’ লেখা শুভেচ্ছা কার্ড বিতরণের মধ্য দিয়ে বড়দিনের আনন্দ প্রকাশ আর ভাগাভাগির মধ্যে অন্যরকম এক ভালোলাগা আর অনুভূতি কাজ করে। বড়দিনের আনন্দ আছড়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও। নানা পোস্ট আর ছবিতে ছেয়ে যায় এ মাধ্যমগুলো। আর সেলফোনের ক্ষুদে বার্তা তো আছেই।

অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ দেশে যে কোনো উৎসবই সার্বজনীনতা পেয়েছে। বড়দিনও তাই। আর আমাদের সার্বজনীন উৎসবের রঙে গণতন্ত্র পেয়েছে পরিপূর্ণতা। বড়দিন আমাদের প্রাণের উৎসব। আমরা প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বড়দিনের আনন্দ-অনুভূতি বিনিময় করতে পারছি।

এ মিলন আমাদের হাজার বছরের আবহমান বাংলার চিরচেনা ঐতিহ্যকেই তুলে ধরে। সব সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে শান্তি ও সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেছে। একটি দেশের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য এ বন্ধন খুবই দরকার এবং বাংলাদেশে সেই আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক আর বন্ধন খুবই সুদৃঢ়।

আমাদের এ বন্ধনটা যত সুসংহত আর গভীর হবে ততই সমৃদ্ধি আর শান্তির পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। প্রাণের উৎসবের এ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ই হোক আমাদের আজকের মূল চেতনা। বড়দিনের অনাবিল আনন্দ সবার জীবনকে রাঙিয়ে দিক। সবাইকে বড়দিনের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। শুভ বড়দিন!

বাবু মার্কুজ গমেজ : স্বর্ণপদক জয়ী শ্রেষ্ঠ সমবায়ী; প্রেসিডেন্ট, দ্য খ্রিস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি. ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×