দুই মহৎ ঐতিহাসিক জন্মতিথির অপেক্ষায়

  হারুন হাবীব ২৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুই মহৎ ঐতিহাসিক জন্মতিথির অপেক্ষায়

সবাই রাজনীতিতে জড়াবেন, এমনটা নয়। কিন্তু দৃশ্যতই আমাদের তরুণদের বেশির ভাগ রাজনীতিতে যোগ দিতে অনাগ্রহী থাকে।

তারা জীবনটাকে প্রচলিত রাজনীতির আবর্ত থেকে সরিয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, যার যার পেশায় মনোযোগী হতে চায়।

রাজনীতির চেহারা হয়তো তাদের তেমন আকৃষ্ট করে না। কিন্তু যেভাবেই দেখি না কেন, রাজনীতি সবাইকে স্পর্শ করে। রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্র্র থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। অতএব তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

সে কারণে রাজনীতিতে শিক্ষিত, আদর্শবান ও ত্যাগী যুব-তারুণ্যের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা বিদ্যমান সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

তবে আশার কথা, দেশে যখন জাতীয় নির্বাচনের মতো ঘটনা ঘটে, তখন পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আমাদের যুব-তারুণ্য প্রবলভাবে রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠে, নানা দলমতে ভাগ হয়ে তারা ভোটের মাঠে সরব হয়।

যার যার পছন্দের দল বা ব্যক্তিকে জেতানোর লড়াইয়ে নামে। বলতে কী, তখন একেবারেই মনে হয় না আমাদের তারুণ্যের রাজনীতিবিমুখতা আছে!

সব নির্বাচনই বড় ঘটনা, শুধু আমাদের দেশে নয়, অন্য দেশেও। তবে নানা কারণে ৩০ ডিসেম্বরের ভোট নিয়ে অনেক মহলেই শঙ্কা-সতর্কতা দেখা দিয়েছে।

কারণ এই ভোটের মধ্য দিয়েই স্থির হবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভবিষ্যতে কোন পথে চলবে, রাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন ঘটবে নাকি যা চলে আসছিল, সে ধারাতেই চলতে থাকবে।

আরও একটি বৈশিষ্ট্য যে, এবারের সংসদীয় নির্বাচন পাঁচ বছর আগের মতো নয়। গেলবারের মতো এবারে কেউই ভোট বর্জন করেনি, বরং প্রতিটি দল-মত নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। সবাই যার যার নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে।

ভোটের প্রচার চলছে জোরকদমে। ভোটের শোরগোল কেবল শহর-গঞ্জে নয়, ছড়িয়েছে গ্রাম-গ্রামান্তরেও। দুর্ভাগ্যজনক, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নির্বাচনী সহিংসতার খবর আসছে প্রায় প্রতিনিয়তই। আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের খবর আসছে। এসব সংঘাত-সংঘর্ষ ভালো দৃষ্টান্ত হতে পারে না।

এই ধারা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিপরীত। প্রতিপক্ষকে আক্রমণের সংস্কৃতি কখনোই সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হয় না, শুভ লক্ষণও নয়। আশা করব, নির্বাচন কমিশন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো পরিপূর্ণ নিরপেক্ষতায় পরিস্থিতি সামলে নেবে। অন্যথায় একটি সফল-সুন্দর আয়োজনের গায়ে কালি লাগবে।

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের মানুষ এবং যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি এবং নিশ্চিতভাবেই যা আমরা বলে যাব জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতেও, সেই আমরা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় প্রায় সারা দেশ ঘুরেছি।

গেছি ছোট-বড় শহর-বন্দর ও গ্রামে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারীদের পক্ষে, অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির সমর্থনে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেছি।

আসন্ন নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী ব্যক্তি ও পক্ষকে ভোট না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছি। যুদ্ধাপরাধ-বিচার অব্যাহত রাখতে; উদার, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে জনমানুষের সমর্থন চেয়েছি।

কারণ আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশ চাই, আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যে বাংলাদেশ নিঃশর্তভাবে বঙ্গবন্ধুকে, জাতির পিতাকে; নিঃশর্তভাবে মুক্তিযুদ্ধকে গ্রহণ করবে।

১৯৭৫-এর পর সামরিক ও আধা-সামরিক যে রাষ্ট্রশক্তিগুলো রাষ্ট্রপিতা ও মুক্তিযুদ্ধকে আঘাত করেছে, অপমানিত করেছে, আমরা চাই না সেই অপশক্তির কাছে লাখো শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশ আবারও ফিরে যাক।

বাংলাদেশের মতো দেশে, বলা যায় প্রায় সব দেশেই, সরকারি নীতি-কর্মের সমালোচনা, শক্ত সমালোচনা থাকে। দুঃখজনক হলেও অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দল ও ব্যক্তির বাড়াবাড়ি থাকে।

এ দেশেও প্রায় প্রতিটি সরকার সেই সমালোচনার মুখে পড়েছে। কাজেই সরকারি কাজ বা তার সমালোচনার পক্ষ-বিপক্ষ থাকবেই। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তধারায় জন্ম নেয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করবেন, তারা সাম্প্রদায়িক নীতি-আদর্শে দীক্ষিত হতে পারেন না; মুক্তিযুদ্ধ থেকে, জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে তারা জাতিকে বিচ্যুত করতে পারেন না। আর যারা তা করেন আমরা তাদের অশ্রদ্ধা করি, পরিপূর্ণভাবে পরিত্যাগ করি।

আমরা আমাদের শহীদদের স্বপ্নের কথা বলেছি : এই বাংলাদেশে ভিন্ন দল ও মত থাকবে, দল ও মতের শক্ত প্রতিপক্ষ থাকবে, কারণ এটিই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, যা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সবার কাম্য। আমরা চাই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের খেয়ালখুশিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে না। কিন্তু যে রাজনীতিতে বাংলাদেশ নামের খোলসে আরেকটি পূর্ব পাকিস্তান বানানোর কৌশল আঁটা হয়, সেই রাজনীতির সঙ্গে কখনোই সমঝোতা হতে পারে না।

অনেকেই হয়তো ভুল করে বসেছিলেন এই ভেবে যে, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর মুক্তিযুদ্ধ আর কখনোই এই বাংলাদেশে জেগে উঠবে না; বাঙালি জাতি আর কখনোই লাখো শহীদের ডাক শুনতে পাবে না, শুনবে না একাত্তরের লাখো নির্যাতিত নারীর আর্তনাদ।

কিংবা এমনটিও হয়তো ভেবে বসেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক-দালালদের, পঁচাত্তরের কুশিলব ও তাদের সমর্থকদের মুখ ভুলে গেছে মানুষ।

কিন্তু আমার দৃঢ় আস্থা, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, এতকাল পরও, নতুন করে তার স্বমহীমায় দীপ্যমান হয়ে উঠেছে ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। মুখোশের আড়ালে যারা একাত্তরের পরাজিত সেই অপশক্তিকে আশ্রয় দিচ্ছেন, প্রশ্রয় দিচ্ছেন, সৌভাগ্য যে, তাদের মুখগুলোও স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে আজ।

অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ২০১৮ সালে এসেও নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আমরা আরও আশ্বস্ত এই উপলব্ধিতে যে, নবপ্রজন্মের তাৎপর্যময় অংশ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবিচল আস্থা রেখেছে। তারা মাটি খুঁড়ে বের করে এনেছে সেই ইতিহাস, যে ইতিহাস বরেণ্য, যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল তাদেরই পূর্বপুরুষ।

দেশজুড়ে প্রায় প্রতিটি নাগরিক সংলাপ ও সমাবেশে আমরা ১৯৭১ তুলে ধরেছি, বলাই বাহুল্য, নিজেদের বোধ, বিশ্বাস ও আস্থা থেকে। আমরা বলেছি, অনেক হয়েছে, অনেক দুঃসহকাল গেছে আমাদের জন্মভূমির, আর নয়।

সে কারণে আমরা চাই- এই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে আর কখনোই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কেউ প্রবেশ করবে না। আমাদের সরকার হবে মুক্তিযুদ্ধপন্থী; বিরোধী দল, সরকার সব হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত।

একাত্তরের সহযোদ্ধাদের প্রায় সবাই সমস্বরে উচ্চারণ করেছেন, আমরা যেমন একাত্তরের রাজাকার গ্রহণ করি না, তেমনি গ্রহণ করি না সেই বিষমন্ত্রে দীক্ষিত পরবর্তী নতুনদেরও।

অর্থাৎ আমরা একটা নতুন অভিযাত্রা চাই আমাদের জন্মভূমির, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের। সেই অভিযাত্রা হবে সৌহার্দের, বিশ্বাসের, ইতিহাসের। একাত্তরের নৌকায় চেপে আমরা পাড়ি দিতে চাই সামনে, সৃষ্টি করতে চাই একটি মানবিক বাংলাদেশ, গণমানুষের বাংলাদেশ।

একটি আস্থা ও বিশ্বাসের কথা বলেই সংক্ষিপ্ত এ নিবন্ধটি শেষ করতে চাই। আগমী ৩০ ডিসেম্বর গণমানুষের সার্বজনীন ভোটে নতুন যে সরকার হবে বাংলাদেশের, তা হবে মুক্তিযুদ্ধের পরীক্ষিত রাজনৈতিক শক্তির।

মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি যতই সংঘবদ্ধ হোক, একাত্তরের পরাজিত অপশক্তি যতই আস্ফালন করুক, শহীদের রক্তস্নাত এই বাংলাদেশে তাদের সুনিশ্চিত পরাজয় হবে।

আরও একটি স্বপ্নের কথা আছে। দুই বছরের মধ্যে বিস্তারিত কর্মসূচিতে উদযাপিত হবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ৫০তম স্বাধীনতাবার্ষিকী। সেই সঙ্গে মহাসাড়ম্বরে উদযাপিত হবে রাষ্ট্রের স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী।

ভালো লাগছে এই ভেবে যে, এ দুই মহৎ ঐতিহাসিক জন্মতিথি উদযাপিত হবে একটি নতুন সরকারের হাতে।

হারুন হাবীব : মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×