ইশতেহারে নারী সমাজের প্রতি অঙ্গীকার কী

  রোকেয়া কবীর ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইশতেহারে নারী সমাজের প্রতি অঙ্গীকার কী
ইশতেহারে নারী সমাজের প্রতি অঙ্গীকার কী। ছবি: সংগৃহীত

‘গ্রিক সভ্যতা ক্রীতদাসের দান’- এ বাক্যটি আমরা ছোটবেলায় পড়েছি এবং প্রায়ই শুনতাম। গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘরও এ গ্রিস। তবে তখন যে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র প্রচলিত ছিল, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী, যারা ছিল দাস, তাদের কোনো স্থান ছিল না।

ছোটবেলায় আমরা আরও একটি দেয়াল লেখা যা দেয়ালে টাঙানো বাঁধাই করা সূচিকর্মে দেখতাম ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। আরও পরে এ দেয়াল লেখনে একটি বাক্য সংযোজিত হয়, ‘সুযোগ্য পতি যদি থাকে তার সনে’। বলাই বাহুল্য, তখনকার সময়ে মেয়েদের বিবাহের যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে গায়ের রঙের পাশাপাশি গৃহকর্ম অর্থাৎ রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘর গোছানো ও সূচিকর্মে নারী কতটুকু পারদর্শী তা দেখা হতো। এবং সূচিকর্মের মাধ্যমে যে বার্তা বা মেসেজটি দেয়া হতো তা হচ্ছে ‘সংসার’ বা পরিবারের সুখ-শান্তির মূল দায়িত্ব নারীর ওপর ন্যস্ত। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে নারী সেই সংসারের ‘সুখ’ বজায় রাখবেন, তবে সেই ‘সুখ’-এর ছিটেফোঁটাও কি নারীর ভাগ্যে জুটত বা জোটে? যেমন গ্রিসের সাম্রাজ্য, দালানকোঠা, আরাম-আয়েশ তথা ‘সভ্যতা’ ক্রীতদাসদের হাতে গড়ে উঠলেও তার ছিটেফোঁটাও তাদের ভাগ্যে জোটেনি। আজ এত যুগ পরও নারীর ভাগ্যে কি শিকে ছিড়ল?

নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ইত্যাদির মাপকাঠিতে সারা বিশ্বে বেশ উচ্চতায় স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। এতকিছুর পরও মাঝে মাঝেই আমরা প্রশ্নের সম্মুখীন হই- ‘তোমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী, স্পিকার সবাই নারী, তারপরও এত নারী নির্যাতন কেমন করে হয়? এখনও কেন উত্তরাধিকারে তোমাদের সমানাধিকার নেই?’

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ও জোটসহ কয়েকটি বামপন্থী দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা বিভিন্ন মিডিয়া যথা- পত্রিকা, টিভি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদির মাধ্যমে যারা এ বিষয়ে আগ্রহী তারা জেনেছেন। নারী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন, ইশতেহারে নারীর বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে- এ বিষয়ে আমার মতামত কী? এ বিষয়ে মহিলা পরিষদ সাংগঠনিকভাবে এবং এছাড়াও অনেকেই ব্যক্তিগত মতামত দিয়েছেন। নতুন করে আমার বলার কিছুই নেই- মোটাদাগে বললে, নারী সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি- ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড’, যার অন্যতম একটি বিষয় উত্তরাধিকারে সমানাধিকারের বিষয়টির কোনোরূপ উল্লেখ নেই মূল দুই জোটের ইশতেহারে। সব ইশতেহারেই নারী নির্যাতন, সরকারি-বেসরকারি কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাক্ষেত্রসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ইত্যাদি প্রান্তিক বিষয় নিয়ে কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। সম নাগরিকত্ব, বৈষম্যহীন জীবনের যে ভিত্তি ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড এ দেশের নারী সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের ইশতেহার হিসেবে জাতির সামনে তুলে ধরেছে এবং গত কয়েক দশক ধরেই এ নিয়ে নিরন্তর দাবি উত্থাপন করে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে কোনো বক্তব্যই নেই আলোচ্য ইশতেহারগুলোতে। আমি বামপন্থী দলগুলোর ইশতেহার এখানে আর আলোচনায় আনছি না। কারণ তাদের সংসদে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সামান্যই এবং যত ভালো কথাই থাকুক, তার বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের কোনোরকম দায় বহন করতে হবে না আপাতত। আমরা জানি, সমান অধিকার বা সম নাগরিকত্বের ভিত্তিই হচ্ছে জন্মের পর যে পরিবারে কেউ বেড়ে ওঠে, সেই পরিবারেই সে আইনগতভাবে সম্পদ ও সম্পত্তিতে তার সমান অধিকার পায় না। তার মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা স্বীকৃত হয় না- পায়ের নিচে সমান মাটি থাকে না এবং জন্মের মতো নারী তার ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ হারায়। সুতরাং নারীকে জন্মের পরই বৈষম্যের মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের যে অন্যতম চেতনা বা মূল্যবোধ সেটি হচ্ছে বৈষম্য দূর করা- উত্তরাধিকারে সমানাধিকার না থাকা সেই চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অবশ্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮-এর ওপর হোটেল সোনারগাঁওয়ে যে ভাষণ দিয়েছেন, সেখানে নারীর ক্ষমতায়ন অংশে ‘জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ’ সম্পর্কে ‘নারীর প্রতি সব বৈষম্যমূলক আচরণ/প্রথা বিলোপ করা হবে’ বলে জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পারিবারিক আইনটি যেহেতু প্রথাগত আইনের ওপর ভিত্তি করে প্রচলিত, সেহেতু এ বৈষম্যমূলক প্রথাগত আইনটি বাতিলের উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগ কতটুকু আন্তরিক হবে তা ভবিষ্যৎই বলবে।

ভোটারদের অর্ধেক নারী, নারীর ভোট দেয়ার অধিকার আছে- কেবল এ সান্ত্বনা পুরস্কার নিয়ে থাকতে হচ্ছে। পুরুষরা নারীর ভোট নিয়ে ক্ষমতায় বা সংসদে যাবেন, জনগণের/দেশের নীতিনির্ধারণ বা ভাগ্য নির্ধারণ করবেন; কিন্তু একটি অতি ক্ষুদ্রাংশ ব্যতীত নারী সমভাবে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন না বাংলাদেশের এত অর্জনের পরও! এ দুঃখ নিয়েই কি আমাদের থাকতে হবে? আর কতকাল?

এত দুঃখ নিয়েও সবশেষে একটি কথা দিয়েই শেষ করতে চাই- মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাওয়া এ বাংলাদেশ। এর মহান জাতীয় সংসদে খুনি, নারী ধর্ষণকারী, নারীর সমানাধিকারবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবির চক্রকে যেন দেখতে না হয়- শহীদের আত্মার শান্তির জন্য যেন আমরা এ কাজটুকু করতে পারি।

আমি এখন ভিক্ষা চাই না, অন্তত কুত্তা সামলান।

রোকেয়া কবীর : মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×