তরুণরাই নির্বাচনের অগ্রবর্তী শ্রেণী

  ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জনসংখ্যা

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। তারুণ্যের সম্মিলিত শক্তি একটি সমাজের আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে। আমরা ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সেই তারুণ্যের দাপট দেখেছি। এ তারুণ্যশক্তির সিংহভাগই এবারের ভোটার।

নতুন ভোটাররা বয়সে তরুণ হলেও বুদ্ধিতে তরুণ নয়। প্রযুক্তি তাদের হাতের মুঠোয়। তারা কারও সাহায্য ছাড়াই তাদের জন্মের আগের তথ্যরাজ্যে একনিমিষেই ঘুরে আসতে পারে। তারা আঙুলের একটু স্পর্শে সহজেই জানতে পারে বিশ্ব পরিস্থিতি, উন্নতি-অবনতি। সুতরাং তাদের ধোঁকা দেয়ার সুযোগ খুব কম। আবার কোন সরকার দেশটা কতটুকু এগিয়ে নিয়ে গেছে কিংবা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি রাখে- এটাও তারা প্রযুক্তির মাঝেই দেখতে পায়।

এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হতে তরুণদের ভোট সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে। সারা দেশে এবার ১৮ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে বয়সের মোট ভোটারের সংখ্যা ২ কোটি ৩১ লাখ। সরল হিসাবে ৩০০ আসন দিয়ে এই ভোটার সংখ্যাকে ভাগ করলে আসনপ্রতি ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৭ হাজার। সারা দেশের মোট ভোটারের সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০। অর্থাৎ ভোটারদের একটি বড় অংশই হচ্ছে তরুণ ভোটার। তারুণ্যের এই ভোট যারা পাবেন, বিজয় তাদের সুনিশ্চিত। এই হিসাবেই দায়িত্বশীল বিভিন্ন সংগঠন বারবার তরুণ ভোটারদের ভুল না করার আহ্বান জানাচ্ছেন।

অতিসম্প্র্রতি রাজধানীতে তারুণ্যের ভোট ভাবনায় এক গোলটেবিল আলোচনায় আশা প্রকাশ করে বলা হয়, এবার তরুণদের প্রথম ভোট হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। সারা দেশে তরুণদের ঘিরে গত ১০ বছরে যত উন্নয়ন হয়েছে, তা অতীতে কোনো দিন হয়নি। ফলে তরুণরা নিজেদের আরও এগিয়ে নিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভোট দেবে। সত্যের মাধ্যমেই তরুণদের সঠিক পথে রাখা যাবে। এ সত্য জানার পথে সব বাধা অতিক্রম করতে হবে। সত্যের মাধ্যমেই সঠিক নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাবে। সারা দেশ যেভাবে ডিজিটালাইজড হয়েছে তাতে দেশ তথা তরুণরা এগিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের মাধ্যমেই তরুণরা তাদের চেতনা এগিয়ে নেবে।

বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টিসহ কর্মসংস্থানের সবধরনের ব্যবস্থাই করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের যে ট্রেনটি দ্রুত বেগে ছুটে যাচ্ছে, এ ট্রেন থেকে তরুণরা নেমে যাবে- মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে থাকবে না বলে মনে হয় না। অবশ্যই বর্তমান সরকারের প্রতি এ তরুণরা আস্থা রাখবে এবং দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

ছাত্র বা বেকার তরুণ যারা আমাদের ভবিষ্যৎ, তারা সবাই এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায় যা হবে উন্নত, কর্মমুখর ও সহিংসতামুক্ত সোনার বাংলাদেশ। দুর্নীতি, সহিংসতা ও জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে বড় বাধা বলে মনে করে তরুণরা। তারা এমন জনপ্রতিনিধিকে ভোট দিতে চায় এবং এমন সরকার দেখতে চায়, যে সরকার তাদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হবে, যে সরকার তাদের দাবিকে প্রাধান্য দেবে এবং তাদের অগ্রযাত্রায় সক্রিয় অংশীদার হবে। এসব বিবেচনায় তারুণ্যের মেধা, শ্রম ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সোনার বাংলা গঠনই হতে হবে আগামী নির্বাচিত সরকারের মূল লক্ষ্য। এ অঙ্গীকার নিয়ে যে প্রার্থী বা দল নির্বাচনে অংশ নেবে এবং যারা তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি এরই মধ্যে রক্ষা করেছেন, তাদেরই তারুণরা মূল্যবান ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে। তরুণদের এ চাওয়া পূরণ হতে পারে কাকে বিজয়ী করলে, আজকের বুদ্ধিদীপ্ত তারুণ্যকে তা বলে দিতে হবে বলে অন্তত আমি মনে করি না।

অনেকেই বলছেন, এবার তারুণ্যের প্রথম ভোট মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে হোক। আমি বিশ্বাস করি, তারুণ্যের প্রথম ভোটটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই হবে। কারণ আমি দেখেছি দেশপ্রেমে ও দেশজ চেতনায় কখনও কখনও তরুণরা আমাদের চেয়েও এগিয়ে। একটি দেশ তখনই এগিয়ে যায়, যখন দেশ একটি শুভশক্তির নেতৃত্বে থাকে। সেই শুভশক্তির নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ আরও প্রশস্ত হয়। উন্নয়নের গতি আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশের তারুণ্য এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত। তারুণ্য পরিবর্তনের ধারা তৈরি করে।

যে কোনো সাহসী কার্যক্রমে তারা জেগে ওঠে। যেদিকে তারুণ্য এগিয়ে যায়, সেদিকেই সাড়া জাগে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বড় শক্তি ছিল তারুণ্য। সেই চেতনাকে ধারণ করে বেড়ে উঠছে আমাদের নতুন প্রজন্ম। নিত্যনতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। তাই আগামী নির্বাচনে তরুণরা সেই শুভশক্তিকে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দলকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে। আমি বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে তরুণরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

রাজনীতির মাঠে চলছে এখন সত্য-মিথ্যার লড়াই। মানুষকে বোকা বানানোর খেলা চলছে। মিথ্যা বলে তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে। তাই এ মিথ্যাবাদীদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে। তাদের সত্য খুঁজে দেখতে হবে। রাজনীতিবিদদের দোষ দিলে চলবে না, নাগরিক হিসেবে সত্যের পক্ষে ভোট দিতে হবে। তরুণদেরই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আমি আস্থাবান, তরুণরা সেটাই করবে।

তরুণরা দেশমুখী। তরুণরা এখন পড়াশোনার জন্য দেশের বাইরে গেলেও আবার ফিরে আসছে দেশে। কারণ বাংলাদেশে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। সে সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে বর্তমান সরকার। এ সম্ভাবনাকে কোনো মতেই ধ্বংস হতে দেয়া যাবে না। তরুণরা মেধা ও পরিশ্রমে বিশ্বাস করে। দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি দৃশ্যমান হচ্ছে। পাশের দেশের চেয়ে আমাদের উন্নয়নে বিশ্বের মানুষ বিস্মিত। এশিয়ায় আমরা ১২তম অবস্থানে আছি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা সপ্তম অবস্থানে চলে আসব। আমাদের সামনে সেই অপার সম্ভাবনার হাতছানি। তরুণ প্রজন্মকেই সেই সম্ভাবনাকে সফল করতে হবে। আমি মনে করি, আধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে তারা আমাদের যে কারও চেয়ে এখন অনেক বেশি প্রজ্ঞার অধিকারী। আজকের তরুণ আগামী দিনের বাংলাদেশ। তরুণরাই ১৬.৫ কোটি মানুষের ভাগ্যবদলের কথা বলবে, এগিয়ে নেয়ার কথা বলবে, বাংলাদেশকে সম্মানের আসনে নিয়ে যাবে। তাদের বুদ্ধিদীপ্ত একটি ভোট বদলে দিতে পারে এ বাংলাদেশকে। দূরীভূত করতে পারে বাংলাদেশের সব অন্ধকারকে।

তরুণ প্রজন্ম সবসময় সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ভোটের মধ্য দিয়ে সবাই উন্নয়নকে এগিয়ে নেবে এমন সরকার দেখতে চায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তারুণ্যদীপ্ত নেতৃত্বে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশ। যারা প্রগতি ও প্রবৃদ্ধির কথা চিন্তা করছে, তারা শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। দেশকে পুঁথিগত নয়, বাস্তব উন্নয়নের ধারায় তিনি নিয়ে এসেছেন। তাই নতুন ভোটারদের দেশকে এগিয়ে নিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একটি ভুল সিদ্ধান্তে থমকে যেতে পারে দেশের উন্নয়নের বিজয় নিশান। ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সাফল্যের অগ্রযাত্রায় তৈরি হবে প্রতিবন্ধকতা।

আমরা আমাদের আত্মসম্মানবোধ ফিরে পেয়েছি। এ দেশের এখনকার তরুণরা আত্মসম্মানের চিত্র দেখেছে। আজকে একটি প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে। আর এ দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ দেশের তরুণরাই ডিজিটাল বাংলাদেশের আলোকবর্তিকা। পদ্মা সেতুসহ যত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে বা হচ্ছে, এগুলো আমাদের দেশের আত্মসম্মানবোধ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিগত কয়েক বছরে আমরা অনেক উন্নয়ন দেখেছি। উন্নয়ন যা হচ্ছে, সেটা শুধু আমাদের জন্য নয়, এটা থেকে যাবে নতুন প্রজন্মের জন্যও। তরুণরা দেশের ভবিষ্যৎ। আমাদের তরুণরা যত সক্রিয় হবে, দেশ ততটাই এগিয়ে যাবে। দেশের উন্নতি হলে, দেশ এগিয়ে গেলে, এগিয়ে যাব আমরাও। এ উন্নয়নের হাতিয়ার তারুণ্য। তারুণ্য জেগে উঠলেই এগিয়ে যাবে আমাদের বাংলাদেশ।

বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার। এখন ক্রিকেটেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এটাও তারুণ্যেরই জয়। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি- যে শক্তি মুক্তিযুদ্ধ, এসডিজি ও টেকসই উন্নয়নের কথা বলবে, তরুণরা সেই শক্তির পক্ষ নেবে। তরুণরা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা বাড়াবে। অন্যদিকে উন্নয়নের শত্র“কেও আজ চিহ্নিত করা জরুরি। উন্নয়নের পক্ষে ভোটের মাধ্যমেই উন্নয়নের শত্র“কে বিদায় জানাতে হবে। আর সে দায়িত্বটিও নেবে আজকের এ তারুণ্য। জয় হোক তারুণ্যের। জয় হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের।

প্রফেসর ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ : শিক্ষাবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×