ভুটানি গণতন্ত্র

  মাসুদ কামাল হিন্দোল ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভুটানি গণতন্ত্র

সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরই আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভুটান। ভুটানের নাম প্রথম শুনি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। এ দেশটি সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হয় ১৯৮৫ সালে ঢাকায় প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের সময়। ভুটানের রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াং চুক এক ব্যতিক্রমী পোশাক পরে এসেছিলেন সম্মেলনে।

তখন আমরা জানতে পারি, তিনি অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট এবং তার চারজন স্ত্রী। অর্থাৎ চারজন রানী। সম্পর্কে এ চার রানী আপন বোন। রাজার সঙ্গে একই সময়ে চার বোনের বিয়ে হয়েছে (এক সঙ্গে একাধিক স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ভুটানে বৈধ)। এটা শুধু রাজার জন্যই প্রযোজ্য। ভুটানের জাতীয় নৃত্যও অনেকের কাছে ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। বিষয়গুলো আমাদের অনেকের দৃষ্টি কাড়ে। এসব তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিরই অংশ। স্বাধীন বংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি (৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) প্রদানকারী দেশ ভুটান। এ দেশটি নানাভাবে আলোচনায় এসেছে পরবর্তী পর্যায়ে। ছবির মতো সুন্দর এই দেশ- বিশ্বের অন্যতম সৌন্দর্যের লীলাভূমি।

১৭ হাজার ৩০০ বর্গমাইলের ভুটানের জনসংখ্যা প্রায় আট লাখ। রাজধানী থিম্পু। মাথাপিছু আয় প্রায় ২০০০ ডলার। ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর-আদাবর-শেরেবাংলা নগরের আংশিক) ও ঢাকা-১০ (ধানমণ্ডি-কলাবাগান-নিউমার্কেট-হাজারীবাগ)- এ দুই সংসদীয় আসনে যত জনসংখ্যা আছে, ভুটানের জনসংখ্যা তার চেয়ে কম। দেশটির মোট ভূমির ৭২ শতাংশ বনাঞ্চল।

সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা মাত্র ৬ হাজার। ১৯৮৫ সালের আগে সেখানে কোনো টেলিভিশন, রেডিও এমনকি দৈনিক সংবাদপত্র ছিল না। এখন এসব আছে। আস্তে আস্তে তাদের এ ঘাটতি পূরণ হচ্ছে। বিশ্বে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত প্রথম দেশ ভুটান। দেশটি থেকে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয় তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কার্বন শোষিত হওয়াতেই এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত। তাই ভুটানকে অক্সিজেনের দেশও বলা হয়।

ভুটানে অতীতে অনেক কিছু ছিল না এবং এখনও অনেক কিছু নেই। দেশটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া এখনও লাগেনি। তারপরও দেশটির জনগণ অনেক সুখী। তাদের কাছে সুখের গুরুত্ব রয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ভুটান নানা সময় আলোচনায় এসেছে। সুখী দেশের তালিকায় দেশটি এক নম্বরে এসেছিল কয়েক বছর আগে। তাদের জিডিপিতে তারা সুখকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভুটান অন্যান্য দেশের মতো জিডিপির পরিবর্তে জিএনএইচকে (Gross National Happiness) গুরুত্ব দেয়। সুখটাকেই বেশি প্রাধান্য দেয় তারা। ভুটানে উন্নয়ন বলতে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বোঝায় না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে জনগণ ও পরিবেশের কল্যাণ এবং উন্নয়নও বোঝায়।

দেশটির জনগণ আইন মেনে চলে। তারা জনসমক্ষে ধূমপান করে না। গাড়িতে হর্ন বাজায় না। রাস্তা পারাপারের সময় গাড়ি থেমে যায়। তারা তাদের জাতীয় পোশাক পরে। বিদেশি পর্যটকদের সম্মান করে। পশুপাখির প্রতিও তারা সদয়। বিত্তকে দূরে ঠেলে দিয়ে তারা চিত্তের সুখ চেয়েছে। দেশটির জনগণ এখনও রাজাকে ভালোবাসে। রাজতন্ত্র তাদের অনেকেরই পছন্দ। তাদের রাজা সতর্ক করেছেন, টিভি আর ইন্টারনেটের প্রভাবে যেন ভুটানের সংস্কৃতি হারিয়ে না যায়। দেশটিতে সব কাজের মধ্যেই পরিমিতবোধ লক্ষণীয়।

ভুটানে এখন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জিগমে ওয়াই থিনলে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ডা. লোটে শেরিং। ভুটানের পার্লামেন্ট ৪৭ সদস্যের। বর্তমান সংসদে ৭ জন নারী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদের অধিকাংশ সদস্যই উচ্চশিক্ষিত। সংসদে উচ্চকক্ষ ও নিুকক্ষ রয়েছে। তবে সুপ্রিম পাওয়ার এখনও রাজার হাতে এবং রাজপরিবার এখনও উচ্চ আসনে আসীন। ভুটানের জনগণ রাজনৈতিকভাবে এখনও ততটা সচেতন নয়। তরুণ প্রজন্মের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ভুটানের সামনে নানা বাধা-বিপত্তি আছে। নব্য গণতন্ত্রের অনেক শর্ত পূরণ করতে পারেনি। ভুটান সম্পর্কে এখনও অনেক তথ্যই অজানা রয়ে গেছে আমাদের।

ভুটানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ১৯৪৯ সাল থেকে। সে সময় দুই দেশ মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০০৭ সালে চুক্তিটি নবায়ন করা হয়। এ চুক্তির অধীনে ভুটানের প্রতিরক্ষার ভার ভারতের হাতে। কিন্তু ভুটানের প্রতি চীন আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ভুটানে চীনা পর্যটক বাড়ছে। ভুটানও ভারতের পাশাপাশি চীনের দিকে হাত বাড়াতে চায়। ভারতের ছায়ামুক্ত হতে চায় ভুটান। দেশটিতে ভারতবিরোধী অবস্থান দৃশ্যমান হচ্ছে। এ থেকে বোঝা যায়, ভূ-রাজনীতিতে ভুটানের গুরুত্ব বাড়ছে। ভুটান ভারত ও চীন দু’দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ভুটানে যেতে বাংলাদেশি নাগরিকদের আগাম ভিসা লাগে না। ভুটানে গিয়ে ভিসা নিতে হয়। আমাদের দেশের অনেকেই ভুটান ভ্রমণে যায়। এটি এখন আর আমাদের কাছে রহস্যঘেরা কোনো দেশ নয়। ভুটান আগামী দিনে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানি করবে। সে প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। ভুটানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং বাংলাদেশের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। পরে জেনারেল সার্জারি বিষয়ে এফসিপিএস করেন। ভুটানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সম্পর্কও গড়ে উঠছে।

ভুটানের রাজা একই সঙ্গে রাজপরিষদ মনে করেন, রাজা বেশি কথা বললে তার ব্যক্তিত্ব বা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। তাই ভুটানের রাজা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন; কিন্তু কোনো ভাষণ বা বাণী প্রদান করেন না। তিনি যখন মুখ খোলেন তখন সেটা একটা আলোচিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয় সেই দেশে। জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেই রাজা কথা বলেন। ভুটানের রাজপরিষদের ভাষণে দক্ষতার নিদর্শন পাওয়া যায় ইউটিউবে আপলোড করা তাদের ভাষণ বা বক্তব্যে।

রাজতন্ত্রে সাধারণত রাজার মৃত্যু হলে বা রাজা অক্ষম হলে রাজার ছেলে রাজা হন। কিন্তু দায়িত্ব পালন করার আরও সময় থাকা সত্ত্বেও ভুটানের রাজা তার উত্তরাধিকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন। তিনি আগে থেকে সরে গেছেন নতুন প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা দিয়ে। ২০০৬ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন নিজপুত্র বর্তমান রাজা জিগমে কেসার নমগেল ওয়াং চুকের কাছে। ভুটানের রাজা এ বিষয়েও অনন্য।

তরুণ বয়সে রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াংচুক সেদেশের প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগের একজন খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি ছিলেন গোলরক্ষক। একদিন রাজা খেয়াল করলেন তার দল গোল দেয়; কিন্তু কখনও গোল খায় না। রাজা গোলরক্ষক, তাই কেউ গোল দেয় না রাজাকে সম্মান করে। গোলপোস্টের সামনে বল এলে বল অন্যদিকে পাঠিয়ে দেয়। সেদিন থেকেই তিনি ফুটবল খেলা ছেড়ে দিয়েছিলেন।

অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান রাজা জিগমে কেসার নমগেল ওয়াং চুক পিতার মতো বহুবিবাহের পথে যাবেন না। তিনি ভারত ও ব্রিটেন থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন বিয়ের আগে। ২০০৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিষয়ে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। সাধারণ ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন ভুটানে রাজনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজপরিবারের প্রথা ভাঙতে পিছপা হবেন না। রাজসিক বিয়ে হলেও বিদেশি কোনো সরকারপ্রধান বা বাইরের অন্য কোনো রাজপরিবারের সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। রাজার বিয়ে ছিল একেবারেই সাধারণ পারিবারিক অনুষ্ঠান। গণতন্ত্রায়ণের পথে তিনি পিতার চেয়ে আরও এগিয়ে থাকবেন, এমনটা মনে করছেন অনেকেই।

ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য দেশগুলোর চেয়ে ভুটান আলাদা। দুর্নীতি, অপশাসন, নোংরা রাজনীতি, জাতিগত হানাহানি, দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, ব্যাংক লুট এগুলো ভুটানকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমরা কথায় কথায় এত দিন বলে এসেছি গণতান্ত্রিক দেশ ভারত থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। এখন বলার সময় এসেছে ভুটান থেকেও আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। তারা একের পর এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছে। ভুটান আমাদের সামনে সত্যিই এক অনুসরণীয় মডেল। সেখানে সবকিছুই চলে নিয়মশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। তাদের দেশপ্রেমও আমাদের মুগ্ধ করে।

ভুটানের রাজপ্রাসাদের সামনে দিয়ে প্রজারা ছাতা মাথায় দিয়ে কখনও যেতে পারে না। ছাতা মাথায় দিয়ে গেলে রাজাকে অসম্মান করা হয়- এমনটাই তারা মনে করে। এ ধরনের নানা প্রথা বা রীতিনীতি প্রচলিত রয়েছে এখনও সে দেশে। এত কিছুর পরও আমার মনে হয়, ভুটান অনেকটা গণতান্ত্রিক। ভুটান গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।

মাসুদ কামাল হিন্দোল : সাংবাদিক ও রম্যলেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×