চাই জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়

  কামরুল ইসলাম চৌধুরী ০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চাই জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়

জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুতলয়ে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কার চেয়েও জোর গতিতে। বাংলাদেশসহ হতদরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি মোকাবেলা করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হলেও এসব দেশেই তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে বেশি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা, বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি আঘাত হানছে আমাদের এসব দেশে।

জাতিসংঘ জলবায়ু সনদের অধীনে ২০১৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় প্যারিস চুক্তি গৃহীত হয়। অনুমোদিত হওয়ার পর এর বাস্তবায়ন রূপরেখা বা নীতিমালা কী হবে, তা নির্ধারণ নিয়ে পরবর্তী কয়েক বছর ধনী, উন্নয়নশীল ও অতি বিপদাপন্ন দেশগুলোর মধ্যে বিরামহীন দেনদরবার শুরু হয়।

অতি সম্প্রতি শেষ হয়েছে কপ-২৪ বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন। ১-১৬ ডিসেম্বর পোলান্ডে বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে ১৯৬টি দেশের অংশগ্রহণে অবশেষে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে প্যারিস রুলবুক নামে একটি দলিল প্রণীত হয়।

প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন এ সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য হলেও চুক্তিতে গৃহীত অন্যসব শর্তের বাস্তবায়ন, বিশেষ করে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি কাক্সিক্ষত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, পাশাপাশি জলবায়ু পরবির্তনের নেতিবাচক প্রভাবগুলো মোকাবেলা করে অতি বিপদাপন্ন দেশগুলোর টিকে থাকার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আর্থিক, কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

এর বাস্তবায়নে রূপরেখা প্রণয়ন হবে, এ প্রত্যাশা নিয়ে সম্মেলনে ধনী, স্বল্পোন্নত এবং অতি বিপদাপন্ন সব দেশ অংশগ্রহণ করে।

সম্মেলনে ধনী এবং আর্থ-রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর দেশগুলো, বিশেষ করে যাদের আমরা ধনী দেশ বলছি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী, তারা আমাদের মতো অতি বিপদাপন্ন দেশগুলোর স্বার্থ অবজ্ঞা করছে।

অন্যায্যভাবে আমাদের দাবিগুলোকে পাশ কাটিয়ে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। সম্মেলনের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র, বিশেষ করে সৌদি আরব, রাশিয়া, মিসর ও কুয়েত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাদা আলাদা ক্লোজডোর মিটিং করে।

দীর্ঘদিনের জলবায়ু নেগোশিয়েটর হিসেবে সম্মেলনের নির্ধারিত সময়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে দেখিনি। বরং দেখেছি বর্ধিত সময় নেয়া হয়, যখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকাংশ প্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে ধনী দেশগুলো তাদের সুবিধামতো প্রস্তাব পাস করাতে পারে।

প্যারিস রুলবুক প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এই একই কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যায়।

কপ-২৪ বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনের একমাত্র মাইলফলক হচ্ছে কাটোভিচ ক্লাইমেট প্যাকেজ নামে প্যারিস রুলবুকের দলিল প্রণয়ন। বিরামহীন দেনদরবারের নির্ধারিত সময়ের দেড় দিন পর প্যারিস রুলবুক গৃহীত হয়, যখন বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বহু প্রতিনিধি দেশে ফিরে যান।

এতে রয়েছে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের অনেক বিষয় ও শর্ত। যেমন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হ্রাসে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা (প্যারিস চুক্তির শর্ত/ধারা-০৪), অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়ন (প্যারিস চুক্তির শর্ত/ধারা-০৭), অর্থায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন (প্যারিস চুক্তির শর্ত/ধারা-০৯)।

আরও রয়েছে প্রযুক্তি হস্তান্তর (প্যারিস চুক্তির শর্ত/ধারা-১০) হ্রাসে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন (প্যারিস চুক্তির শর্ত/ধারা-১৪) এবং স্বচ্ছতাবিষয়ক কাঠামো (প্যারিস চুক্তির শর্ত/ধারা-১৩)। এসব বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে গৃহীত ১৫৬ পৃষ্ঠার বাস্তবায়ন নীতিমালাটি হল প্যারি রুলবুক।

এই প্যাকেজ ২০২০ সাল থেকে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কপ-২৪ জলবায়ু সম্মেলনের সভাপতি মাইকেল কুরতিকা।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গৃহীত এই প্যাকেজ প্যারিস চুক্তির উপরিউক্ত ধারাগুলো বাস্তবায়নের কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতামূলক নীতিমালা প্রণয়নে সফল হয়নি।

এ কারণে আমি মনে করি, ২০২০ সাল-পরবর্তী সময়ে চুক্তির বাস্তবায়ন ও ফলাফল অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্যারিস চুক্তিতে অনেকগুলো নিচ থেকে নেয়া যেমন- স্বতঃপ্রণোদিত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস; লক্ষ্যমাত্রার ওপর থেকে নেয়া যেমন- ধনী দেশগুলো কর্তৃক অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত সহযোগিতা, বৈশ্বিক মূল্যায়ন ইতাদি বিষয় ছিল। কিন্তু এই প্যাকেজ প্যারিস চুক্তির বেশির ভাগ ওপর থেকে নেয়া বৈশ্বিক বিষয়গুলোকে অগ্রাহ্য করেছে বা তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

এ কারণে প্যারিস রুলবুক আসলে বাধ্যবাধকতামূলক পরিপালনীয় নীতিমালার পরিবর্তে বরং একটি স্বনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রশ্ন হল, এখন বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখা কি সম্ভব? প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের এই প্যাকেজ আসলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি কাক্সিক্ষত মাত্রায় হ্রাস করতে কতটা পারবে?

বাংলাদেশসহ অতি বিপদাপন্ন দেশগুলোর স্বার্থ কি রক্ষা করতে পারবে? জলবায়ু সম্মেলনের কয়েকদিন আগে আইপিসিসি কর্তৃক বৈশ্বিক তাপমাত্রা সম্পর্কিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, অক্টোবর ২০১৮’ প্রকাশ করেছে।

সেখানে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হলে এক দশকের মধ্যেই ব্যাপক আকারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করতে হবে।

অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৩০-৪০ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করতে হবে। কিন্তু প্যারিস রুলবুকে এ সংক্রান্ত কোনো ধরনের জরুরি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের কার্যক্রম বাস্তবায়নের ওপর কার্যকর রূপরেখার প্রস্তাব করতে ব্যর্থ হয়েছে।

কারণ হিসেবে বলা যায়, সম্মেলনের শুরুতেই সৌদি আরব আইপিসিসির প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনকে অবজ্ঞা করতে থাকে। জরুরি কার্যক্রম গ্রহণের বৈশ্বিক দাবির বিরোধিতা করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টায় সফল হয়।

প্যারিস চুক্তির ধারা-১৪ অনুসারে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্যে ২০২০ সাল-পরবর্তী জাতীয়ভাবে নির্ধারিত কার্বন উদ্গিরণ হ্রাসের লক্ষ্যগুলো (এনডিসি) ২০১৮ সালে পর্যালোচনা করে নতুন এনডিসিগুলো নির্ধারণ করার কথা।

এ উদ্দেশ্যে কপ-২৩-এ তালানোয়া সংলাপের সূচনা করা হয়। ২০১৮ সালে এর ওপর ২১টি সংলাপ অনুষ্ঠিত হলেও ধনী ও দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষভাবে চীন, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি।

কারণ কোনো দেশই কার্বন উদ্গিরণ হ্রাসের ক্ষেত্রে একটি বাধ্যবাধকতামূলক ও পরিমাপযোগ্য এনডিসি বাস্তবায়নের আওতায় আসতে চায়নি। বরং এনডিসি নির্ধারণে তথাকথিত নমনীয়তার নীতির পক্ষে জোরাল অবস্থান নেয়।

নিজেরা না করে তা বাজার ব্যবস্থার মধ্যে বাস্তবায়নের খোলা নীতি গ্রহণের দাবি জানাতে থাকে। বাস্তবে সেটাই হতে যাচ্ছে বলে আমার আশঙ্কা।

ফলে সব দেশ, বিশেষ করে ধনী দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের ক্ষেত্রে যে যার মতো করে স্বতঃপ্রণোদিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে পারবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, জলবায়ু অর্থায়নে ধনী দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে। প্যারিস চুক্তির ধারা-০৯-এ পরিষ্কার বলা হয়েছে, ধনী দেশগুলো স্বল্পোন্নত ও বিপদাপন্ন দেশগুলোর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, বিশেষ করে প্রশমন ও অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত করবে।

২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদান করবে। প্যারিস রুলবুক প্রণয়নের প্রস্তুতিমূলক যে দেনদরবার তিন বছর ধরে চলেছে, সেখানেও এ বিষয়ে বেশ অগ্রগতি অর্জিত হয়।

কিন্তু কপ-২৪ দরকষাকষিতে যে রুলবুক প্রণীত হয়েছে, সেখানে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে কোনো কথাই রাখা হয়নি।

অর্থাৎ বলা যায়, ধনী দেশগুলো বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়াতে সক্ষম হয়েছে। এখানে ধনী দেশগুলো তাদের ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে যেতে যে অজুহাত সামনে এনেছে তা হল, তারা কোনো অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত প্যারিস চুক্তির অন্য বিষয়গুলোয় (স্বচ্ছতাবিষয়ক কাঠামো, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের ওপর জাতীয়ভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা- এনডিসি) উন্নয়নশীল দেশগুলো কোনো সিদ্ধান্তে না আসে।

জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত এবং অতি বিপদাপন্ন দেশগুলোর মূল দাবি ছিল, ধনী দেশগুলো তাদের সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিপদাপন্ন দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করবে। তা হবে শুধুই অনুদান, যা জাতিসংঘ জলবায়ু সনদে জোরালোভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

কিন্তু কপ-২৪ দেনদরবারে আমরা দেখতে পাচ্ছি ধনী দেশগুলো জলবায়ু অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় সব ধরনের আর্থিক কৌশলগুলো (ঋণ, ইক্যুইটি, আর্থিক গ্যারান্টি, কনসেশনাল ঋণ, অনুদান ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে।

ফলে ভবিষ্যতে স্বল্পোন্নত এবং অতি বিপদাপন্ন দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঋণমুক্ত অর্থায়নের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ আমরা এরই মধ্যে দেখতে পেয়েছি, কপ-২৪ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ২০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে।

অর্থাৎ ধনী দেশগুলো বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ ও ব্যবসা দুটোই করবে। বিভিন্ন ধরনের অর্থায়ন কৌশল প্রস্তাবিত প্যারিস রুলবুকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা আসলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার একচ্ছত্র ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দেবে ধনী দেশগুলোকে।

ফলে বাংলাদেশসহ জলবায়ু বিপদাপন্ন দেশগুলো, যারা ২০২০ সাল-পরবর্তী সময়ের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাইরে নতুন ও অতিরিক্ত অর্থায়নের স্বপ্ন দেখেছিল, তা আসলে কল্পনাতেই থেকে যাবে।

কপ-২১-এর সিদ্ধান্ত অনুসারে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতির ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশগুলো এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার কৌশল নিরূপণের জন্য ওয়ারশো ইন্টারন্যাশনাল লস অ্যান্ড ড্যামেজ মেকানিজমের অধীনে গঠিত টাস্কফোর্স অন ডিসপেইজম্যান্টের কিছু সুপারিশ প্রণয়ন করে, যা কপ-২৪ জলবায়ু সম্মেলনে গৃহীত হয়; কিন্তু হতাশাজনক বিষয় হল, এ সুপারিশমালায় যেসব সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে সেগুলো মূলত দেশীয় প্রক্রিয়া।

অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য করণীয়গুলো কী, তা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় ধনী ও বাস্তুচ্যুতির জন্য দায়ী দেশগুলোর করণীয়, বিশেষ করে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো কী হতে পারে, তার ওপর কোনো সুপারিশমালা ছাড়াই টাস্কফোর্স তার সুপারিশ পেশ করেছে, যা হতাশাজনক।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাবি ছিল টাস্কফোর্সের পেশকৃত সুপারিশগুলো প্যারিস ওয়ার্ক প্রোগ্রামের মূল দেনদরবারে এনডিসি নির্ধারণ, অভিযোজন, অর্থায়ন ও স্বচ্ছতা কাঠামো ইত্যাদিতে সমন্বিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এসব দরকষাকষিতে বাস্তুচ্যুতির বিষয়টি অন্তত ক্রসকাটিং ইস্যু হিসেবে আলোচনা করা যায়।

এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকে। ধনী দেশগুলোর অব্যাহত বিরোধিতার কারণে সেটি আর সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে এ আলোচনায় কতটা ফল অর্জিত হবে, তা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ।

কপ-২৪ দেনদরবারে ক্ষয়ক্ষতি বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। এমনকি এটি কোনো আলোচ্যসূচিতেও রাখা হয়নি। যেহেতু ক্ষয়ক্ষতি আগামী জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-২৫) আলোচ্য বিষয়, সে কারণে এটা প্যারিস রুলবুকে, এমনকি অর্থায়নের ক্ষেত্রে, অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে বাদ দেয়া হয়েছে।

যদিও প্যারিস চুক্তির ধারা-০৭ (অভিযোজন)-এর আওতায় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আগামী দিনে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে তা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কারণ এখানে অতি বিপদাপন্ন দেশগুলোর দাবি হচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। বিষয়টি বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ প্রক্রিয়া, অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি এবং স্বচ্ছতা কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত ও সমন্বিত করে দেনদরবার চালাতে হবে।

ধনী দেশগুলো এ প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি, বরং বিরোধিতা করে চলেছে সেই প্যারিস চুক্তির সময় থেকেই।

আমার আন্তরিক প্রত্যাশা, নতুন এলডিসি চেয়ার ভুটানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও অন্যান্য এলডিসি আগামী ২ বছরে ৪৮টি দেশের এই গ্রুপটিকে প্রস্তুত করতে কোনো সুযোগ ছাড়বে না। সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে তাদের হোমওয়ার্ক করতে হবে।

প্রতিকূল জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ একটি গ্রাউন্ড জিরো দেশ হিসেবে নিজের কোনো দোষ ছাড়াই জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার। এ বিষয়টি সম্পর্কে তার বিবরণে পরিবর্তন আনতে হবে।

২০০৮ সালে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান (বিসিসিএসএএপি) প্রণয়ন করে। ২০০৯ সালে তা সংশোধন করা হয়। এমন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রথম দেশ বাংলাদেশ।

এটি এখন অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে আপডেট করা উচিত যাতে আর কোনো বিলম্ব ছাড়াই তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রণীত রোডম্যাপ অনুসরণ করে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) অবিলম্বে প্রণয়ন করা উচিত।

এক্ষেত্রেও মানুষের অংশগ্রহণ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা উচিত। বাংলাদেশ নিজস্ব বাজেটে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল এবং বিশেষ করে যুক্তরাজ্য এবং কয়েকটি দেশসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় জলবায়ু রেসিলিয়েন্ট ফান্ড তৈরি করেছে।

এখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপ্টেশন ফান্ড, এলডিসি ফান্ড এবং অন্যান্য বৈশ্বিক তহবিল থেকে অর্থায়ন পাওয়ার জন্য অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচিগুলো প্রণয়ন ও পরিচালনার জন্য দক্ষতা ও সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি প্রয়োজন।

প্রত্যাশা করছি, সরকার এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সুসম্পন্ন করার জন্য পৃথক জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গঠন করবে। নইলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ব্যাহত হবে। জ্ঞানভিত্তিক বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন দরকষাকষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কামরুল ইসলাম চৌধুরী : জলবায়ু, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, জাতিসংঘের কিয়োটো প্রোটোকলের যুগ্ম বাস্তবায়ন সুপারভাইজরি কমিটির সাবেক চেয়ার এবং জাতিসংঘের অ্যাডাপ্টেশন কমিটির সাবেক সদস্য

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×