বই উৎসব বনাম নোট-গাইড ও কোচিংয়ের ব্যাপকতা

  মো. সিদ্দিকুর রহমান ০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বই উৎসব বনাম নোট-গাইড ও কোচিংয়ের ব্যাপকতা

বই উৎসব প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মাঝে এনে দেয় অপরিসীম আনন্দ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আগে বছরের শুরুতে বিনামূল্যে নতুন বই পাওয়ার সুযোগ ছিল না।

এ প্রশংসনীয় উদ্যোগ দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। তবে পরিতাপের বিষয় হল, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরিই নোট-গাইড ও কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পরিকল্পিতভাবেই শিক্ষক-শিক্ষার্থী তথা শিক্ষাব্যবস্থাকে এই ফাঁদে ফেলা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে পঞ্চাশের দশকের কিছু স্মৃতি আজ মনের মাঝে উঁকি দেয়।

সেই সঙ্গে মনে পড়ে কবিতার সেই চরণগুলো- ‘আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা; তোমাদের যুগে তোমরা এখন লেখাপড়া করো মেলা।’

চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার বদরপুর গ্রামের ডাকাতিয়া নদীর পারের ছোট্ট শিশুটি তখন শিক্ষার সুযোগ পেতে দিশেহারা। কমপক্ষে ১০ মাইল পথ হেঁটে শিক্ষার অন্বেষণে যেত হাজীগঞ্জ উপজেলার বলাখাল উচ্চবিদ্যালয়ে।

প্রতিবছর জানুয়ারি এলে পুরনো পাঠ্যবই কেনার জন্য আসত ১৫ মাইল হেঁটে হাজীগঞ্জ বাজারে। এত দূর হেঁটে স্কুলে যেতে কিংবা বই কিনতে যেতে কোনো ক্লান্তি ছিল না। বরং অপরিসীম আনন্দ ছিল।

নতুন বইয়ের গন্ধ জোটেনি পাড়াগাঁয়ের অনেক শিক্ষার্থীর ভাগ্যে। অথচ আজকাল গ্রামে গ্রামে স্কুল। ১ জানুয়ারি সব শিশু পায় বিনামূল্যে নতুন পাঠ্যবই, যা বর্তমান সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

পাকিস্তান শাসনামলে পাড়াগাঁয়ে নোট বইয়ের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকে এসএসসিতে টেস্টপেপার ও পরবর্তী সময়ে মেইড ইজি নামক নোটের পরপর দ্রুত প্রচলন হয় নোট-গাইড। বর্তমানে চলছে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত নোট-গাইডের রমরমা বাণিজ্য।

নোট, গাইড ও কোচিং ব্যবসার ব্যাপক সফলতার প্রধান কারণ শিক্ষাব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনা। শিশুশিক্ষা চলছে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে।

বিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো, শিক্ষকের মর্যাদা, বেতন, শিক্ষক সংকট, শিক্ষকের আন্তরিকতা, অতিরিক্ত সৃজনশীলতার নামে পাঠ্যবইকে অকার্যকর করা, নিচের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের প্রতি পর্যাপ্ত যত্নের অভাব, প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষক দ্বারা যত্রতত্র পাঠদান, শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বাজেটে অপরিসীম কৃপণতা ইত্যাদি নানা কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজ কাক্সিক্ষত মেধাবিকাশ ঘটাতে পারছে না।

বিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো : স্বাধীনতার দীর্ঘসময় অতিবাহিত হলেও আজও খোলা আকাশের নিচে, পরিত্যক্ত ভবনে চলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো; যেখানে রয়েছে আসবাবপত্র, সুপেয় পানি, স্যানিটারি ল্যাট্রিন, খেলাধুলা ও বিনোদনের তীব্র সংকট।

আজও প্রভাবশালীদের দখলমুক্ত হয়নি কিছু বিদ্যালয়। শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পরিপূর্ণ শিক্ষার অভাবে বিদ্যালয়ের পরিবর্তে নোট, গাইড, গৃহশিক্ষক, কোচিং সেন্টারে আশ্রয় নিচ্ছে।

শিক্ষকের মর্যাদা : গ্রামে, গঞ্জে, শহরে জনগণের কাছে শিক্ষকের সম্মান থাকলেও তা ভূলুণ্ঠিত হতে চলছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।

বিশ্বের প্রায় সব দেশের মতো এদেশের শিক্ষকরা প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার মর্যাদা পেয়ে শিক্ষকতা পেশায় আন্তরিকতার সঙ্গে মনোনিবেশ করলে শিক্ষার্থীরা নোট, গাইড ও কোচিং সেন্টারের অভিশাপ থেকে অনেকটা মুক্ত হবে।

শিক্ষকদের বেতন : ইংরেজ আমলে সমাজের ধনী ও শিক্ষিত ব্যক্তিরা শিক্ষকতা পেশায় আসত। তাদের অর্থের পিছুটান ছিল না। শিক্ষকতাকে সমাজসেবা হিসেবে গণ্য করত।

আজকাল সরকার তথা সংশ্লিষ্টদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মেধাবী বা ধনিক শ্রেণীর লোকরা শিক্ষকতা পেশায় আসে না। মানুষের মনে ভাবনা জন্মেছে- যার নেই কোনো গতি, সেই করে পণ্ডিতি।

আজও শিক্ষকদের পরিবার-পরিজনের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তারা শিক্ষকতা পেশায় মনোযোগী হতে পারছেন না।

কেউ কেউ কোচিং, টিউশন বা খণ্ডকালীন অন্য পেশায় নিয়োজিত হন। অথচ এসব কাজকে সংশ্লিষ্টরা অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।

শিক্ষকদের বৈষম্যের যন্ত্রণায় রেখে জাতিকে সুশিক্ষিত করার চিন্তা স্বপ্ন ব্যতিরেকে কিছুই নয়। স্বপ্নে বসবাস করে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হচ্ছে নোট, গাইড ও কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হতে।

শিক্ষক সংকট : দেশ সংকটের পাহাড় অতিক্রম করে আজ বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে চলেছে। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষক সংকট লেগেই আছে। এ যেন জন্ম থেকে পাওয়া, অদৃষ্টের লিখন।

এদিকে সদয় দৃষ্টি দেয়ার কেউ নেই। শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থী বা অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে পাসের জন্য নোট, গাইড, গৃহশিক্ষক বা কোচিং সেন্টারের সন্ধান করেন।

শিক্ষকদের আন্তরিকতা : প্রাথমিক শিক্ষকরা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও শিক্ষাদানবহির্ভূত কাজের চাপে তারা থাকে জর্জরিত। এসব কাজের চাপে তারা হারিয়ে ফেলে শিশুদের প্রতি আন্তরিকতা।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী শিক্ষকরা সরকারের থার্ড ক্লাস কর্মচারী। তৃণমূল পর্যায়ে এত থার্ড ক্লাস কর্মচারী আর কোথাও নেই বিধায় শিক্ষকদের ছাড়া সরকারের কাজ করানোর আর কে আছে।

পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষার কাজে শিক্ষকদের সারা বছর অফিসমুখী রাখা হয়। পাঠদানে যতই ক্ষতি হোক না কেন, সমাপনী পরীক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ক্ষতি হচ্ছে।

সৃজনশীলতার নামে বাড়াবাড়ি : ৫ম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষায় পাঠ্যবইবহির্ভূত প্রশ্ন থাকবে। তাই সংশ্লিষ্টরা ৩য় শ্রেণী থেকে পাঠ্যবইবহির্ভূত প্রশ্নের অবতারণা করে থাকে।

শৈশবেই পাঠ্যবইবহির্ভূত প্রশ্নের চর্চা করাতে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এক বা একাধিক নোট ও গাইড বইয়ের আশ্রয় নেয়। বিগত বছরগুলোয় সমাপনী পরীক্ষায় বাংলা রচনা ৪টির মধ্যে কমপক্ষে ৩টি পাঠ্যবইকেন্দ্রিক দেয়া ছিল।

অথচ ২০১৫-২০১৮ সালে সব কয়টি রচনা পাঠ্যবইয়ের বাইরে থেকে এসেছে। এক্ষেত্রে নোট-গাইড ছাড়া অধিকতর সহযোগিতার জন্য শিক্ষার্থীদের আর কোনো উপায় নেই।

নিচের ক্লাসে পর্যাপ্ত যত্নের অভাব : শিক্ষক, অভিভাবক, কর্মকর্তা, মন্ত্রী সবাই বাহবা বা তৃপ্তি অর্জন করেন সমাপনী পরীক্ষার ফল নিয়ে। ৫ম শ্রেণীর ক্লাস নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করতে দেখেছি। নিচের ক্লাসে পড়ানো নিয়ে শিক্ষকদের অনেকের মধ্যে কোনো ভাবনা থাকে না।

এছাড়া সমাপনীর বিরাট কর্মযজ্ঞ পালনে অনেক শিক্ষককে স্কুলের পরিবর্তে সারা বছর অফিসে কাজ করতে হয়।

এছাড়া বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের ব্যাপকতা ও সরকারি দফতরের হুকুম তামিল ও তথ্য দাখিলের কারণে শিক্ষকদের নিচের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের প্রতি যত্ন নেয়া সম্ভব হয় না।

অনেকটা গোড়ায় না দিয়ে আগায় পানি দেয়ার মতো। ফলে অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে কোচিং সেন্টারমুখী হন।

প্রশিক্ষণবিহীন পাঠদান : দেশে যত্রতত্র গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন বা উচ্চবিদ্যালয় সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের বর্তমান যোগ্যতাভিত্তিক পাঠদানের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। শিশুশিক্ষা বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ নেই।

অনুরূপভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেসব স্কুল ৮ম শ্রেণীতে উন্নীত করা হয়েছে, সেসব স্কুলের শিক্ষকদের সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পাঠদান বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি।

তারা বাধ্য হয়ে নিজের জানার জন্য নোট-গাইড অনুসন্ধান করে এবং শিক্ষার্থীদের নোট-গাইড কিনতে বাধ্য করে।

শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেটের কৃপণতা : আমরা অনেকে সার্বিক দিক বিবেচনা না করে নিজের ভাবনাগুলো সবার ওপর চাপিয়ে দেই। আমাদের প্রাজ্ঞ অর্থমন্ত্রী পরিবারিক সচ্ছলতার কারণে দেশ-বিদেশে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেট কৃপণতা দেখে মনে হয়, শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে এদেশের মানুষের বোধকরি তার মতোই সুযোগ রয়েছে।

দেশের শিক্ষাবিদ, এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীও অর্থমন্ত্রীর এ ভাবনাকে টলাতে পারেননি; ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। তাই অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা ছুটছে নোট, গাইড ও কোচিং সেন্টারের দিকে।

শিক্ষার প্রসারে বাস্তবমুখী গবেষণা : স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবরণের পর তৃণমূলের মানুষের সন্তানদের নিয়ে তেমন কোনো ইতিবাচক ভাবনা দেখা যায়নি।

সমস্যাকেন্দ্রিক কোনো গবেষণা দৃশ্যমান নয়; ফলে সাধারণ মানুষের সন্তানদের মেধাবিকাশ অনেকটা পিছিয়ে পড়ছে।

নোট, গাইড ও কোচিং সেন্টার সমাদৃত হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠুক জ্ঞান অর্জন ও মেধাবিকাশের মাধ্যমে, এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ ও প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×