স্মরণ

স্যামসন এইচ চৌধুরী স্মৃতিতে অম্লান

  আখতারুজ্জামান আখতার ০৫ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্কয়ার গ্রুপের কর্ণধার স্যামসন এইচ চৌধুরী
স্কয়ার গ্রুপের কর্ণধার স্যামসন এইচ চৌধুরী

বলা হয়ে থাকে, কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। আজ তেমনই এক কীর্তিমান, পাবনার তথা দেশের কৃতীসন্তান, স্কয়ার গ্রুপের কর্ণধার স্যামসন এইচ চৌধুরীর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এই দিনে ৮৬ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

তার না-ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পরও পাবনাবাসী তাকে ভুলতে পারেননি। তার আদর্শ, নীতিবোধ, ত্যাগ, মহানুভবতা এবং সেবামূলক নানামুখী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সর্বস্তরের মানুষ তাকে উপলব্ধি করেন, তাকে স্মরণ করেন।

স্যামসন এইচ চৌধুরী ১৯২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার কাশীয়ানী থানার আড়–য়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৫২ সালে পাবনা জেলার আতাইকুলায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তিনি। তার পিতা ইয়াকুব হোসেন ছিলেন একটি ফার্মেসির মেডিকেল অফিসার।

স্যামসন চৌধুরী ১৯৫৮ সালে তিন বন্ধু মিলে আতাইকুলায় গড়ে তোলেন স্কয়ার ফার্মাসিটিউক্যালস। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্য আনুমানিক ৩৩ হাজার, যাদের তিনি নিজ সন্তানের মতো মনে করতেন এবং তিনি ছিলেন তাদের অভিভাবক।

স্যামসন এইচ চৌধুরী একজন আদর্শ দেশপ্রেমিক, সৎ ও বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তার অতি ঘনিষ্ঠজন লেখক ড. ডেনিস দিলীপ দত্ত বলেন, ৪০ বছর আগে আমি যখন তার কাছ থেকে চার্চের সেবা কাজের দায়িত্বগুলো ক্রমে ক্রমে গ্রহণ করছিলাম, তখন তিনি জন এফ কেনেডির একটি ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি দিয়ে আমাকে, আমাদের অনুপ্রাণিত করেছেন- সেবাদানের মাধ্যমে দেশ ও দশের কল্যাণমূলক কার্যসূচি গ্রহণ করতে।

স্যামসন এইচ চৌধুরী ছিলেন প্রচারবিমুখ। অথচ তিনি ছিলেন বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এক কিংবদন্তি পুরুষ। স্যামসন এইচ চৌধুরীর সংস্পর্শে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তাকে আমরা কাকা বাবু বলে ডাকতাম। তাকে নিয়ে কমবেশি অনেক স্মৃতি আজও মনে পড়ে।

একবার আতাইকুলায় বড়দিনের অনুষ্ঠান শেষে এক ফটোসেশনে কাকা বাবুর নিজের ক্যামেরায় তার সঙ্গে আমাদের একটি গ্রুপ ছবি তোলা হয়। ঢাকায় গিয়ে তিনি প্রত্যেকের (যারা ছবিতে ছিলাম) নামে সেই ছবি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই সামান্য সৌজন্যবোধটুকু আমরা অনেক সময়ই দেখাতে পারি না।

স্যামসন এইচ চৌধুরী দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য পঞ্চাশের দশকে ভেবেছেন সমবায় নিয়ে। সে সময় তার প্রিয় সহকর্মী ছিলেন আমেরিকান ম্যারি মিলনার এবং জিম ওয়েকার। তিনি ভেবেছেন কৃষি বিপ্লব নিয়েও। ইপিসিসির সাধারণ সম্পাদক থাকাবস্থায় ডেভিড স্টকলিকে নিয়ে এগিয়ে গেছেন ইরি চাষ প্রকল্প, উন্নত ফেজার গরু এবং রোড আইল্যান্ড মুরগি প্রচলন করে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে রিলিফ ক্যাম্পে খাদ্য সরবরাহ করেছেন। বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ গঠনে সিসিডিবি গঠন, আরিচা-ভোলা-পটুয়াখালী-বরিশালের মৎস্যজীবীদের জাল, নৌকা, কোল্ডস্টোর প্রদান, মহেশখালীতে সাগর মৎস্যজীবী, নরসিংদীতে তাঁতিদের পুনর্বাসন, রাজশাহীতে ১২ মিলিয়ন ডলারের কৃষি প্রকল্প, বাংলাদেশ সরকারকে দূরপাল্লার ওয়াকিটকি ও বার্জ প্রদান এবং বরিশাল ও গোপালগঞ্জে ২.৩ মিলিয়ন ডলারের ইপি প্রকল্প প্রণয়ন- এসব অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

এছাড়া কৈননিয়া এনজিও স্থাপন করেন তিনি। বর্তমানে তার মেজো ছেলে তপন চৌধুরী এর চেয়ারম্যান। তিনি তার কর্মচারীদেরও বঞ্চিত করেননি। জীবিত থাকতে ৩৩ হাজার কর্মচারীর জন্য প্রতিদিন দুপুরের খাবার, ভাতা, আকর্ষণীয় বোনাস চালু করে দিয়ে গেছেন, যা এখনও বহাল আছে। তিনি তাদের সমস্যার কথা শুনতেন, চাহিদাগুলো পূরণ করতেন। তাই তারা কখনও ধর্মঘট করেননি।

তিনি ঋণখেলাপি ছিলেন না। পুঁজিবাজারে কোনো নয়ছয় করেননি। তার প্রতিষ্ঠানে তিনি ছিলেন অজাতশত্রু ও দানবীর। অসংখ্য ছাত্র, দরিদ্র, অনাথ তার সহানুভূতি পেয়ে নতুন জীবন পেয়েছে। পাবনায় অনিতা-স্যামসন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দরিদ্র মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদানের স্থায়ী ব্যবস্থা করে গেছেন তিনি।

সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাবনার ঐতিহাসিক অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি সমৃদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। অসাধারণ সৌজন্যবোধ এবং অমায়িক ব্যবহারের জন্য তিনি ছিলেন সব মানুষের অতি প্রিয়ভাজন। তার চলনে-বলনে-কথনে ছিল মাধুর্য। তেমনি পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন।

জীবদ্দশায় স্যামসন চৌধুরী অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং তার কীর্তির জন্য বহু পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে পর পর দু’বছর দেশের সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

২০০৫ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক সেরা করদাতা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পান। ২০০৯ ও ২০১০ সালে সিআইপি মনোনীত হন। পাবনার অনেক বেকার সমস্যার সমাধান, সেখানকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে অসাধারণ অবদানসহ দেশের শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রে তার অবদান ভোলার নয়।

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত দেশের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান স্কয়ার গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরীকে পাবনা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে কাশিপুর চৌধুরী বাড়ির (অ্যাস্ট্রাস) পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। পাবনার মানুষের আপনজন স্যামসন এইচ চৌধুরীকে তারা আজও ভুলতে পারেননি। পথিক এখনও অ্যাস্ট্রাসের পাশে গিয়ে থমকে দাঁড়ান, নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। আত্মীয়স্বজনের মতো কর্মচারীরা এমনকি পাবনাবাসীও নীরবে চোখের পানি ফেলেন।

স্যামসন এইচ চৌধুরীর ৩ সুযোগ্য সন্তান স্যামুয়েল এস চৌধুরী (স্বপন চৌধুরী), তপন চৌধুরী, অঞ্জন চৌধুরী, একমাত্র মেয়ে রত্না তলাপাত্র নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন। আর এখনও তাদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন মহীয়সী মা অনিতা চৌধুরী।

আখতারুজ্জামান আখতার : যুগান্তর ও চ্যানেল আই’র পাবনা প্রতিনিধি

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×