লোকরঞ্জনবাদ জিতলে ইউরোপ হারবে

  ইয়শকা ফিশার ০৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইউরোপ

ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে ২০১৯ সাল হতে যাচ্ছে আরেকটি কঠিন বছর, যেখানে বড় বড় এমন অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে যেগুলো স্বাভাবিকভাবেই বিপদসঙ্কুল সংকটের দিকে নিয়ে যেতে পারে মহাদেশটিকে। বড় ধরনের একটি ওলটপালট ছাড়া ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাবে ব্রিটেন।

আর ফ্রান্স সম্ভবত পতিত হবে লোকরঞ্জনবাদী প্রতিবাদ-বিক্ষোভে, যা দেশটির ইইউ পর্যায়ে সংস্কারে নেতৃত্ব দেয়ার সম্ভাব্য ভূমিকাকে খাটো করে দেবে। তাছাড়া মে মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচনে একটি জাতীয়তাবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা কাছাকাছি ফলাফল পাওয়া যেতে পারে, যা থেকে পরে ইউরোপিয়ান কমিশনের সদস্য, ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ও ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের নেতা এবং পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা নীতির উচ্চপর্যায়ের নেতা মনোনীত করা হবে। জাতীয়তাবাদীদের জয় যে ইইউ’র জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পার তা বলাই বাহুল্য। কারণ এটি প্রয়োজনীয় সংস্কারকে পথচ্যুত করতে পারে এবং সদস্য দেশগুলোকে করে দিতে পারে আরও বিভক্ত।

যাই ঘটুক না কেন, ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নাটক শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিশৃঙ্খলার পটভূমির বিপরীতেই খেল দেখাবে। একই সময়ে পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়া নিজের আগ্রাসনকে জোরদার করছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছেন এবং তা ইইউ পর্যন্ত বিস্তৃত করতে পারে (যাকে তিনি ‘শত্রু’ মনে করেন)। আরও বিস্তৃতভাবে বললে, বৈশ্বিক অর্থনীতি দুর্বল হচ্ছে এবং সামনের মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধি ক্রমাগত কমতে থাকবে। ভবিষ্যতের দৃশ্যমান এসব চ্যালেঞ্জের মুখে খোদ ইউরোপীয় প্রজেক্টের টিকে থাকার বিষয়টিই হুমকির মুখে।

ব্রেক্সিট কতটুকু উদ্বেগের, তার বেশির ভাগটাই নির্ভর করবে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়া সুশৃঙ্খলভাবে হচ্ছে নাকি বিশৃঙ্খলভাবে, তার ওপর। যদি দ্বিতীয়টি ঘটে তবে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ব্রিটেন-ইইউ সম্পর্ক অনাগত দীর্ঘ সময়ের জন্য বিষাক্ত রূপ নিতে পারে। ইংলিশ চ্যানেলের উভয় পাড়ের কারোরই এমন কোনো ফলাফল চাওয়া উচিত নয়। বিচ্ছেদের পরও জীবন চলমান থাকে এবং একটি সম্পর্ক রক্ষা করে চলা স্বাভাবিকভাবে উভয়পক্ষের স্বার্থের জন্যই ভালো। আশা করা হচ্ছে কাণ্ডজ্ঞান বজায় থাকবে। ব্রেক্সিটের সঙ্গে যেমনটি হয়েছে, তেমনিভাবে ইইউ নেতৃত্ব ইতালির সংকট সমাধান করতে পারবে না; কিন্তু সংস্থাটি পারে এবং তাকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারতে হবে। ইতালির প্রবৃদ্ধি দরকার, যেখানে দেশটির পুরো অর্থনীতির আধুনিকায়নের প্রয়োজন হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশটির বর্তমান সরকার এমন নীতি গ্রহণ করতে পারছে না, যা দিয়ে এটি অর্জন করা সম্ভব। বিপরীতে, ইতালি ইইউ’র বাজেট আইনকে কেন্দ্র করে ইইউ’র সঙ্গে মুখোমুখি পরিস্থিতিকে উসকে দিয়েছে। ইইউকে নমনীয় মনোভাব দেখাতে হবে, একইসঙ্গে মূলনীতিও ধরে রাখতে হবে যাতে করে মুদ্রানীতি বিষয়ক ঐকমত্যের টেকসই পরিস্থিতি ধরে রাখা যায়। এর অর্থ হচ্ছে, সামনের দিনে দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক দরকষাকষি অপেক্ষা করছে।

ফ্রান্সে ‘হলুদ বিপ্লবীরা’ তাদের দাবিগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরেছে, যার বেশিরভাগই অর্থনীতি সংক্রান্ত এবং তারা প্রথম রাস্তায় বিক্ষোভে নেমেছিল প্রস্তাবিত জ্বালানি করের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাদের আন্দোলনে আরও যুক্ত হয়েছে কঠোর ও উগ্র ডানপন্থী উপাদান, যেখানে বিশ্বায়ন ও ইউরোপীয় অখণ্ডতার যুগে জীবনের প্রথাগত পদ্ধতি হারিয়ে যাওয়ার অসন্তোষের প্রভাব পড়েছে। বেশির ভাগ পশ্চিমা দেশের মতো এসব মনোভাব জেঁকে বসেছে প্রথাগত কার্যক্রম পরিচালনাকারী ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের মধ্যে- যাদের উপসংহার হল, যুদ্ধ-পরবর্তী সামাজিক চুক্তির কোনো বৈধতা নেই। কঠোর পরিশ্রম আর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না এবং উপরে যাওয়ার গতিময়তাও দিচ্ছে না।

পশ্চিমা এলিটশ্রেণী জনগণের আস্থা ফিরে পাবে না যতক্ষণ না তারা মানুষের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারে ভালো কোনো জবাব দিতে পারে। এমন জবাব বা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ছাড়া গণতন্ত্র ও এর মূল প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম চালাতে সক্ষম হবে না। সমস্যাগুলোকে আরও জটিল করে দিয়ে বৈশ্বিক ভারসাম্য পশ্চিম থেকে পূর্বের দিকে দ্রুত হেলে পড়ছে, জলবায়ু সংকট গভীরতর হচ্ছে, নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তিগুলো আমাদের কাজ ও জীবনযাপনে বিপ্লবী পরিবর্তন আনছে এবং অভিবাসন ও শরণার্থীর ঢেউ লোকরঞ্জনবাদী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় ইন্ধন জোগাচ্ছে। কিন্তু যদি লোকরঞ্জনবাদী শক্তিগুলোর এমন কোনো পরিকল্পনা থাকে যা প্রথাগত জাতিরাষ্ট্র সংক্রান্ত তাদের আকাক্সক্ষাকে কার্যকর করতে পারে এবং তা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে, তবে তারা বিষয়টিকে গোপন করে রেখেছে। বাস্তবে একটি ঐক্যবদ্ধ ইউরোপই সবকিছুকে এগিয়ে নিতে পারে এবং এ কারণে এ বছরের ইউরোপীয় নির্বাচন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি লোকরঞ্জনবাদ জয়ী হয় তবে ইউরোপ হারবে।

এটা না বললেই নয় যে, গত কয়েক দশকজুড়ে আন্তর্জাতিক বড় বড় পরিবর্তনের বেশিরভাগই অর্জিত হয়েছে ইউরোপের ব্যয়ে। চীনের উত্থান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব মনে হয় ইউরোপকে সাইডলাইনে ফেলে দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত পুরনো মহাদেশ চলন্ত অবস্থাতেই ঘুমিয়ে আছে। যদি অতি দ্রুত এর ঘুম ভেঙে না ওঠে, তবে তা নিজের ভালোর জন্য পরিবর্তনের সরঞ্জাম নেয়ার সুযোগ হারাবে।

নতুন একটি যুগ শুরু হয়েছে এবং ২০১৯ সালজুড়ে ক্রমাগত এটি স্পষ্ট হবে। প্রথাগত ইউরোপীয় বিতর্ক আর বেশি সময় শক্তভাবে আটলান্টিকের দু’পাড়ের জোটবদ্ধতাকে অনুমোদন করবে না বা ‘চিরস্থায়ী ঘনিষ্ঠ ঐক্যের’ দিকে নিরবচ্ছিন্ন অগ্রগতিও ঘটাবে না। ট্রাম্পের আমেরিকা এরই মধ্যে বিদায় বলে ফেলেছে এবং ইউরোপের পুরনো সামাজিক মডেল কোনো বিকল্প না দিয়েই ভেঙে পড়েছে। কাল্পনিক অতীতের জন্য স্মৃতিকাতরতা বা চীনের কর্তৃত্বপরায়ন সরকারের মডেল- কোনোটিই সেবা দেয়ার মতো বিকল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে না।

ইউরোপের সামনে যেসব সংকট রয়েছে, সেসব নিরলসভাবে উন্মোচিত হবে এবং সবাই তা দেখবে। সবচেয়ে ভালো হয়, ২০১৯ সাল ইউরোপীয় একটি নতুন শুরুর পরিবর্তে একটি রণকৌশলের প্রতিরক্ষার বছর হলে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুনর্গঠিত একটি ইউরোপই একমাত্র বিকল্প। এ স্ববিরোধিতা সংজ্ঞায়িত করবে এই ক্রান্তিকালকে, যার কোনো শর্টকাট পথ বা মহৌষধ নেই।

আরব নিউজ থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

ইয়শকা ফিশার : জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস চ্যান্সেলর; জার্মান গ্রিন পার্টির সাবেক নেতা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×