এক আলোকিত বাংলাদেশের আশায়

  ড. এম এ মাননান ০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক আলোকিত বাংলাদেশের আশায়
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: যুগান্তর

যার মনে সর্বক্ষণ থাকে মানবমুক্তির চিন্তা, তার হাত ধরেই তীরে ভিড়েছে বিজয়ী নৌকা। বিজয় দিয়েই আমাদের নতুন বছর শুরু। শুরুটা যেমন সুন্দর, শেষটাও হোক সুন্দর। আগামী পাঁচ বছরে দেশটাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া যাবে, তার হিসাব-নিকাশ শুরু করতে হবে এখনই। অবশ্য শুরুটা শুরু হয়েছে গত মাসেই ইশতেহারের মধ্য দিয়ে।

সেখানে আমরা দেখেছি অনেক আশার কথা, গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠার কথা, অনেক বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্নের কথাও। প্রশ্ন থেকেই যায় : স্বপ্নপূরণ হবে তো? প্রশ্নটা আসে এমনি এমনি নয়। আসে অতীতের আলোকে। অতীতে দেখেছি, একটা নির্বাচন শেষ হয় আর হেরে যাওয়া মানুষ প্রায়ই বিরূপ হয়ে ওঠে।

আবার জিতে যাওয়াদের মধ্যেও একটা শ্রেণী বর্বর হয়ে ওঠে। এবার তেমন এখনও দেখছি না, তবে বর্বরদের দেখা একটু হলেও মিলেছে। আতঙ্কের সঙ্গে গণমাধ্যম দেখেছি সুবর্ণচরের বর্বর ঘটনাটি। আমরা সংশ্লিষ্টদের মুখ থেকে প্রত্যয়ের সঙ্গে শুনতে চাই, এমনটি বাংলার বুকে আর কখনও ঘটবে না।

অতীতে নির্বাচনের আগে-পরের ঘটানো বর্বরতার পুনরাবৃত্তি চায় না বলেই জাতি সংঘবদ্ধ হয়ে এবার ভরসা করেছে নৌকার ওপর। নৌকা যেন কাতচিত না হয়; জাতির আস্থা যেন নষ্ট না হয় কোনোক্রমেই। ঘটনা ঘটার পরে অ্যাকশন দেখতে চাই না, অ্যাকশন চাই ঘটার আগেই। হতে হবে সবারই প্রো-অ্যাক্টিভ।

রি-অ্যাক্টিভ বিষয়গুলো মুছে যাক চিরতরে এ দেশের মাটি থেকে। জেগে উঠুক সব মানুষ, জেগে উঠুক সব সংস্থা। সুবর্ণচরের ঘটনাটিকে বিক্ষিপ্ত ঘটনা মনে না করা হোক; মনে করা হোক দুর্যোগের অশনিসংকেত। যারা এসব করেছে তারা সরকারকেই প্রকারান্তরে ডুবাতে চায়।

জয়ের শুভশক্তিকে অশুভের হাতে তুলে দিতে চায়। সাবধান হতে হবে এমন ধরনের ব্যক্তিদের ব্যাপারে। নতুবা ছোবল তুলে এগিয়ে আসবে আপাতত ঘুমিয়ে থাকা কোবরারা। এরা সুবিধা পাওয়ার লোভে কোনো না কোনো দলের আঁচলে লুকিয়ে থাকে। এদেরকে চিনে রাখা জরুরি।

এরা অসৎ, পশু শ্রেণীর। এদের কোনো দল নেই, এরা লম্পট, শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। নির্বাচন এদের জন্য একট অসৎ কাজ করার সুযোগ। এদের বিচার হতে হবে সঙ্গে সঙ্গেই। দৃশ্যমান হতে হবে অ্যাকশন। বিলম্ব শুধু বদনামই ডেকে আনবে।

এবার আসি যে কথা বলতে চেয়েছিলাম সে কথায়। আমরা প্রত্যাশা করছি, নতুন সরকারের হাত ধরে গড়ে উঠবে একটি সুন্দর আলোকিত ভবিষ্যৎ, যে ভবিষ্যতের আয়নায় আমরা দেখব মর্যাদাবান একটি জাতি বিশ্বের বুকে দাঁড়িয়ে আছে শির উঁচু করে। আর মর্যাদা তো এমনি এমনি আসে না। মর্যাদা তৈরি করে নিতে হয়। আর তার জন্য দরকার অনেক কিছু। প্রথমেই সাবধান হতে হবে এবং সবসময়ই সাবধান থাকতে হবে হেরে গিয়ে চুপ মেরে যাওয়া পরাজিতদের ব্যাপারে।

যে কোনো সময় সুযোগ পেলেই মারবে আচমকা ছোবল। এখন তারা কোনো ক্ষোভ দেখাচ্ছে না, এর অর্থ এই নয় যে, তারা চিরকাল চুপ করে থাকবে। মনে তো হয়, ঝড়ের আগে চারদিকে বিরাজমান সুনসান নীরবতা। এরা এ ধরনের কাজ করেছে ২০০১ সাল থেকে শুরু করে সব নির্বাচনের আগে-পরে।

তারপর দেখতে হবে, দেশের আইনপ্রণেতা হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে কেউ যেন এমন কাজ না করেন যা জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে যায়। এরা যেন কেউ মাদক কারবারিদের সহযোগিতা না করেন; চোরাচালানে অংশীজন না হন; এলাকায় দুর্বলদের হয়রানি না করেন; নারী নিগ্রহের ধারে-কাছেও না যান; অযথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজে হস্তক্ষেপ না করেন; শিক্ষকদের সঙ্গে বেয়াদবি না করেন (কোথাও কোথাও অতীতে এমনটি হয়েছে); এলাকার মুরুব্বিদের সঙ্গে সদাচরণ করেন; স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া শিক্ষার্থীদের রাজনীতির নামে পথচ্যুত না করেন এবং শিক্ষার্থীদের রাস্তায় রোদে-বৃষ্টিতে দাঁড় করিয়ে রেখে কখনও সংবর্ধনা না নেন।

তাদের কাছ থেকে আমরা আশা করব, তারা গ্রামেগঞ্জে বিচার-সালিশে যুক্ত সরদার-মাতব্বরদের (স্থানীয় বিচারকদের) আশকারা দেবেন না; অর্থের বিনিময়ে যারা সামাজিক বিচারকার্যে নীতিহীনতা ঘটায় তাদের শাস্তির মুখোমুখি করবেন; নিজ নিজ এলাকায় যৌতুক প্রথার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রথা স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্রত নিয়ে নির্মূল করবেন; সর্বোপরি, অসহায়দের সাহায্যে যথাসময়ে এগিয়ে আসবেন।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমরা দেশবাসী আরও প্রত্যাশা রাখি, তারা নিজ নিজ এলাকার তরুণদের নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহী করে তুলবেন; তাদের কর্মমুখী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলবেন; প্রত্যেকটি পরিবারের স্কুল-গমনের উপযোগী শিশুদের প্রাথমিকে ভর্তি নিশ্চিত করাসহ পুরো বিষয়টির তদারকির ব্যবস্থা করবেন; ছেলে হোক মেয়ে হোক সব শিশু-কিশোর-যুবদের এমনভাবে শিক্ষিত-প্রশিক্ষিত করবেন (বিশেষ করে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায়) যাতে তারা এলাকায় সুদক্ষ নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে; দল-মত নির্বিশেষে সব তরুণ-তরুণীকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা দেখাবেন; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলোয় শিক্ষার সঠিক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন; স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-রাস্তাঘাটসহ সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে যোগ্য-দক্ষ-অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান/ব্যক্তিদের ওপর অর্পণ করবেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, এলাকার সব অংশীজন নিয়ে এলাকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত নেবেন যাতে যে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকালে সবাই স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে সহযোগিতা করে।

এমনটি হলে দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তার সিঁড়িটি পিচ্ছিলতামুক্ত হবে। প্রত্যেক সংসদ সদস্য নিজ নিজ এলাকার সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারলে সারা দেশেরই সমভাবে উন্নয়ন হবে। আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা বক্তৃতার বিষয় নয়, সচেতনভাবে কাজ করে অর্জন করার বিষয়।

আমরা কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে ‘আতঙ্কের মানুষ’ হিসেবে দেখতে চাই না। জনগণ তাদের ভোট দিয়েছেন অনেক আশা নিয়ে। তার চান নির্বাচিত নেতাটি যেন সারা বছর ধরে তাদের এলাকার উন্নয়নের কাজ করেন; তাদের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ রক্ষা করেন (শুধু ভোটের সময় এলেই হুড়মুড় করে শহর থেকে এসে পায়জামা-পাঞ্জাবি-টুপি পরে কোলাকুলি শুরু না করেন); তাদের সুখ-দুঃখের কথা শোনেন এবং যতটুকু পারেন প্রতিকার করেন; কারও পক্ষ না নিয়ে সবার প্রতি সমান আচরণ করেন; হয়রানির শিকার ব্যক্তি আর নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়িয়ে শক্ত অবস্থান নেন; দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন; চাঁদাবাজ-দখলবাজ-টেন্ডারবাজদের মতো দেশ-দশের শত্র“দের শক্ত হাতে দমন করেন এবং কোনো অন্যায়কারীকে জেনেশুনে প্রশ্রয় দিয়ে নিজেও জুলুমবাজদের কাতারে চলে না যান। জাতীয় আমানতের দায়ভার কাঁধে নিয়ে আমানতের বরখেলাপ করলে শুধু পরকালই ধ্বংস হবে না, একালেও জনরোষের শিকার হতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ঘটনাচক্রে ঐতিহাসিক নৌকা প্রতীক বিজয়ী হয়নি। বিজয়ী হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা অভিজ্ঞ রাজনীতিক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নশীল বিশ্বে অভাবিত সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশকে তুলে ধরার কারণে। অনেক অভাবিত মেঘা প্রকল্প হাতে নিয়ে বিশ্বস্বীকৃত হয়েছেন সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার। জনগণ এ সাফল্যকে গুরুত্ব ও মূল্য দুটিই দিয়েছে। সারা বিশ্ব নির্বাচনকে সফল হিসেবে উল্লেখও করেছে।

তাই সাবধান থাকতে হবে সব জয়ীদের; মান্য করতে হবে নির্বাচনী ওয়াদাসহ শপথকালের ওয়াদাগুলোকে। জ্ঞানে-প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনোত্তর এমপিদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণের সাবধানবাণীটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ‘ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ব্যক্তি স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে ক্ষমতার ব্যবহার করবেন না ... জনগণের কাছে আমাদের যে ঋণ, সে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। উন্নয়নের মাধ্যমেই সে ঋণ পরিশোধ করা হবে’ (সমকাল: ৪ জানুয়ারি ২০১৯)।

উন্নয়নের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের আস্থা উন্নয়নের মাধ্যমেই ধরে রাখতে হবে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মাদক, জঙ্গিবাদ, মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অনাচারের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আরও জোরদার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় চতুর্থবারের মতো আসা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ আগামী পাঁচ বছরে আরও অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, এ প্রত্যাশা নিয়ে আমরা জনগণ আগামীর সাফল্যকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করব।

ড. এমএ মাননান : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×