তৃতীয় মত

এবারের লক্ষ্য হোক দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ

ত্রিশে ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী মহাজোটের বিজয়কে নানাজনে নানাভাবে বিশ্লেষণ করছেন। আমার বিবেচনায় যদিও এটা আওয়ামী লীগের একটানা তিনবার নির্বাচন বিজয়, এ বিরাট বিজয়ের দরকার ছিল।

এটা একটা সাধারণ ধরনের নির্বাচন নয়, এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তির যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত্তি যে স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতা, তা হুমকির মুখে পড়ত।

আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী জোটটি যে একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্তরাধিকার বহন করছে, জনগণের কাছে এটা ঢাকা দেয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কিছু সাবেক নেতাকে এ জোটে হায়ার করা হয়েছিল। ভোটদাতারা তাতে বিভ্রান্ত হননি।

নির্বাচনে এক আধটু অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে, যা এশিয়া-আফ্রিকার সব দেশের সব নির্বাচনেই হয়ে থাকে। তাতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। সবচেয়ে বড় কথা, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির জয় হয়েছে; একাত্তরের বিজয়ের ফসল রক্ষা পেয়েছে। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকছে।

এ বিশাল বিজয়ে আওয়ামী মহাজোটের নেতারা অবশ্যই উল্লসিত। কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে, এ বিজয় তাদের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গত দুই দফা তারা নানা ধরনের সন্ত্রাস, দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক চক্রান্ত ঠেকাতে ব্যস্ত ছিলেন।

স্বাধীনতার শত্রুপক্ষের নানা ধরনের চক্রান্ত মোকাবেলা করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। একটি ‘তলাবিহীন ঝুড়িকে’ উন্নয়নের বিশাল সম্পদে পূর্ণ করার কাজে বিরাট সাফল্য অর্জন করার যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন।

দেশের কৃতজ্ঞ মানুষ তাই এবারের নির্বাচনেও তাদের ভোট দিয়েছে। কিন্তু এ ভোটদানের সঙ্গে সঙ্গে আরও বড় দায়িত্ব পালনের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নতুন সরকারের জন্য সেই দায়িত্ব পালনই হবে আরও বৃহৎ চ্যালেঞ্জ।

এ চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে, বিশাল দুর্নীতির দানবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং দেশে গুড গভর্নেন্স বা সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রুল অব ল’ বা আইনের শাসনকে প্রকৃত প্রতিষ্ঠা দান। প্রশাসনকে দলতন্ত্র মুক্ত করে তার গণতন্ত্রায়ণ, নিরপেক্ষ কাঠামো তৈরি।

এটা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও। গত দু’দফা শাসন ক্ষমতায় থাকাকালে তারা দারিদ্র্য ও সন্ত্রাস থেকে দেশকে অনেকটাই মুক্ত করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দেশকে উন্নয়নের মডেল করে তুলেছেন।

কিন্তু যেটা তারা এখনও পারেননি তা হল, দুর্নীতির মহারাক্ষসকে পরাজিত করা এবং দেশটিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে বাংলাদেশে এমন ভয়াবহ দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করা হয়েছিল, যার সবটা কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষেই এক টার্ম বা দুই টার্ম ক্ষমতায় থেকে দূর করা সম্ভব ছিল না। কোনো দেশেই কোনো গণতান্ত্রিক সরকার গণতান্ত্রিক পন্থায় তা পারেনি।

ব্রিটেনে মার্গারেট থ্যাচারের টোরি সরকার শতাব্দী-প্রাচীন ওয়েলফেয়ার স্টেটের ভিত্তি অনেকটাই ধ্বংস করে সাধারণ মানুষের জন্য যে অবর্ণনীয় অবস্থা সৃষ্টি করে গিয়েছিলেন, দীর্ঘকাল পর ক্ষমতায় এসে লেবার গভর্নমেন্টের নেতা টনি ব্লেয়ার বলেছিলেন, টোরিদের সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জঞ্জাল থেকে ব্রিটেনকে মুক্ত করা ক্ষমতায় এসে এক টার্মে সম্ভব নয়, আমাকে তিন টার্ম ক্ষমতায় থাকতে দিতে হবে।’ ব্রিটেনের মানুষ তাকে তাই দিয়েছিল।

ব্রিটেনের চেয়েও বাংলাদেশের অবস্থা আরও সমস্যা সংকুল। এ সমস্যা মোকাবেলার ক্ষেত্রে হাসিনা সরকার প্রশংসনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। তাদেরও তিন বা ততোধিক টার্ম ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ বিজয়ের অধিকারী করে জনগণ তাদের সেই সুযোগই দিয়েছে।

দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার সাফল্যের সঙ্গে স্বাধীনতার ভঙ্গপ্রায় ভিত্তি অনেকটা মেরামত করেছে। সন্ত্রাস ও দারিদ্র্যের লাগাম টেনে ধরেছে। নাজুক গণতন্ত্রকে স্থিতিশীলতা দিয়েছে।

যেটা তারা পারেনি সেটা হল, দুর্নীতির রাক্ষসবধ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। সে জন্য পরপর দুই টার্মের বেশি ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন। বাংলার মানুষ সেই সুযোগ আওয়ামী লীগকে এবার দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের যে নতুন সরকার শপথগ্রহণ করেছে- তাদের দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সাহসী নেতা হিসেবে আছেন শেখ হাসিনা। বৃহৎ শক্তির ভ্রুকুটি উপেক্ষা করার এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও যুদ্ধ করার সাহস ও অভিজ্ঞতা তার আছে।

সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী এবং রাজনীতির তৃণমূল পর্যন্ত তার শেকড় বিস্তৃত। সুতরাং দুর্নীতির দানব যত শক্তিশালী হোক, আন্তরিকতা ও ইচ্ছা থাকলে আওয়ামী লীগ পারে এ দানবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে। আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জয়ী হলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা খুব কষ্টের কাজ হবে না।

মহাজোটের নতুন সরকারে নবীন-প্রবীণ যারা স্থান পেয়েছেন, তাদের সবাইকে অভিনন্দন জানাই। সবার সঙ্গে আমারও প্রত্যাশা- নতুন হাসিনা সরকারের কাছে এবার প্রায়োরিটি পাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা।

গত হাসিনা সরকারের স্লোগান ছিল- দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ব। সে লক্ষ্য তারা অনেকটাই পূরণ করেছিল। এবার তাদের স্লোগান হোক দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ছিল ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ২০১৯ সালে শেখ হাসিনার স্লোগান হোক ‘এবারের সংগ্রাম দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম’।

এ সংগ্রাম স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের চেয়েও কঠিন। দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে। কচুরিপানার মতো দ্রুত বিস্তার লাভ করে। তাকে ধ্বংস করা কঠিন। দুর্নীতি দৃশ্যমান শত্রু নয়, কিন্তু তার অবস্থান সবার জানা। দুর্নীতিবাজরা অসীম শক্তিশালী। তাদের দমন করতে হলে আগে আত্মশোধন করতে হবে, আত্মশক্তিতে বলীয়ান হতে হবে।

দুর্নীতিবাজ নব্যধনীদের বড় অংশ সৃষ্টি করে গেছেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। তার স্লোগান ছিল ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’। তিনি সরকারি ব্যাংকের টাকা অবাধে লুট করে নব্যধনী হওয়ার সহজ রাস্তা করে দিয়েছিলেন।

পাকিস্তানে আইয়ুব খান যেমন সরকারি অর্থে পিআইডিসি (পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন) গঠন করে তার অর্থ ও শিল্প প্রতিষ্ঠান লুট করার সুযোগ দিয়ে ২৩ পরিবার জন্ম দিয়েছিলেন, তার অনুসারে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে ২৩ হাজার ধনী তৈরি করেছেন। তাদের মধ্যে এক বিরাট সংখ্যক হচ্ছে দুর্নীতি ও লুটপাটের মহারাজা।

বিএনপিতে যেমন তারা ছিল এবং আছে, তেমনি আওয়ামী লীগেও তারা অনুপ্রবেশ করেছে। প্রকৃত আওয়ামী লীগারদের বদলে তারা এখন নব্য লীগার। তাদের কৃত সব অপকর্মের দায় বহন করতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে।

আওয়ামী লীগ নেতা এবং মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এদের নাম দিয়েছেন ‘কাউয়া’। আওয়ামী লীগকে এই কাক তাড়ানোর জন্য এবার কঠোর হতে হবে। কাজটি শুরু করতে হবে নিজেদের ঘর থেকে।

মার্গারেট থ্যাচারের একটি বহুল উদ্ধৃত উক্তি হচ্ছে, আগে ঘরের শত্রু (বহবসু রিঃযরহ) দমন, তারপর বাইরের শত্রু নিধন।’ আওয়ামী লীগ দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাইলে এ নীতিটি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারলে আওয়ামী লীগ পরবর্তী নির্বাচনেও জনগণের ম্যান্ডেট পাবে বলে আমার বিশ্বাস। ত্রিশের মন্দা থেকে আমেরিকাকে রক্ষা এবং নিউডিল (ঘবফিবধষ) পলিসি দ্বারা আমেরিকার আর্থসামাজিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করে তোলার জন্য গত শতকে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টকে সংবিধান সংশোধন করে তৃতীয়বারের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়েছিল।

মালয়েশিয়ায় জনগণ মাহাথিরকে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের পরও তার আমলের সুশাসনের জন্য এ বৃদ্ধ বয়সে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছে। বাংলাদেশের এত উন্নয়ন ঘটানোর পর শেখ হাসিনা যদি দুর্নীমিুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে জনগণই তাকে পরবর্তী নির্বাচনেও ক্ষমতায় রাখতে চাইবে। ড. কামাল হোসেনের দুই দফার প্রধান মন্ত্রিত্বের থিওরি তার মাইনাস টু থিওরির মতো ব্যর্থ ও আর্তবিলাপে পরিণত হবে।

লন্ডন, ৬ জানুয়ারি, রোববার, ২০১৯

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×