পিতা, আবার এসে দেখে যাও তোমার কন্যার বাংলাদেশ

  এম এ মাননান ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পিতা, আবার এসে দেখে যাও তোমার কন্যার বাংলাদেশ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

পিতা, তুমি এসেছিলে আজকের এই দিনে তোমার প্রিয় মাতৃভূমিতে; ২৯০ দিনের কারাজীবনের পর বিজয়দীপ্ত পা রেখেছিলে লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। মিয়ানওয়ালী কারাগার থেকে এসেছিলে যমদূতের রক্তচক্ষুর সামনে দিয়ে লন্ডন-দিল্লি হয়ে, হিমালয়ের মতো শির উঁচু করে।

কারাগারের সামনে তোমার জন্য শাসকগোষ্ঠীর খোঁড়া কবরও তোমাকে এতটুকু হতোদ্যম করতে পারেনি। সারা বিশ্বের বিস্ময় অদম্য নেতা তুমি বুঝিয়ে দিয়েছিলে হানাদার গোষ্ঠীকে, বাঙালি কখনও কারও কাছে মাথানত করে না। বাংলাদেশের মুক্তির অগ্রদূত ছিলে তুমি, একটুও ভীত হওনি ওদের চক্রান্তে, যখন তোমাকে- সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুকুটহীন সম্রাটকে- তারা ধরে নিয়ে গেল ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে একাত্তরের ২৫ মার্চের গভীর রাতে। তোমার কী দোষ ছিল? তুমি তো শুধু চেয়েছিলে বাংলার সাড়ে সাত কোটি নির্যাতিত মানুষ শান্তিতে থাকুক, নিপীড়নের হাত থেকে মুক্ত হোক, বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।

যেদিন এসেছিলে পাকিস্তানের পরাজিত শাসকগোষ্ঠীর কারাগার থেকে, সেদিন বাংলার বুকে ছিল খুশির সমীরণ। গাছের পাতায় পাতায় ছিল আনন্দের শিহরণ। সুন্দর মনের লাখো বাঙালি ভিড় করেছিল বিমানবন্দরে তোমাকে একটু দেখবে বলে। তাদের দেখে তুমি সেদিন বিকালে বুক ভাসিয়েছিলে অজস্র অশ্রুধারায়। তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশ আর রাস্তায় অপেক্ষমাণ পাগলপারা লোকগুলোকে দেখে তুমি বিমূঢ় হয়েছিলে। খোলা ট্রাকের ওপর বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে সঙ্গে নিয়ে উদ্বেলিত হৃদয়ে হাত নেড়ে বিশাল জনতাকে কৃতজ্ঞতা জানালে আর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলে রেসকোর্স ময়দানের দিকে, যেখানে আকুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল অগণিত জনতা।

তুমি এলে বীরের বেশে, উঠলে মঞ্চে, ভেজা কণ্ঠে অভিবাদন জানালে সবাইকে। নিশ্চয়ই মনে আছে পিতা, সেই মঞ্চের ওপর ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে অশ্র“বিগলিত কণ্ঠে অনেক কথার মাঝে স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা ব্যাখ্যা করলে আর সবাইকে নবসৃষ্ট বাংলাদেশের পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করতে বললে। কী চমৎকার ছিল তোমার সেই ভাষণ, একাত্তরের ৭ মার্চের অবিস্মরণীয় ১৯ মিনিটের অলিখিত কবিত্বময় ভাষণের পর এত সুন্দর ভাষণ আমরা শুনিনি আর কোনোদিন।

দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত ছিলে তুমি, তবুও সেই দৃঢ়কণ্ঠ, বজ কণ্ঠ আগের মতোই তেজোদীপ্ত, ভাষণে তোমার প্রস্ফূটিত রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদৃষ্টি। ১০ জানুয়ারির ভাষণে ছিল না আগুনের ফুলকি যা ছিল ৭ মার্চের ভাষণে। দরকার ছিল না, তাই তুমি আগুনঝরা বক্তৃতা না দিয়ে আহ্বান জানিয়েছিলে নবজাগরণের, নতুন দেশটাকে গড়ে তোলার জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার, ধৈর্য ধরে সব ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবেলার। সদ্য স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমার সংক্ষিপ্ত ভাবনাগুলো ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হল ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে সারা রেসকোর্স ময়দানে। সেই থেকে শুরু হল মুক্ত মানুষের নবজীবনের যাত্রা, তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশের পথচলা।

সেই স্বপ্নের দেশটিকে সোনালি আলোয় উদ্ভাসিত করার অভিলাষ পূরণ করার সময় পাওনি বলে তোমার অতৃপ্ত আত্মা নিশ্চয়ই গুমরে গুমরে কাঁদছে। দেখে যাও পিতা, যা তুমি করে যেতে পারোনি তা তোমার আদরের হাসু করে দেখিয়েছে। হাসু তোমার সেই খুকুটি নেই যাকে তার ছোট্ট বোনটিসহ রেখে চলে গেলে হায়েনাদের বুলেট বুকে নিয়ে। তোমার হাসু এখন বিশ্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক, উন্নয়নের রূপকার, বাংলার মানুষের হৃদয়ের মণি, নিপীড়িত মানুষের স্বপ্নস্রষ্টা।

তোমার দেখে যাওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার রাহুচক্রে আবদ্ধ, মরণদশায় উপনীত কৃষিশিল্প আর শূন্য কোষাগারের এক আশা-ভরসাহীন দেশ আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তোমার যোগ্য কন্যার হাতের পরশে, দেখে যাও একবার এসে। জানো কি তুমি তোমার কন্যা কী করেছে?

তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলাকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত করেছে, মাথাপিছু আয় ১৭৫১ ডলারে বৃদ্ধি করেছে, ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তৈরি করে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের পাঁচটি দেশের একটিতে রূপান্তরিত করেছে, দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশে এনে ঠেকিয়েছে। তার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতৃত্বে মাত্র ১০ বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলা।

তুমি কি কখনও কল্পনা করেছ টুঙ্গিপাড়ার বাইগার নদীর তীরে হাওয়ায় ভেসে ছুটতে ছুটতে সফেদ ঢেউ গুনতে গুনতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়া তোমার ছোট্ট হাসু তোমারই অসমাপ্ত রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করে একদিন মহাকাশে স্যাটেলাইট ছেড়ে বিশ্বকে চমকে দেবে? দেখো তাকিয়ে, নিন্দুকদের চেহারায় ধুলোর ঝাঁপটা দিয়ে তোমার কন্যা দৃশ্যমান করেছে ডিজিটাল বাংলাদেশ আর স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

সবচেয়ে বড় কথা, তোমার কন্যা মানুষকে নিত্য আকালের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে আর প্রমাণ করেছে যে নেতৃত্বের ভিশন, সবলতা আর স্বচ্ছতা থাকলে অবশ্যই উন্নয়নের দিশা পাওয়া যায়। দুর্মুখদের বলা ‘বটমলেস বাস্কেট বাংলাদেশ’ আজ বাস্কেট অব রিচেস। জানো কি, ইতিমধ্যে সমুদ্রও জয় করে ফেলেছে তোমার কন্যা, বাড়িয়েছে বাংলাদেশের সীমানা। নিু মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনের পর এখন তোমার হাসু আগামী তিন বছরে মধ্যে ছোট্ট দেশটাকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখছে এবং সেমতে উদ্যোগও নিয়েছে। হয়তো অবাক হবে শুনে, তোমার মেয়ের নেতৃত্বে দেশ এখন একশ’ বছর পরে কী হতে চায় তার স্বপ্ন দেখছে।

প্রায় অর্ধশতক হয়ে গেল। মনে আছে কি তোমার সেই শেষ পৌষের শীতের টনটনে পরশের সোনালি বিকালের স্মৃতিময় কথা, যেদিন বিমানবন্দরে নেমেই সোজা বাড়ি না গিয়ে গিয়েছিলে সেই সব জনমানুষের মাঝে রেসকোর্স ময়দানে (যা আজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে তোমার স্মৃতি বহন করছে), যেখানে লাখ লাখ মানুষ অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল স্বাধীনতার ঘোষক আর নব্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের জনককে এক নজর দেখার জন্য?

তুমি জান না পিতা, মাত্র ১০ দিন আগে তোমার স্বপ্নের দেশে অভূতপূর্ব অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন হয়ে গেল। তোমার কন্যার দল ভূমিধস বিজয় উপহার দিয়েছে সবাইকে। জীবন্ত কিংবদন্তি পিতা, তুমি স্বর্গ থেকে তাকিয়ে দেখ, তোমার লৌহমানবী কন্যার হাতের পরশে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ থেকে নির্মূল হয়েছে প্রায় সব যুদ্ধাপরাধী, তোমার খুনিদের বিচার হয়েছে, তোমার নিত্য রাজনৈতিক সহচর জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদেরও বিচার হয়েছে আর কালিমালিপ্ত হয়েছেন তোমার সঙ্গে পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা তোমার বিশ্বস্ত একজন, যিনি পথ হারিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে তোমার কন্যাকে বিব্রত করার লক্ষ্যে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে ঐক্য করেছিল এবারের নির্বাচনে। মনে রেখো পিতা, স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্ম তোমাকে ভালোবাসে, তার প্রমাণ তারা দিয়েছে এবারের নির্বাচনে তোমার প্রিয় নৌকাকে সারা দেশে জিতিয়ে দিয়ে।

স্মরণে রাখব আমরা তোমার অকৃত্রিম আত্মত্যাগ আর বিশাল নেতৃত্বের কথা, যা এনে দিয়েছে আমাদের আজকের এ অবস্থানে। তুমি থাকবে অমর হয়ে আমাদের সবার হৃদয়ে, চিরকাল ধরে। বাংলার মানুষ কখনও ভুলবে না তোমার মতো মহামানবকে- যতদিন সূর্য উঠবে পূর্ব দিকে, লোনা জলরাশিতে সিক্ত থাকবে সাগর-মহাসাগর, নীল গগনের বিস্তৃত জমিনে জ্বলজ্বল করতে থাকবে লক্ষ তারা, থাকবে মৌসুমি হাওয়ায় ধবল-কৃষ্ণ মেঘের আনাগোনা, ঝরো ঝরো বৃষ্টিতে নদীতে নাচবে জলতরঙ্গ।

তুমি থাকবে কবির কবিতায়, শিল্পীর ক্যানভাসে, গায়কের কণ্ঠে, লেখকের লেখনীতে, স্থপতির ভাস্কর্যে, ভাটিয়ালির সুরে, মাঝির বৈঠার বাজনায় আর ইতিহাসের পত্রে পত্রে। আজকে এই দিনে তোমার প্রত্যাবর্তন দিবসে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে কামনা করি তোমার বিদেহি আত্মার মাগফিরাত আর তোমার সুযোগ্য কন্যার দীর্ঘ হায়াত।

ড. এম এ মাননান : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×