ইতিবাচকতায় ভরপুর বিদায়ী বছর

  নিকোলাস ক্রিস্টোফ ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইতিবাচকতায় ভরপুর বিদায়ী বছর
বরফ খণ্ড। ছবি: সংগৃহীত

যেমনটি সবাই জানেন যে, বর্তমান বিশ্ব ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে; কিন্তু কোন কালোশক্তি আমাদের অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা দেখার জন্য শিহরণ জাগানো ও নার্ভাস অপেক্ষা এখনও চলছে। প্রথমে অর্থনীতি ধসে পড়বে নাকি বরফখণ্ড গলে যাবে, নাকি সবার আগে বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধ আমাদের ছেয়ে ফেলবে? সুতরাং ওই গুমোট পরিস্থিতির জন্য আমার প্রতিষেধক হল- আমাকে এটা বলতে চেষ্টা করার সুযোগ দিন, ২০১৮ সাল প্রকৃতপক্ষেই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা বছর ছিল।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাক্স রোসার এবং তার আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডাটা ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, গড়ে প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে আরও ২ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক সুবিধার আওতায় এসেছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন আরও ৩ লাখ ৫ হাজার মানুষ প্রথমবারের মতো পরিষ্কার খাবার পানির সুবিধা পেয়েছে। এমনকি প্রথমবারের মতো প্রতিদিন গড়ে আরও ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ অনলাইন সুবিধা পাওয়ার সক্ষমতা লাভ করেছে।

এর আগে কখনও মানবজাতির এত বৃহৎ একটি অংশ অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হয়নি, মধ্যবিত্তের মানের খাবারের স্বাদ পায়নি, এত দীর্ঘায়ু লাভ করেনি, পরিবার নিয়ে পরিকল্পনা বা তাদের সন্তানরা টিকে থাকতে পারবে- এমন আত্মবিশ্বাসে প্রবেশ করার সুযোগও ছিল না। চলুন, আমাদের ভয় ও হতাশা থামাই এবং প্রগতির এ প্রেক্ষাপটে এক ন্যানো সেকেন্ডের উদযাপন সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেই।

কয়েক বছর আগে গ্রামীণ অ্যাঙ্গোলার একটি নোংরা রাস্তায় ডেলফিনা ফার্নান্দেস নামের এক মহিলার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি ১৫ সন্তানের ১০ জনকেই হারিয়েছিলেন। তিনি সম্ভবত কোনো পিতামাতা সহ্য করতে পারেন না এমন সবচেয়ে বড় বিপদ সহ্য করেছেন এবং এমনটি তাকে ১০ বার সহ্য করতে হয়েছে।

এমনকি শিশুমৃত্যুও আগের স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৫ বছর বয়সের মধ্যে শিশু মারা যাওয়ার হারও মাত্র ৪ শতাংশ। এ সংখ্যাও আঁতকে ওঠার মতো; কিন্তু এটি ১৯৬০ সালের ১৯ শতাংশ এবং ২০০৩ সালের ৭ শতাংশ থেকে অনেক কম। বর্তমানে ব্রাজিল বা মেক্সিকোতে ৫ বছরের মধ্যে শিশু মৃত্যুর হার ১৯৭০ সালের আমেরিকার তুলনায় অনেক কম, তাতে সন্দেহ নেই।

‘গত চব্বিশ ঘণ্টায় বিশ্বজুড়ে ১৫ হাজার শিশু মারা গেছে’ বড় সংবাদ হিসেবে পত্রিকার শিরোনাম বা টেলিভিশনের স্ক্রলে এমন নিউজ দেখা যাবে না। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকেও প্রতিদিন ৩০ হাজার শিশু মারা যেত।

যখন সবখানেই অনেক বেশি নিষ্ঠুরতা, অপশাসন এবং হুমকি ঝুলছে আমাদের মাথার ওপর, তখন উন্নতির কীর্তন বিস্বাদ লাগতে পারে বৈকি। কিন্তু বছরের অন্য প্রতিটি দিনই আমি নিষ্ঠুরতা ও অপশাসনের বিষয়গুলো ঢেকে রাখি এবং উন্নয়ন ও প্রগতি সংক্রান্ত বার্ষিক এ প্রবন্ধটি আমি লিখে থাকি বিয়োগাত্মক ওইসব অবস্থাদৃষ্টে সম্ভাব্য বিষয় হিসেবে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে। এ প্রবন্ধের একটি উদ্দেশ্য হল- সাংবাদিকতাকে ধরা হয় বিশ্ব সম্পর্কে মানুষকে জানানোর বিষয় হিসেবে; কিন্তু এটি বেশিরভাগ মার্কিনিকে (অন্যান্য দেশের মানুষকেও) উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেয় এবং চিত্তাকর্ষকভাবে ভুল তথ্য দিয়ে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, জরিপে ১০ জনের মধ্যে ৯ জন আমেরিকান নাগরিকই বলে থাকেন, বৈশ্বিক দারিদ্র্য আরও বাড়ছে বা একই অবস্থাতে রয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে তর্কসাপেক্ষে বৈশ্বিক প্রবণতা হল দারিদ্র্যসীমা বড় আকারে নিুমুখী হয়েছে। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত বেশিরভাগ মানুষই সবসময় চরম দারিদ্র্যসীমায় বাস করতেন অর্থাৎ তাদের মাথাপিছু আয় দৈনিক ২ ডলারের নিচে ছিল। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, তখন বিশ্বজুড়ে ৪৪ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমায় বাস করতেন। আর বর্তমানে বিশ্বের ১০ শতাংশ থেকে কম মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমায় বাস করেন। এমনটিও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মেলানোর জন্য ধরে নেয়া হয়েছে।

একইভাবে, আমেরিকানরা মূল্যায়ন করেছে যে, বিশ্বের শিশুদের ৩৫ শতাংশকে টিকা দেয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হল- ১ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৮৬ শতাংশকেই ডিপথেরিয়া, ধনুস্টংকার ও পার্টুসিস রোগের টিকা দেয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যের মেধাবী স্কলার ড. হ্যান্স রোজলিং-এর মৃত্যুর পর ২০১৮ সালে প্রকাশিত তার ফ্যাক্টফুলনেসে তিনি লিখেছেন, ‘মনে হচ্ছে প্রতিটি মানুষ বিশ্বকে ধ্বংসাত্মকভাবে ভুল হিসেবে পাচ্ছেন। আমি যত মানুষকে প্রশ্ন করেছি তার প্রতিটি দলই মনে করে বিশ্বটি আরও বেশি ভঙ্গুর, আরও বেশি সহিংস এবং আরও বেশি আশাহত, সংক্ষেপে বলতে গেলে প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব যা, তার চেয়ে বেশি নাটকীয়।’ আমার সন্দেহ হয়, এ ভুল ধারণা আংশিকভাবে হলেও সাংবাদিকতায় কীভাবে আমরা খবরের কাভারেজ দেই, তার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। আমরা যুদ্ধের সংবাদ, গণহত্যা এবং দুর্ভিক্ষের সংবাদ প্রচার করি; কিন্তু উন্নয়ন-অগ্রগতির ওপর অনেক কম আলোকপাত করি।

গত বছর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ইয়েমেনে দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যাভাবে মৃত্যু, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন, দেশে শরণার্থী ও শিশু মৃত্যু এবং বিশ্বের সবচেয়ে দারিদ্র্যাঞ্চল সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক বিষয়ক সংবাদ আমি কাভার করেছি। এসব ঘটনাই আরও বেশি হারে মনোযোগ আকর্ষণকারী, কম নয়। কিন্তু কর্তৃত্বপরায়ণবাদ এবং দুর্বল ও বাজে শাসনের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে তিনটি দেশের বিস্ময়াভূত সাফল্যের বিষয়ে আমি কখনও কোনো কলাম বা নিউজলেটার লিখিনি। দেশ তিনটি হল- আর্মেনিয়া, ইথিওপিয়া এবং মালয়েশিয়া।

এটি অবশ্যই সত্য যে, সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বৈশ্বিক দারিদ্র্য এবং রোগের বিরুদ্ধে অর্জন মনে হচ্ছে ধীরগতি পাচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষভাবে গরিব দেশগুলোর জন্য মারাত্মক হুমকি। আর যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দূরবর্তী অবস্থানে থাকা দেশ, যেখানে প্রত্যাশিত গড় আয়ু নিচের দিকে যাচ্ছে, এমনকি বিশ্বের বাকি বেশিরভাগ অংশে সেটি বাড়ছে না।

সুতরাং অস্থির ও বিতৃষ্ণ হওয়ার বহু বিষয় রয়েছে; কিন্তু বৈশ্বিক অগ্রগতির বিষয় স্বীকার করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা দেখা দিলে তা মানুষকে আশাহত হওয়া এবং নিজেদের প্রচেষ্টা ছেড়ে দেয়ার দিকে চালিত করতে পারে। বস্তুত, অর্জনগুলো আমাদের দেখাতে হবে যে কোনটা সম্ভব এবং বিশ্বজুড়ে সুযোগ-সুবিধা উন্নত করার মহৎ প্রচেষ্টার দিকে তাড়িত করতে হবে।

বছরের বাকি প্রতিটি দিন সামনের দিকে এগিয়ে যান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প বা ন্যান্সি পেলোসির বিষয়ে আপনার দাঁত কড়মড় করুন; কিন্তু আজকের জন্য একটু বিরতি নিন (মনে রাখুন, মাত্র এক ন্যানো সেকেন্ডের জন্য!), যাতে করে তর্কসাপেক্ষে স্বীকৃতি দেয়া যায় যে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্তমানে ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর নয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ও আশাহত অধিবাসীরা উন্নত সাক্ষরতা এবং ভালো থাকা উপভোগ করছে এবং বিশ্ব এমন একটি দিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে কোনো মা-ই ফের ১০ সন্তান হারাবে না।

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

নিকোলাস ক্রিস্টোফ : দুটি পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী মার্কিন সাংবাদিক ও লেখক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×