ভারতের আসন্ন নির্বাচনে পাকিস্তান ফ্যাক্টর

  নাদিম আহমাদ মুনাকাল ও মানাসভি শঙ্কর শর্মা ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভারত ও পাকিস্তানের পতাকা
ভারত ও পাকিস্তানের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

ভারতে ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচন আর কয়েক মাস পরেই অনুষ্ঠিত হবে। দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো তাই এখন বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে খুবই ব্যস্ত।

তাদের এজেন্ডায় থাকা বেশিরভাগ বিষয়ই অভ্যন্তরীণ বা জাতীয় গুরুত্ব সংক্রান্ত, কারণ ভারতে নির্বাচনী প্রচারণায় পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে সচরাচর সম্পৃক্ত করা হয় না। তবে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য একটি ব্যতিক্রম রয়েছে এবং তা হল পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি।

ভারতের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে আনা হচ্ছে বহুদিন থেকেই। ২০১৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, যেখানে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কার্যক্রম সমূলে উৎখাত ও মুম্বাই হামলা বা ২৬/১১ হামলার পেছনে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য ইসলামাবাদের ওপর চাপ প্রয়োগের কথা বলা হয়।

অন্যদিকে বিজেপির ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে পাকিস্তান অধিকৃত (আজাদ) কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থীদের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতিতে জোর দেয়া হয়েছিল। ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে সন্দেহাতীতভাবে পাকিস্তান একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং এ প্রবণতা ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনেও পুনরায় জোরালোভাবে দেখা যাবে।

২০১৫ সালে উরিতে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে নয়াদিল্লি পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপ স্থগিত রেখেছে এবং কারতারপুর করিডোর খোলার পর ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে সম্পৃক্ত হওয়ার পাকিস্তানের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছে। এমনকি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, ‘সন্ত্রাস ও সংলাপ একসঙ্গে চলতে পারে না।’

গত ৫ বছরে বিভিন্ন কারণে ভারতে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজেপির অনেক সদস্য প্রকাশ্যে এমন মনোভাব স্থায়ী করার চেষ্টা করার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ধরনের আক্রমণের সাধারণ একটি লাইন হয়ে পড়েছে ‘পাকিস্তান চলে যাও’।

একবার তো বিজেপির যুব শাখা ‘যুব মোর্চা’ সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান এমপি শশি থারুরের তীব্র সমালোচনা করে তাকে পাকিস্তান চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। এর পেছনের কারণ ছিল থারুর কর্তৃক মোদি সরকারের সমালোচনা করা।

জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ফ্যাক্টর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখনই সীমান্তে কোনো প্রতিপক্ষের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে কোনো সেনা মারা যায় বা কাশ্মীরে কোনো সামরিক অভিযান চালানো হয়, রাজনীতিকরা তৎক্ষণাৎ এ সংক্রান্ত ক্ষোভকে সরকারবিরোধী অস্ত্রে রূপান্তরিত করে।

এ ক্ষেত্রে কোন সরকার ক্ষমতায় তা বিবেচনায়ই নেয়া হয় না, বিরোধীরা সবসময় পাকিস্তানের বিপক্ষে কঠোর ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং এটি সাধারণ ভারতীয় ভোটারদের অনুরণিত করে, তারা সবসময় পাকিস্তানকে সন্দেহের চোখে দেখার কারণে।

এর ফল হিসেবে ভারতের ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বেশি ছাড় দেয়ার বিষয়ে সবসময় অনেক বেশি উদ্বিগ্ন থাকে। তাদের মধ্যে বিরোধী দল ও ভোটার- উভয় পক্ষকে উসকানি দেয়ার মতো একটি ভয় ভালোমতো কাজ করে।

সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে পাকিস্তানের নতুন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে বিজেপি সরকার অনীহ বলেই মনে হচ্ছে। এর পেছনের ভয়টি হল, কোনো ধরনের সংলাপ বা সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়া হলে তাকে পাকিস্তানের প্রতি ‘সুর নরম’ করা হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারের ওপর হামলে পড়তে পারে বিরোধীরা।

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আলোচনার জন্য কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন; কিন্তু সেগুলো বারবার ভারতের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এর থেকে মনে হচ্ছে, পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা নয়- বিজেপি সরকারের আগের এ অবস্থান এখনও বজায় রাখা হচ্ছে।

এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে, মে মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কোন্নয়নের সম্ভাবনা একেবারেই কম। দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্ক ক্রমাগত তীব্র সন্দেহ ও শত্রুতার বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।

এ বিষয়গুলো আরও খারাপের দিকে চলে যায় ভারতের মিডিয়া হাউসগুলোর কারণে। ভারতের বেশিরভাগ গণমাধ্যম পাকিস্তানবিষয়ক বিতর্কে সবসময় বিদ্রূপে ভরপুর থাকে। এ ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম ও কৌশলী বর্ণনা এবং যৌক্তিক আলোচনার অভাব থাকে। পাকিস্তান সংক্রান্ত নয়াদিল্লির নীতি প্রায়ই রাখঢাক না করেই পাকিস্তানবিরোধী বাগাড়ম্বরে ভরপুর থাকে।

সাধারণ নির্বাচনে প্রতিযোগিতার জন্য শাসক দলবিরোধী মনোভাবের লাগাম টেনে ধরার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সরকারি দল বিজেপি খুবই সতর্ক। এটি করার একটি পদ্ধতি হচ্ছে মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মনোভাব উসকে দেয়া। পাকিস্তান পৃষ্ঠপোষিত সন্ত্রাসবাদ দমনে নিজেদের নেয়া সামরিক পদক্ষেপগুলো ব্যাপক প্রচারের ক্ষেত্রে সরকারের আগ্রহ থেকে বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একটি পরিপত্র জারি করে, যেখানে সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বরকে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ডে’ হিসেবে উদ্যাপনের জন্য। এটি করা হয়েছিল ২০১৬ সালে পাকিস্তান অধিকৃত বা আজাদ কাশ্মীরে ভারতের সামরিক বাহিনীগুলো কর্তৃক পরিচালিত জঙ্গি নির্মূলের বিশেষ অভিযানের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসার জন্য।

এর কয়েক মাস আগে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ঘোষণা করেছিল, জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে জোট সরকারের শরিক দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেয়া হবে। এর প্রধান একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল কাশ্মীর উপত্যকায় জঙ্গি হামলা বৃদ্ধির বিষয়টিকে।

এটি অনিবার্যভাবেই পাকিস্তানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়। কারণ হামলাগুলো পরিচালনা করে সীমান্ত পেরিয়ে আসা প্রশিক্ষিত জঙ্গিরা। এ সিদ্ধান্ত আবারও এমন একটি প্রতিকৃতি এঁকে দেয় যে, নীতিগতভাবে দেশের বৃহৎ জাতীয় স্বার্থকে মনে রাখছে বিজেপি।

ভারতের শাসক দলগুলোর জন্য তাদের সরকারের শেষ মাসগুলোতে পাকিস্তানের সঙ্গে বড় ধরনের সংযোগ-সংশ্লিষ্টতা একটি ঝুঁকির বিষয়। রাওয়ালপিন্ডির প্রতি সন্দেহ এবং ইসলামাবাদের প্রতি আস্থার ঘাটতির বিষয়টি মাথায় রেখে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় স্থিতিশীল অবস্থা নষ্ট করার মতো বড় ধরনের কোনো কাজ করবে না।

ভারতে কোনো সন্ত্রাসী বা জঙ্গি হামলার পাল্টা জবাব দেয়ার সময় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো পদক্ষেপকে বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যাতে করে শাসক দলের ভোট কমে যায়। এ আশঙ্কার কারণে শাসক দল এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকছে; মাথায় রাখছে কারগিল হামলা এবং ২০০১ সালের পার্লামেন্ট ভবনে হামলার শিক্ষাকে।

দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

নাদিম আহমেদ মুনাকাল : কায়রোর আরব-ওয়েস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং সেন্টারের সাবেক গবেষণা ইন্টার্ন

মানসাভি শঙ্কর শর্মা : আইএইচএস মারকিট-এর সাবেক গবেষণা ইন্টার্ন

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×