একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে পাকিস্তান

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  তাহা সিদ্দিকী

এক বছর আগে পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী করাচিতে নাকিবুল্লাহ মেহসুদ নামে এক তরুণকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়। পুলিশ প্রাথমিক পর্যায়ে দাবি করেছিল, মেহসুদ ছিলেন ‘কট্টরপন্থী পাকিস্তানি তালেবানের একজন সদস্য’ এবং সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানায় রেইড দেয়ার সময় তিনি নিহত হন।

কিন্তু তার পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং কিছু মানবাধিকার সংস্থা এমন দাবির বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিল, মেহসুদ ছিলেন একজন নিরপরাধ দোকানদার এবং মডেল হওয়ার আকাক্সক্ষা পোষণকারী।

সরকার এ বিষয়ে একটি তদন্তের আদেশ দিয়েছিল। অনুসন্ধানকারী পুলিশ কমিটির তদন্তে কোনো ধরনের বন্দুকযুদ্ধ বা সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং তদন্ত কমিটি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, মেহসুদকে ‘ভুয়া বন্দুকযুদ্ধ’র মাধ্যমে পুলিশ হত্যা করেছে।

এ ধরনের ঘটনায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জড়িত থাকার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। মেহসুদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে এবং বিচার কার্যক্রমটি এখনও চলমান।

এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগগুলোকে অতীতে প্রতিনিয়ত কর্তৃপক্ষ এড়িয়ে যেত এবং নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে দায়মুক্তির সঙ্গে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দেয়া হতো।

মেহসুদের হত্যাকাণ্ডকে যে বিষয়টি ভিন্ন রূপ দিয়েছে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সরকারকে বাধ্য করেছে তা হল ওয়াজিরিস্তানে তার নিজ শহর মাকিনের স্বল্প পরিচিত একটি আন্দোলন- পশতুন তাহাফফুজ মুভমেন্ট বা পিটিএম।

আফগানিস্তানের সঙ্গে লাগোয়া পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে বেশির ভাগ বসবাসকারী পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী পশতুনদের নানা বঞ্চনা-ক্ষোভ তুলে ধরতে পিটিএম আন্দোলনটি শুরু করেন মানবাধিকার কর্মী মানজুর পাশতিন। দুই দশক ধরে পশতুনদের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’র জ্বলন্ত অঙ্গারে পরিণত করা হয়েছে।

৯/১১ হামলার পর যখন যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র দেশগুলো আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, তখন সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সদস্যরা দেশটির সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পাকিস্তানের ভেতরে পশতুনদের আবাসস্থলে আশ্রয় নেয়। এর জবাবে ‘সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে এলাকাটি মুক্ত’ করার জন্য অভিযান পরিচালনা শুরু করে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী।

যা হোক, সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করার চেয়ে ওই এলাকায় সামরিক অভিযানগুলো ক্রমবর্ধমান হারে নির্দোষ মানুষকে পরিস্থিতির শিকার বানানো শুরু করে। একই সঙ্গে পাকিস্তানজুড়ে পশতুনদের সন্ত্রাসীর ছাঁচে ফেলা শুরু হয়, যদিও তারা নিজেরাই সন্ত্রাসবাদের বাজে শিকারে পরিণত হয়ে গেছে।

ন্যায়বিচারের দাবি : করাচিতে মেহসুদ হত্যার পর মানজুর পাশতিন ওয়াজিরিস্তান থেকে ইসলামাবাদের দিকে একটি রোডমার্চ আহ্বান করেন। তার সঙ্গে হাজারও মানুষ যোগ দেয় রাজধানীর দিকে, যাদের সবার দাবি কেবল নিহত ব্যক্তির পক্ষে ন্যায়বিচারই ছিল না, একই সঙ্গে পাকিস্তানজুড়ে বৈষম্যের শিকার সব পশতুনের জন্য ন্যায়বিচারও চেয়েছেন তারা।

এ মার্চ দ্রুততার সঙ্গে দেশব্যাপী অধিকার আন্দোলনের রূপ নেয় এবং পিটিএম জন্মলাভ করে। পাকিস্তানজুড়ে আয়োজিত র‌্যালিগুলোতে পাশতিন ও তার সমর্থকরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তাদের অঞ্চল থেকে জঙ্গিদের তাড়িয়ে দিতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ব্যর্থ হচ্ছে, এর পেছনের কারণ কী?

তারা আরও প্রশ্ন তুলেছে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ কি সত্যিকারার্থেই এ ধরনের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়? তারা সাধারণত যেসব স্লোগান ব্যবহার করে তার মধ্যে একটি ছিল- ‘এ সন্ত্রাসবাদের পেছনে সামরিক উর্দি রয়েছে’। এর অর্থ হচ্ছে সন্ত্রাসী ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগের অভিযোগ তুলছেন তারা।

এছাড়াও পিটিএম সব ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে এবং বলপূর্বক গুম-অপহরণের চর্চা বন্ধ করার দাবি তুলেছে। যা হোক, মানজুর পাশতিন ও তার সমর্থকরা ড্রাকোনিয়ান আইন সংস্কারের জন্য পাকিস্তান সরকারকে চাপ দেয়া শুরু করেছে।

এ আইনটি দিয়ে উপজাতিদের শাসন করা হয় যাতে মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন হয়। যেমন- সমষ্টিগত দায়বদ্ধতা, যা ব্যবহার করে পাকিস্তান রাষ্ট্র স্থানীয় উপজাতিগুলোর বিরুদ্ধে। এতে একজন ব্যক্তির অপরাধের জন্য তার পুরো পরিবার, গ্রাম, এমনকি পুরো গোত্রকে শাস্তি দেয়া হয়।

ক্রমবর্ধমান এ আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকাশিত প্রকৃত সমস্যাগুলো সমাধানের পথে না গিয়ে পাকিস্তান সরকার বরং ক্র্যাকডাউন তথা দমনপীড়নের পথে চলতে শুরু করেছে।

পাকিস্তানি মিডিয়া এ আন্দোলনের কর্মসূচির বিষয়ে খবর প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে। আন্দোলনটির অনেক নেতা, কর্মী ও সমর্থককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। যেখানে তারা শোভাযাত্রা করতে চান পাকিস্তানের এমন অংশগুলোতে পিটিএম নেতাদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।

এমনকি সম্প্রতি আন্দোলনটির কিছু নেতার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সামরিক বাহিনীর মিডিয়াবিষয়ক মুখপাত্র অভিযোগ করেছেন, পিটিএম মূলত বিদেশি শত্র“ সরকারগুলোর সহায়তায় পাকিস্তানবিরোধী এজেন্ডার ওপর কাজ করছে।

অবশ্য এটি এমন একটি কৌশল, যা পাকিস্তান সামরিক বাহিনী সমালোচকদের অবিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য প্রায়ই ব্যবহার করে।

কিন্তু পিটিএম আন্দোলনকে চুপ করানো ও দাবিয়ে রাখার চেষ্টা উল্টো ফল দিয়েছে। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হয়রানির ফলে পিটিএম আরও বেশি আকর্ষণ তৈরি করছে এবং এর সমাবেশগুলো একের পর এক বৃহদাকার ধারণ করছে।

যেখানে আন্দোলনটিকে সবসময় অসহিংস বলে দাবি করা হয়েছিল, সেখানে এখন ভয় হচ্ছে, সরকারের প্রতিনিয়ত শক্ত হাতে দমনকৌশল এমন ফল বয়ে আনতে পারে যাতে এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। যেমনটি পাকিস্তানে আগেও দেখা গেছে।

ভুল থেকে শিক্ষা : অতীতে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) বাসিন্দাদের একই ধরনের আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনের সর্বোচ্চ সীমায় গিয়ে পৌঁছে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ বের করে দেয়। ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানে বাস করা বাঙালি জনগণ তথা ওই সময়ে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী জেনারেল আইয়ুব খানের কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলা-বৈষম্যের শিকার হওয়ার বিষয়টি অনুভব করে।

বাঙালি জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ-অসন্তোষের কথা শোনা ও সমাধান করার বিপরীতে মানুষের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল সামরিক বাহিনী। ফলে বাঙালিরা সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করলে পাকিস্তান ভেঙে যায় ও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। প্রায় ৫০ বছর পর মনে হচ্ছে পাকিস্তানের এলিট শাসকগোষ্ঠী ইতিহাস থেকে তেমন কিছু শেখেনি এবং মনে হচ্ছে তারা একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে।

আজ যেহেতু পিটিএম সংগ্রামের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে, পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হচ্ছে পশতুন জনগণের উদ্বেগ দূর করা, তাদের দাবি পূরণ করা, যার সব পাকিস্তানের সংবিধানের আওতায় পূরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া নিজেদের মৌলিক অধিকারের দাবি করছে যেসব মানুষ, অবিলম্বে তাদের হয়রানি-নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে। যদি এমনটি করা না হয় তবে পিটিএম এরই মধ্যে বিভক্ত জাতির ভাঙনের অনুঘটক হবে এবং পাকিস্তান সম্ভবত আরেকটি জাতীয় বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হবে।

আলজাজিরা থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

তাহা সিদ্দিকী : ফ্রান্সে নির্বাসিত প্রখ্যাত পাকিস্তানি সাংবাদিক