ব্রেক্সিট : কর্পোরেট বনাম জাতীয় পুঁজি

  সাজ্জাদ আলম খান ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বেক্সিট

ব্রেক্সিট ইস্যুতে দৃষ্টি এখন যুক্তরাজ্যের দিকে। ব্রিটেনের রাজনীতি এখন উত্তাল হয়ে পড়েছে। তবে প্রত্যাশিত ফলাফলেই শেষ হয়েছে ব্রেক্সিট চুক্তির ওপর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ভোট। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পৌঁছনো প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র চুক্তির ভরাডুবি ঘটেছে। এটি শুধু রাজনৈতিক নয়, মূলত অর্থনৈতিক ইস্যু।

ব্রিটেনের জাতীয় পুঁজির সঙ্গে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের লড়াই চলছে অন্দরমহলে। আর সদরে দেখা যাচ্ছে তার রাজনৈতিক সমীকরণ। ট্রাম্পের অর্থনৈতিক দর্শন, শি জিনপিংয়ের নীতি মূলত তাদের জাতীয় পুঁজির বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। এর ধাক্কা এসে পড়েছে টেমস নদীর পাড়েও। জাতীয় পুঁজির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ব্রিটেনের রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশ। আর তাতে সায় দিয়েছে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। কিন্তু প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

ব্রেক্সিট চুক্তিটি অনুমোদন না পাওয়ায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে অর্থনীতি ও বাণিজ্য নিয়ে শঙ্কিত এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। বিপুল ব্যবধানে চুক্তি প্রত্যাখ্যান ১৯২০ সালের পর ব্রিটিশ সরকারের সবচেয়ে বড় পরাজয়। তেরেসা মে’র ব্রেক্সিট চুক্তিটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ৪৩২ এমপি; আর পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২০২ জন। ভোটের পর ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হচ্ছে পাউন্ড। ভোটের দিন দুপুর পর্যন্ত পাউন্ডের মান স্থিতিশীল থাকতে দেখা যায়।

তবে দুপুরের পর পাউন্ডের ওপর চাপ বাড়তে থাকে এবং ভোট চলাকালে ডলারের বিপরীতে ১ দশমিক ২৪ শতাংশ মান হারায় পাউন্ড। তবে ব্রেক্সিট চুক্তিটি প্রত্যাখ্যানের পক্ষে ভোটের এক ঘণ্টার মধ্যে ডলারের বিপরীতে হারানো মান ফিরে আসে। ব্রেক্সিট চুক্তি অনুমোদন না করায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। ব্যবসা রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যোগী হয়ে উঠছে দেশগুলো। চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের অন্যতম সমালোচক জাপান।

ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে স্বচ্ছতার দাবি তুলবে দেশটি। গত বছর যুক্তরাজ্য ও জাপানের মধ্যে ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। এছাড়া যুক্তরাজ্যে জাপানের কোম্পানিগুলোতে ১ লাখ ৫০ হাজার কর্মী রয়েছে। চুক্তিহীন ব্রেক্সিট এ সবকিছুকেই অনিশ্চিত করে তুলবে। দক্ষিণ কোরিয়া ব্রিটেনের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রক্ষার প্রচেষ্টা করছে।

উল্লেখ্য, ব্রিটেনে ১০০টির বেশি দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানির কার্যক্রম রয়েছে এবং দুই পক্ষের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৪০ কোটি ডলার। পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বসেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার। অস্ট্রেলিয়ার অনিশ্চিত ব্রেক্সিটের কারণে স্থানীয় ব্যবসাগুলো সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

ব্রিটেন যেসব বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ইইউতে নানা সুবিধা পাচ্ছিল, তা হারিয়ে যাবে। অনুরূপভাবে ব্রিটেনে পাওয়া সুবিধা হারাবে ইইউ। নানা ইস্যুতে আবার দেন-দরবার করে নতুন চুক্তি করতে হবে। আর সেগুলো করতে হবে আলাদা আলাদা করে। ব্রেক্সিটের বিপক্ষে কর্পোরেট পুঁজির সমর্থকরা মনে করেন, হঠাৎ এভাবে বের হয়ে গেলে ব্রিটেনে বিভিন্ন পণ্যের সংকট দেখা দেবে। ইইউ থেকে আসা পণ্যের দামও বাড়বে। ইইউর বাজারে একধরনের ছেদ পড়বে। এতে অবশ্য স্থানীয়ভাবে সক্ষমতা তৈরির একটা সুযোগ তৈরি হবে, যা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

ব্রেক্সিট হলে অভিবাসন ইস্যুতে নিজের মতো আইন করতে পারবে যুক্তরাজ্য। এতদিন অভিবাসন বিষয়ে ইইউর যে নীতিমালা ছিল সেগুলো মানতে হতো ব্রিটেনকে। যুক্তরাজ্যে কর্মরত ইউরোপের অন্য দেশের অভিবাসীদের সম্পর্কে বিরূপ মনোভাবের কারণেই অনেকে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ওইসব নাগরিক তাদের কাজ দখল করে নিচ্ছে বলে তাদের অনেকেই অপছন্দ করেন।

ব্রিটেনের সোসাইটি অব মোটর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স মনে করে, যথাযথ চুক্তি ছাড়া যদি যুক্তরাজ্য ইইউ ত্যাগ করে, তবে ব্রিটিশ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হবে। গত নভেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে এসেছে। বাণিজ্য যুদ্ধ ও ব্রেক্সিট ইস্যুতে ম্যানুফ্যাকচারার্স খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নতুন করে প্রচার করা হচ্ছে, ব্রেক্সিট হলে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের কী হবে? ইইউ দেশগুলোতে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ও কোম্পানিগুলো কী ধরনের সুবিধা পাবে? ইইউর সদস্য দেশগুলোতে যারা ব্যবসা করছেন তাদের জন্য বাড়তি আমদানি-রফতানি কর আরোপ হতে পারে। কৃষকদের জন্য কর ৬০ শতাংশ হতে পারে। ব্রিটেন যেসব বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ইইউ দেশগুলোতে নানা সুবিধা পাচ্ছিল, সব সুবিধা হারাবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জানিয়েছে, ব্রিটেন যদি নিজেদের অনুকূলে যথাযথ ব্রেক্সিট চুক্তি করতে না পারে তবে ২০১৯ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি কমে হবে প্রায় ১.৫ শতাংশ। যা জার্মানি ও ফ্রান্সের চেয়ে কম হবে। আইএমএফ অ্যাডভোকেসি করছে, ইউরোপে অভিন্ন বাজার অটুট থাকুক। দফায় দফায় এ বহুজাতিক সংস্থাটি বলছে, ইইউ ও যুক্তরাজ্য চুক্তি করতে ব্যর্থ হলে অর্থনীতি নিশ্চিতভাবে সংকুচিত হবে।

ব্রিটেন এখন যে একক বাজারের সুবিধা উপভোগ করছে, ব্রেক্সিট হয়ে গেলে তা আর পারবে না। সে ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে খরচ বেড়ে যাবে। কারণ তখন বাণিজ্য আর সরাসরি থাকবে না। ফলে নতুন সম্পর্কে বাণিজ্যিক বাধা যত থাকবে খরচও তত বাড়বে। আইএমএফ এ আশঙ্কা তুলে ধরে চালাচ্ছে প্রচারণা।

ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছে- এ আশঙ্কা থেকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন ইউরোপ নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তা করছে। এ ধরনের চিন্তাভাবনা মূলত একধরনের চাপ তৈরি করা, যাতে ব্রেক্সিট চুক্তি না করা হয়। লন্ডনকে ইউরোপে ব্যবসা সম্প্রসারণের হাব হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

প্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হতো লন্ডনে। কিন্তু ২০১৬ সালে এক গণভোটে ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত হওয়ায় এখন সেই বিনিয়োগ চলে যাচ্ছে বার্লিন, প্যারিস ও রোমের দিকে। অথচ প্রযুক্তি স্টার্ট-আপসের জন্য ইউরোপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় শহর লন্ডন। কিন্তু ব্রেক্সিট ঘনিয়ে আসায় এ খাতে বিনিয়োগ কমছে।

২০১৮ সালে প্রযুক্তি ব্যবসায় বিনিয়োগ হয় ১.৮ বিলিয়ন পাউন্ড, যা ২০১৭ সালের চেয়ে ৩০ শতাংশ কম। তবে ২০১৮ সালে লন্ডনের এ বিনিয়োগ এখনও ইউরোপীয় অন্য শহরের চেয়ে দ্বিগুণ। প্রযুক্তি স্টার্ট-আপস বিনিয়োগের দিক থেকে ইউরোপে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বার্লিন। ব্রিটেন ইইউ ত্যাগ-পরবর্তী দেশটির অর্থনীতিতে কী ক্ষতি হতে পারে, এ নিয়ে হিসাব কষছেন নীতিনির্ধারকরা।

ব্রিটেনের আর্থিক সেবামন্ত্রী জন গ্লেন বলেন, ইইউ ত্যাগ করার পরও যাতে আর্থিক খাতের একটি বৃহৎ কেন্দ্র হিসেবে লন্ডন ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য যা দরকার সবই তিনি করবেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মার্চে ব্রিটেন ইইউ ত্যাগ করার পর আর্থিক খাত থেকে পাঁচ হাজার চাকরি ইউরোপে চলে যাবে। তবে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো হুমকি দিলেও ব্যাপকভাবে অন্য শহরে চলে যায়নি।

ব্রেক্সিটের ধাক্কা বাংলাদেশেও এসে পড়বে। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পোশাক খাতে। যুক্তরাজ্যের ক্রেতারা দাম কমাতে অনেক চাপ দিচ্ছে। উদ্যোক্তাদের মতে, কমবেশি সব দেশের ক্রেতাই পোশাকের দাম কমাতে চাপ দিচ্ছে। তবে যুক্তরাজ্যের চাপটা একটু বেশি। ব্রেক্সিটের কারণে তাদের পাউন্ড দুর্বল হওয়ার কারণেই তারা পোশাকের দাম কমিয়ে বিষয়টি সমন্বয় করতে বলছে।

হিমায়িত মাছ রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছেন রফতানিকারকরা। ইউরোপে মন্দা এবং বেক্সিট ইস্যুতে যুক্তরাজ্য সংকটে পড়ায় সেখানকার বাজারে হিমায়িত মাছের চাহিদা কমে যায়। স্বাভাবিকভাবে দামও কমে যায়। রফতানি হওয়া মোট চিংড়ির ৮০ শতাংশই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে। উৎপাদনকারীরা উৎপাদন খরচের তুলনায় বেশি দাম পাচ্ছেন না। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চাষীরা গলদা চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছে বাংলাদেশ। কিন্তু যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে ওই সিদ্ধান্ত আর কার্যকর থাকবে না। শুধু তাই নয়, ব্রেক্সিটের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য, সহযোগিতা, আর্থিক লেনদেন, পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে। তার ধাক্কাও কিছুটা বাংলাদেশের আমদানি-রফতানিকারকদের ওপর পড়বে।

যুক্তরাজ্যে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি রয়েছে। এদের একটি বড় অংশ রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় জড়িত। তারা ছিলেন ইইউ ছাড়ার পক্ষে। ইইউ জোটে না থাকার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। কারণ তারা মনে করেন, ইইউ থেকে বের হয়ে গেলে বর্তমানের অভিবাসন নিয়ম শিথিল হবে এবং তারা বাংলাদেশ থেকে বেশি লোক নিতে পারবে।

সাজ্জাদ আলম খান : অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×