রোহিঙ্গা প্রশ্নে আমাদের আরও সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে

  একেএম শামসুদ্দিন ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা প্রশ্নে আমাদের আরও সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে
রোহিঙ্গা প্রশ্নে আমাদের আরও সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। ফাইল ছবি

‘ভারত কোনো খয়রাতি রাষ্ট্র না যে দাতব্যখানা খুলে বসেছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমস্যায় আমরা এমনিতেই জর্জরিত। ভারতের এমন কোনো দায় পড়েনি যে, রোহিঙ্গা মুসলিম উদ্বাস্তুদের ধরে রাখতে হবে। উচ্চ আদালত তো আমাদের পক্ষেই আছে। পাঠিয়ে দাও ওদের যেখান থেকে এসেছে।’ উক্তিটি হারিশ মারু নামের একজন ভারতীয় নাগরিকের। তিনি গত ৪ অক্টোবর আসামের এক ডিটেনশন সেন্টারে আটক ৭ জন রোহিঙ্গা মুসলমানকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়ে দেয়ার জন্য ভারতের সুপ্রিমকোর্টের চূড়ান্ত রায় প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উক্তিটি করেন।

উল্লেখ্য, সুপ্রিমকোর্টের রায়ের পর রোহিঙ্গা মুসলমানদের তাৎক্ষণিকভাবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ভারতে আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ব্যাপারে হারিশ মারুর মনোভাব ভারতের উচ্চ আদালতের রায়কে জাস্টিফাই করলেও এ মনোভাবের সঙ্গে অধিকাংশ ভারতীয় একমত পোষণ করেন কিনা আপাতদৃষ্টিতে তা বোঝা না গেলেও একশ্রেণীর মানুষের উগ্রবাদী মানসিকতা সম্পর্কে ধারণা করতে সমস্যা হয় না। তবে আদালতের এ রায়ে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী সব রোহিঙ্গা মুসলমান যে আতঙ্কগ্রস্ত তাতে দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে রাখাইনে মুসলমানদের ওপর হত্যাকাণ্ড শুরু হলে এই ৭ জন রোহিঙ্গা মুসলমান ভারতে পালিয়ে যায়। অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য ভারতীয় পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে আসামের শিলচর সেন্ট্রাল জেলের ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়। তারপর ওদের সেখানে একটানা ছয় বছর আটক রাখা হয়। ভারত অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের ধরপাকড় শুরু করেছে।

২০১৮ সালেই ২৩০ রোহিঙ্গা মুসলমানকে গ্রেফতার করা হয় এবং এ গ্রেফতারের ঘটনাগুলো ভারতের মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারও হতে থাকে। তাতে রোহিঙ্গারা আরও বেশি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এরই জেরে বিভিন্ন রাজ্যে আশ্রিত রোহিঙ্গারা এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পালিয়ে বেড়াতে শুরু করে। এমনকি তারা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের কিছু আলামত আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পেয়েছি।

এ সংক্রান্ত খবর যুগান্তরসহ অন্যান্য পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি। ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী অন্তত ৩০০ রোহিঙ্গা পরিবার বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ ৩০০ পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৩০০। এর মধ্যে ৭৪ জন রোহিঙ্গা হায়দারাবাদ, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মীর থেকে ত্রিপুরা হয়ে বাংলাদেশের কুমিল্লা ও ফেনী জেলায় এসে পৌঁছেছে। এরা সবাই ২০১২ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধন শুরু হলে ভারতে প্রবেশ করেছিল। বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর সবাইকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

গত অক্টোবরে ৭ জন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টে চূড়ান্ত শুনানিতে ভারতে অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ ও চাড়াল ডিসুজা এক যুক্তিতর্কে বলেছিলেন, মিয়ানমারে নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চলাকালে যে ৭ জন রোহিঙ্গা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠালে তারা পুনরায় সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থির মুখে পড়বে, এমনকি তাদের জীবনহানিও হতে পারে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে রোহিঙ্গাদের পাঠানোর মতো পরিবেশ মিয়ানমার সরকার এখনও তৈরি করতে পারেনি। এরপরও যদি তাদের সেখানে পাঠানো হয় তাহলে তা হবে ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ এবং ২১-এর সরাসরি লঙ্ঘন।

এখানে যে মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা শুধু রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্যই প্রযোজ্য নয়, ভারতে বসবাসরত সব ব্যক্তির বেলায়ও তা সমভাবে প্রযোজ্য। ভারত আন্তর্জাতিক সমঝোতা ও চুক্তির দ্বারা আবদ্ধ, অতএব এ চুক্তির বরখেলাপ করার কোনো সুযোগ নেই।

অপরদিকে মিয়ানমার সরকারও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পর তাদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। তারা আরও বলেন, ‘যেখানে বিশ্বসম্প্রদায় গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের বিচারের ব্যবস্থা করছে, সেখানে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারত সর্বপ্রথম বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ঠেলে দিয়ে পুনরায় নির্যাতনের শিকার হতে বাধ্য করছে।’

অপরদিকে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গা মুসলমানদের সঙ্গে নয়াদিল্লির এ পদক্ষেপে জাতিসংঘ ব্যাপক সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, বলপূর্বক ও ভীতসন্ত্রস্ত পরিস্থিতি তৈরি করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। রোহিঙ্গারা যে পরিমাণে জাতিগত বৈষম্যের শিকার হয়েছে, যে পরিমাণে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে তা স্বীকার করতে ভারতের আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা প্রদান করা তাদেরও দায়িত্ব। মিয়ানমারের নির্যাতনে এই পর্যন্ত আনুমানিক ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার উদ্বাস্তু ও আশ্রয়প্রার্থী জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থা কর্তৃক নিবন্ধিত হয়েছে।

৪ জানুয়ারি ইউএনএইচসিআর অভিযোগ উত্থাপন করে বলে, তাদের এজেন্সি রেজিস্টার্ডভুক্ত আরও ৫টি রোহিঙ্গা পরিবারকে ৩ জানুয়ারি ভারত জোরপূর্বক মিয়ানমারে ঠেলে ফেরত পাঠিয়েছে। তারা বলেন, এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় যে, আশ্রয়প্রার্থী রেজিস্টার্ডভুক্ত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ইউএনএইচসিআরের অনুরোধ ভারত বারবার উপেক্ষা করছে। ভারতের এহেন আচরণ আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু রক্ষার উদ্যোগ ও জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থার ম্যান্ডেটকে অগ্রাহ্য করার শামিল।

ভারতের অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও ১৪ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে উল্লেখ করে, আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে জোরপূর্বক বিতাড়ন করে ভারত আন্তর্জাতিক আইনকে অবজ্ঞা করছে। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী ইউএনএইচসিআর কর্তৃক যেসব রেজিস্টার্ডকৃত উদ্বাস্তু ও আশ্রয়প্রার্থীর পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র প্রদান করা হয়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সব রাষ্ট্রই তাদের গ্রেফতার, আটক কিংবা বিতাড়ন থেকে বিরত থাকে।

কিন্তু ভারত এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে তার একগুঁয়ে মনোভাব প্রকাশ করে চলেছে। ভারত শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়েই সমালোচনার মুখে পড়েনি, দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, সমাজসচেতন নাগরিক সংঘ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমালোচনা সহ্য করতে হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের চাপ ও নানামুখী সমালোচনার পরও ভারত কেন কথিত ৭ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে মিয়ানমারের হাতে হস্তান্তর করল? সন্দেহ নেই ভারত এই কাজটি খুব সচেতনভাবেই করেছে।

এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত সরকার তাদের দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা মুসলমানদের একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে। বার্তাটি হল, যে কোনো উপায়ে রোহিঙ্গাদের ভারত ছাড়তে হবে, তা না হলে জোরপূর্বক তাদের মিয়ানমারে পাঠিয়ে দেয়া হবে। ‘রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আদালতের রায়টি ভালোই কাজ করছে। জানা যায়, অক্টোবরে যে ৭ জনকে মিয়ানমারে পাঠানো হয়েছিল, তাদের হস্তান্তর করার পর তাদের ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বলে ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে।

হিউম্যান রাইট ওয়াচকে উদ্ধৃত করে মিডিয়াগুলোতে ডিটেনশন সেন্টারের নৃশংস অত্যাচারের চিত্রও ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছে। এসব খবরে ভারতে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ভেতর দ্রুত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে বেড়ানো শুরু করে। কারণ ভারত সরকার এসব রোহিঙ্গাকে রাজনৈতিক আশ্রয়ও দিচ্ছে না এবং একই সঙ্গে তাদের উদ্বাস্তু হিসেবেও স্বীকৃতি দিতে অনীহা প্রকাশ করে চলেছে।

ফলে রোহিঙ্গারা উভয় সংকটে পড়েছে। একদিকে ভারতের আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ভয়, অন্যদিকে নিজ বাসভূমে ফিরে যাবে তারও কোনো উপায় নেই। সুতরাং তৃতীয় অপশন হিসেবে বাংলাদেশে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর খোলা রইল না। অতএব এরই জের ধরে ১ হাজার ৩০০ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ।

এখন বাংলাদেশের করণীয় কী? ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার মনে করে আমরা কি চুপ করে বসে থাকব? অভিজ্ঞতা বলে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত যতটা না কঠোর, ভারতের প্রতি বাংলাদেশ ততটাই নমনীয়।

এখন পর্যন্ত আমরা ভারত থেকে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা মুসলমানের ব্যাপারে ন্যূনতমপক্ষে ভারতের কাছে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানানোর কোনো উদ্যোগ লক্ষ করলাম না। এখন একমূহূর্তও নষ্ট না করে ভারত প্রত্যাগত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা ভারতকে সরাসরি জানিয়ে দেয়া উচিত। ভবিষ্যতে যাতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য ভারতকে অনুরোধ করতে হবে।

বোঝা গেছে, ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যস্ত থাকায় ভারত এ সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে। এখন থেকে আমাদের সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। আশার কথা, কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ ও বিজিবির কর্মকর্তাও একই মত পোষণ করেন বলে খবরে বেরিয়েছে।

এজন্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যে, একবার যদি ভারত এ কৌশল প্রয়োগে সাফল্য পেয়ে যায়, তাহলে জাতীয় নিবন্ধীকরণ তালিকায় বাদ পড়া আসামের বাঙালি মুসলমানদের বিতাড়নের পথটি তাদের জন্য সহজতর হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে ভবিষ্যতে ভারতের যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখার জন্য আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করে রাখতে হবে। সময় গড়িয়ে যাওয়ার আগেই যদি আমরা তা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে এর ভয়াবহ পরিণতি বাংলাদেশকেই ভোগ করতে হবে।

১৯ জানুয়ারি ২০১৯

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×