স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার চাই

  মুনীরউদ্দিন আহমদ ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার চাই
প্রতীকী ছবি

বিশ্বজুড়ে রোগ-বালাই, অসুখ-বিসুখ, ভোগান্তি ও মৃত্যুর অন্যতম কারণ সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে সর্বস্তরের মানুষকে মুক্ত করতে হবে। আমাদের মতো অনুন্নত দেশগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু ব্যয় অত্যন্ত নগণ্য হওয়ার কারণে জনগণকে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা যায় না। তাই দারিদ্র্যের কারণে প্রতি বছর আমাদের দেশে রোগাক্রান্ত হাজার হাজার লোক মৃত্যুবরণ করে।

রোগ-প্রতিরোধ, প্রতিকার, ওষুধ, ওষুধের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসম্মত জীবন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে অনুন্নত ও দরিদ্র দেশে মানুষের অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা-কুসংস্কার স্বাস্থ্য উন্নয়নের অন্য এক বড় প্রতিবন্ধক। স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবন সম্পর্কে মানুষের পর্যাপ্ত সাধারণ জ্ঞান, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের লাখো-কোটি মানুষ স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবার গ্রহণ করে। এটি একটি বড় ধরনের জাতীয় সমস্যা। স্বল্পমূল্য ও মুখরোচক বলে এ ধরনের খাবার বেশ জনপ্রিয়। সকাল থেকেই শহরের রাস্তার ধারে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান বসে যায়। ব্যয়বহুল রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায় না, এমন অনেক খাবারও এসব দোকানে পাওয়া যায়। ঢাকায়ও রাস্তার ধারে এখন স্ট্রিট ফুডের পসরা সাজিয়ে বসতে দেখা যায়। নগরীর অনেক এলাকায় রাস্তার খাবারের অস্থায়ী দোকান বসে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব দোকান খোলা থাকে। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ঝালমুড়ি, ফুচকা-চটপটির দোকান তো আছেই। বিদেশের রাস্তার খাবারের সঙ্গে বাংলাদেশের রাস্তার খাবারের পার্থক্য এই যে, বিদেশে এসব খাবার তৈরি ও পরিবেশন করা হয় স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে। কিন্তু বাংলাদেশে এসবের বালাই নেই।

গত ৫ নভেম্বর সরকারের জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে খাদ্যদ্রব্যে রাসায়নিক দূষণ ও জীবাণু সংক্রমণ বিষয়ে এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯০ শতাংশ রাস্তার খাবারেই ই-কোলাই, সালমোনিলা ও ইস্ট মোল্ডের মতো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জীবাণু পাওয়া গেছে। ঢাকা শহরের ৯০ শতাংশ ফুচকা ও ঝালমুড়িতে রয়েছে টাইফয়েডের জীবাণু। ঢাকা শহরের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ভেলপুরি, ফুচকা ও ঝালমুড়িতে কলেরার জীবাণু ই-কোলাইর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও পরীক্ষায় দেখা গেছে, ফুচকায় শতভাগ, ভেলপুরির নমুনায় ৭৫ শতাংশ, ঝালমুড়ি ও আচারের নমুনায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় ইস্ট পাওয়া গেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের ৪৬টি থানায় অবস্থিত স্কুলের সামনের দোকান থেকে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ঝালমুড়ি, ফুচকা, ভেলপুরি ও আচারের সংগৃহীত নমুনার মাইক্রোবায়লোজিক্যাল পরীক্ষায় ঈস্ট ও মোল্ড, কলিফর্ম, সালমোনিলা, ই-কোলাই’র উপস্থিতি পাওয়া যায়। এসব খাবারে কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয়। ইস্ট, ই-কোলাই, কলিফর্ম, মাইকোটক্সিন, সালমোলিনার মতো জীবাণু শরীরের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাস্তার খাবার নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে জাতীয় স্বাস্থ্য উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

বিশুদ্ধ পানি স্বাস্থ্যের জন্য অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। দূষিত পানি পান করার ফলে সংক্রামক রোগে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাবে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিসের মতো মারাত্মক রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর কয়েক লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে। শুধু ডায়রিয়াতে বিশ্বে প্রতিবছর চল্লিশ লাখ শিশু মারা যায়। বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানুষ বিশুদ্ধ পানি এবং অর্ধেক মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহারের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা বিধান স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য সরকারের প্রথম ও প্রধান জাতীয় প্রায়োরিটি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

এবার অতি সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। গত কিছুদিন আগে রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশ করা ‘প্রমিজিং প্রগ্রেস : এ ডায়াগনস্টিক অব ওয়াটার সাপ্লাই, স্যানিটেশন, হাইজিন অ্যান্ড প্রোভার্টি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়- পানি ও স্যানিটেশনের সুযোগে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করলেও সব ধরনের পরিশোধিত পানির ৪১ শতাংশের মধ্যেই ক্ষতিকর জীবাণু কোলাই রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জর্জ জোসেপ এ তথ্য উপস্থাপন করে বলেন, এতে অন্ত্রে উচ্চমাত্রার দূষণের প্রমাণ মেলে। তিনি জানান, শহরের ৫২ শতাংশ ও গ্রামের মাত্র ২৭ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পাইপলাইনে পানির ব্যবস্থা আছে। সেখানে স্বল্পতা আছে সাবান ও স্যানিটেশনের সুযোগের। প্রতিবদনে আরও বলা হয়, গৃহস্থালিতে স্যানিটেশন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে এখনও সেই সুবিধা তৈরি হয়নি।

সংক্রামক রোগের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়বেটিস, ক্যান্সার জাতীয় অসংক্রামক প্রাণঘাতী রোগের উৎপত্তি, বিস্তার, কার্যপ্রণালী, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সম্পর্কে ইতিমধ্যে বেশকিছু অগ্রগতি অর্জন করলেও তা এখনও সীমিত পর্যায়েই রয়ে গেছে বলে আমরা মনে করি। কারণ এসব রোগের মৃত্যুহার মোটেই হ্রাস করা যাচ্ছে না; বরং দিন দিন বাড়ছে বলেই পরিসংখ্যান তথ্য দিচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আনাচে-কানাচে ক্যান্সার, হার্ট অ্যাটাক, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়বেটিস ও ডিমেনশিয়ার মতো জটিল ও প্রাণঘাতী রোগে মৃত্যুহার কমাতে হলে আমাদের লাইফস্টাইল পরিবর্তন করতে হবে এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিহার করে ব্যায়ামসহ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করার জন্য সরকার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এগিয়ে আসতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর সেরিন জুমা বলেন, বৈশ্বিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে এ প্রতিবেদন। পানির দূষণ ও নিুমান এবং স্যানিটেশনের বাজে অবস্থা অনেক অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তিনি বলেন, সহস াব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি হিসাব দিয়েছিল- বৈশ্বিকভাবে পানি ও স্যানিটেশনে নিশ্চিতে যদি ১ ডলার খরচ করা হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ওটার বিপরীতে লাভ আসবে ৫ ডলার।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য উন্নয়নের অন্য একটি প্রধান অন্তরায় দেশে মহিলাদের অপরিকল্পিত ও অসময়ে গর্ভধারণ, গর্ভপাত, গর্ভকালীন জটিলতা, গর্ভাশয়ের সংক্রামণ, প্রসবকালীন মৃত্যু ইত্যাদি। এসব সমস্যার কারণে আমাদের দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার নারীর স্বাস্থ্যহানি ও মৃত্যু ঘটে। মায়েদের এরকম মৃত্যুর কারণে পুরো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদগ্রস্ত হয়। বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোয় প্রতিবছর ৬ লাখ নারী এসব কারণে মৃত্যুবরণ করে। একটু সতর্ক হলে ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিলে এ মৃত্যুর হার বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। অন্যান্য অনুন্নত দেশের মতো বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার অত্যন্ত কম। এসব দেশে বাল্যবিয়ে ও অধিক সন্তান জন্ম দেয়ার প্রবণতা স্বাস্থ্য উন্নয়নের আর এক অন্তরায়।

ইউনিসেফের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মেয়েদের বাড়তি এক বছর স্কুলে পাঠালে সন্তান ধারণের হার পাঁচ থেকে দশ শতাংশ কমে আসে এবং তাদের আয় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। শিক্ষিত মায়ের সন্তানরা বেশি বাঁচে ও স্বাস্থ্যবান হয়। আমাদের মতো দেশে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষাপ্রাপ্ত মহিলাদের ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর হার অশিক্ষিত মহিলাদের শিশুমৃত্যু হারের অর্ধেক। সুতরাং মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে হবে, শিক্ষিত করে তুলতে হবে এবং বাল্যবিয়ে ও অধিক সন্তান জন্মদানের কুফল সম্পর্কে মহিলাদের সচেতন করে তুলতে হবে।

এক সময় মানুষ গ্রামে বসবাসে বেশি আগ্রহী ছিল। জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এখন শহরমুখী হয়ে পড়েছে। আগামী শতাব্দীতে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ গ্রামের চেয়ে শহরে বসবাসে বেশি উৎসাহী হবে। এতে করে শহুরে জীবনের ওপর চাপ বাড়বে। শহরের পরিবেশ বিপন্ন ও বিপর্যস্ত হবে। অনুন্নত দেশের শহরগুলোয় এ অবস্থা ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার বর্তমান অবস্থা চিন্তা করা যেতে পারে। শহরের দূষিত পরিবেশের কারণে নগরবাসীর স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণে এখনই সুষ্ঠু ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আগামী দিনে এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে।

এ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও শব্দদূষণের শিকার হচ্ছে শিশুরা। কোলাহল ও গাড়ির হর্ন প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুদের অধিক ক্ষতি করছে। এতে করে শিশুদের পড়াশোনায় অসুবিধা হচ্ছে, শ্রবণশক্তি কমে যাচ্ছে, মনোযোগ প্রদানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আচার-আচরণে পরিবর্তন আসছে, উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের হার বাড়ছে, আইকিউ কমে যাচ্ছে। এসব ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হলে নগরে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণ ও শব্দদূষণ বন্ধের কোনো বিকল্প নেই। তাই নগরের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।

কিছু কিছু রোগ জাতীয় সমস্যারূপে আবির্ভূত হয়। এসব রোগ নির্মূলে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এসব রোগের মধ্যে রয়েছে, পোলিও, কুষ্ঠ, ধনুস্টঙ্কার, হাম, ডিপথেরিয়া ইত্যাদি। এসব রোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে জাতীয় স্বাস্থ্য উন্নয়নে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়। ইতিমধ্যে পৃথিবী থেকে বসন্ত এবং আমেরিকা থেকে পোলিও নির্মূল হয়ে গেছে।

আমাদের দেশে অপুষ্টি আরও এক সমস্যা। অপুষ্টির কারণে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বিনষ্ট হয়। ফলে মানুষ বহু সাধারণ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অপুষ্টিতে ভুগছে- এমন শিশুরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে অতি সহজে মৃত্যুবরণ করতে পারে। শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে বাংলাদেশের মতো অনুন্নত বিশ্বে প্রতিবছর লাখ লাখ শিশু অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে দেশে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবজনিত শূন্যতা পূরণে জাতীয় প্রকল্প গ্রহণ করা একান্ত আবশ্যক।

প্রত্যেক জাতির জন্য তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা আবশ্যক। রোগ, রোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকার, ওষুধ ও ওষুধের যুক্তিসঙ্গত প্রয়োগ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে মানুষকে পরিপূর্ণভাবে তথ্য সরবরাহ করা বাঞ্ছনীয়। জ্ঞানই শক্তি। এ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের মাধ্যমে জাতীয় স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখতে পারে। চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, ওষুধ কোম্পানিগুলোর মানুষকে স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবন সম্পর্কে সচেতন করে তোলার ব্যাপারে সক্রিয় হওয়া দরকার।

সমাজ ও জাতিকে সুসংগঠিত করতে হবে। সুসংগঠিত জাতি অল্পব্যয়ে বেশি উপকার পেতে পারে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণ জাতীয় স্বাস্থ্যর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও উপকারী শর্ত। পরিপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত স্বাস্থ্য ও ওষুধনীতি প্রণয়নের ফলে জাতি সীমিত সম্পদ দিয়ে বেশি মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে পারে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণ ও অনাবশ্যক, ক্ষতিকর ওষুধের উৎপাদন ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করা হলে জাতীয় সম্পদের সাশ্রয় ছাড়াও ব্যক্তি ও জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়।

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার অতি জরুরিভাবে রোধ করা দরকার। অ্যান্টিবায়োটিকের ঢালাও অপব্যবহারের ফলে জনস্বাস্থ্য আজ হুমকির সম্মুখীন। অ্যান্টিবায়োটিকের নির্বিচার অপপ্রয়োগের ফলে জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে এমন সময় আসতে পারে, যখন সংক্রামক রোগ প্রতিকারে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে মানুষের জীবন বিপন্ন হবে। সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ করা আবশ্যক। সংক্রামক রোগের বিস্তার লাভের ফলে প্রতিবছর পৃথিবীতে বহু মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সংক্রামক রোগের বিস্তার লাভ ঘটে বেশি।

সুষম ও পুষ্টিকর খাবার জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক। সুষম ও পুষ্টিকর খাবার বলতে নামিদামি খাবার বোঝায় না। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রচুর শাকসবজি খাওয়া, ব্যায়াম করা, চিন্তামুক্ত নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করা, শরীর ও মনকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেয়া এবং প্রচুর পানীয় পান করা অনেক রোগব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়ার উত্তম উপায়। ধূমপান পরিহার জরুরি। ধূমপান বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটায়। ধূমপান স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণের অন্তরায়। ধূমপান ফুসফুসের ক্যান্সারের অন্যতম কারণ।

ওষুধের যুক্তিসঙ্গত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনে যখন-তখন ওষুধ সেবন করবেন না। আমরা অনেকেই জানি না- ওষুধ শুধু রোগ সারায় না, ওষুধ রোগ সৃষ্টিও করে। ওষুধের অপপ্রয়োগজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়ার ফলে স্বাস্থ্যহানি ছাড়াও মানুষ মৃত্যুবরণ করতে পারে। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত এবং অন্য অর্ধেক মানুষ অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধের কবলে আক্রান্ত। আপনি জানেন কি- বিশ্বজুড়ে অপ্রয়োজনীয়, ব্যবহার অনুপযোগী ও ক্ষতিকর ওষুধের পেছনে যখন শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে, তখন পৃথিবীর বহু দেশে বিশুদ্ধ পানির অভাবে লাখ লাখ শিশু রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে! কাজেই ওষুধ নির্বাচন ও প্রয়োগে সতর্ক হওয়া বাঞ্ছনীয়।

সর্দি, কাশি, সাধারণ জ্বর ও ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে তথাকথিত অ্যান্টিডায়রিয়াল ও অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের কোনো যৌক্তিকতা নেই বরং এসব ওষুধ গ্রহণের ফলে স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হয়। সুস্বাস্থ্যের জন্য কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা উচিত। কর্মক্ষেত্রে সংঘটিত দুর্ঘটনা ও রোগের কারণে পৃথিবীর প্রায় ২৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ও মৃত্যুবরণ করে।

এনজিওগুলোকে স্বাস্থ্যখাতে আরও অধিক ব্যয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করা সরকারের দায়িত্ব। স্বাস্থ্য খাতে এনজিওগুলোর ব্যয় পর্যাপ্ত নয়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে এনজিওগুলোর বরাদ্দ ও ব্যয় আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্বে প্রতিবছর ৫ বছরের কম বয়স্ক দেড় কোটি শিশু মৃত্যুবরণ করে। মাথাপিছু কয়েক সেন্ট ব্যয় করলে অতি সহজে এ মৃত্যু এড়ানো যায়। এমন মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনাদায়ক। একটি বুলেটের পয়সা দিয়ে একটি শিশুর প্রাণ বাঁচানো যায়। আমাদের ভাবতে হবে- একটি বুলেটের পয়সা দিয়ে একটি শিশুর জীবন বাঁচানোর পরিবর্তে একটি বুলেট দিয়ে একটি শিশুর প্রাণহরণ গ্রহণযোগ্য কিনা?

স্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে। পৃথিবীর বহু দেশে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কারণে ওসব দেশে স্বাস্থ্য অত্যন্ত উন্নত; যদিও অন্যান্য খাতে তাদের প্রচুর সমস্যা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ভিন্ন মতাবলম্বী দুটো দেশ কিউবা এবং তাইওয়ানের উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে। আমরা কি ওরকম একটি দেশ হতে পারি না?

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×