কলেজগুলো কি অধ্যক্ষবিহীনই থাকবে?

  বিমল সরকার ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কলেজগুলো কি অধ্যক্ষবিহীনই থাকবে?

একটি প্রবাদ আছে- ‘মাঝি ছাড়া নাও আর মুরব্বি ছাড়া গাঁও’। আমার বাবা কাজকর্ম ও সংসার কোনোরকমে গুছিয়ে রেখে নিজের সুবিধা অনুযায়ী বছরে অন্তত একবার বিবাহিত মেয়েদের বাড়িতে বেড়াতে বের হতেন।

বড়দি, মেজদি ও ছোটদিকে দেখে কুটুমবাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে ফিরে আসতে আসতে একেকবার বাবার সাত-আটদিন সময় লেগে যেত। আর এ সময়টি অন্য ভাইবোন ও একমাত্র কাকাসহ আমরা সবাই যে কীভাবে কাটাতাম তা আজ অবধি ভুলতে পারি না। লেখাপড়া বাবার তেমন ছিল না, ছিল না কোনো একাডেমিক সার্টিফিকেট, কিন্তু রাগ-অভিমান, শাসন ও দায়িত্ববোধ ছিল আমার দৃষ্টিতে একেবারে কানায় কানায়।

এ সবকিছু এলাকাবাসীরও দৃষ্টিগোচর হতো। বাবার অত্যন্ত কড়া শাসনের মধ্য দিয়েই আমাদের বেড়ে ওঠা। কিছুক্ষণের জন্যও বাবা বাড়িতে নেই তো আমাদের পরম স্বস্তি। এটা কর, ওটা কর, এখানে যাসনে, ঘরে বসে থাক, বই নিয়ে বস, স্লেট-পেন্সিল নিয়ে আয়, আরও কত কী; আপাতত নিস্তার। আর বেশিদিনের জন্য বের হওয়া মানে তো ‘আমরা সবাই রাজা’। আমাদের আর পায় কে? স্কুল কামাই থেকে শুরু করে ...।

খাঁচায় আবদ্ধ পাখি কোনোরকমে খাঁচার বাইরে বের হয়ে যেতে পারলে যা হয়। ঘরগেরস্থালি সবকিছু ঠিক রেখে আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এ সময় মা’কে রীতিমতো হিমশিম খেতে হতো। কাউকে জানাতে হতো না, আমাদের চলাফেরা, চালচলন ও কর্মকাণ্ড দেখেই পাড়া-প্রতিবেশীরা সহজেই বুঝে যেত যে বাবা বাড়িতে নেই। মায়ের কাছ থেকে কিছুটা ছাড় আমরা পেতাম এ কারণে যে, মাও জানতেন, বাবা তো তার যা আদায় করার সব সময় আমাদের কাছ থেকে আদায় করেই থাকেন। বেড়ানো শেষে বাবার ফিরে আসা মানে সবকিছু স্বাভাবিক, ঠিক আগের মতোই।

মুরব্বি ছাড়া গ্রামের কথা উল্লেখ করলাম। বাবা অথবা দায়িত্বশীল একজন অভিভাবকের খুবই সাময়িক অনুপস্থিতিতে পরিবারের পরিস্থিতি ব্যক্ত করতে গিয়ে কোনোরকম কল্পনার আশ্রয় না নিয়ে সরাসরি নিজেদের কথাই বলে ফেললাম।

২.

বেসরকারি তো বটেই, অনেক সরকারি কলেজেও দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত অধ্যক্ষের পদ খালি, এটা সারা দেশেই বেশ আলোচনার বিষয়। সপ্তাহ ধরে নয়; মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, তিন বছর, পাঁচ বছর, আট বছর, এমনকি টানা ১০ বছর ধরে যদি অধ্যক্ষের পদটি খালি পড়ে থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে চলে, চলছে- তা বোধকরি সবার কাছে সহজেই অনুমেয়। বর্তমানে একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাজের ধরন ও কর্মপরিধির কথা বলে সহজে শেষ করা যাবে না।

কেবল শিক্ষার্থী-শিক্ষক, ক্যাম্পাস তথা কলেজের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড নয়, অধ্যক্ষদের পারিপার্শ্বিক নানা বিষয় নিয়েও সারাক্ষণ ব্যস্ত-ত্রস্ত থাকতে হয়। সরকারি একেকটি কলেজে পাঁচ-দশ, বিশ-পঁচিশ, এমনকি ত্রিশ-চল্লিশ হাজার বা এর চেয়েও বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে। বেসরকারিগুলোতেও দুই-তিন বা পাঁচ-সাত হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এমন প্রতিষ্ঠান অনেক রয়েছে।

প্রায় প্রতিষ্ঠানেই এখন উচ্চমাধ্যমিকের পাশাপাশি স্নাতক (পাস ও অনার্স) ও মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকস্বল্পতা যেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। নিয়োগ বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত। খণ্ডকালীন বা চুক্তিভিত্তিক নিযুক্ত শিক্ষকদের কাজ ও সম্মানী-ভাতাদি নিয়ে কলেজে কলেজে চলছে এক ধরনের টানাপোড়েন। শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষ বিমুখতা নিয়েছে মারাত্মক বা অবিশ্বাস্য রূপ।

প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে বিতর্কিত প্রাইভেট বা কোচিং প্রবণতা। গভর্নিং বডির কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈধ-অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও বেশ আলোচিত। পরীক্ষা, বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন কোর্সের পরীক্ষা তো বলতে গেলে সারা বছরই লেগে আছে।

অ্যাকাডেমিক কর্মকাণ্ডে ঢিলেমি, মন্থরতা বা উদাসীনতা এবং আর্থিক অস্বচ্ছতার বিষয়টিও বেশ আলোচিত। নানা রকমের তৎপরতা-অপতৎপরতা, নালিশ-অভিযোগ, মামলা-মোকদ্দমা ও অবাঞ্ছিত-অনভিপ্রেত ঘটনা। অথচ কলেজের আসল প্রাণ, মূল আকর্ষণ অধ্যক্ষের পদটিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে।

বছরের পর বছর ধরে ‘ভারপ্রাপ্ত’ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেখানে এত বড় পরিসরের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে নিয়মিত অধ্যক্ষেরই হিমশিম খাবার কথা, সেখানে ভারপ্রাপ্তরা নাকি ‘সুষ্ঠুভাবেই’ কাজ করে যাচ্ছেন!

পাকিস্তান সৃষ্টির আগে পূর্ববঙ্গসহ সমগ্র বাংলারই (ব্রিটিশ-বাংলা) প্রবেশিকা পরীক্ষা (এসএসসি) পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ওই সময়ের যারা এখনও বেঁচে আছেন তারা বেশ ভালো বলতে পারবেন শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন, ফরম পূরণ, পরীক্ষার প্রবেশপত্র-প্রশ্নপত্র-উত্তরপত্র ও ফলাফল সংগ্রহের কাজে তিন বছরে, দুই বছরে বা বছরে হেডমাস্টারদের কখনও কলকাতায় যাওয়া পড়ত কিনা। প্রায় সব কর্মকাণ্ডই বিশ্বস্ততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে ডাক বিভাগের মাধ্যমে।

আর আজ? অধ্যক্ষদের কি আর স্বস্তি আছে? সারাক্ষণ ফাইল-ব্যাগ হাতে এখানে-ওখানে ছোটাছুটি করতে হয়। কেবল শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা অধিদফতর, এমনকি সচিবালয় নয়; ‘কর্মব্যপদেশে’ রাজনীতিক-জনপ্রতিনিধি-মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের কাছেও আনাগোনা করতে করতে ব্যস্ত-ত্রস্ত ও গলদঘর্ম হয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয় অনেক অধ্যক্ষকে।

৩.

কিন্তু চলছে। চলছে তো চলছেই। অধ্যক্ষ নেই। উপাধ্যক্ষও নেই। তবু চলছে। পঞ্চাশ বছর, ষাট বছর, এমনকি সত্তর বছর আগে স্থাপিত ঐতিহ্যবাহী কলেজ। অথচ ৫ বছর, ১০ বছর, কোনো কোনোটি এরও বেশি সময় ধরে চলছে অধ্যক্ষ ছাড়া।

আমার জানামতে, এমন কলেজও রয়েছে যে, সেই ৫০ বা ৬০-এর দশক থেকে শুরু করে (যখন সারা কলেজে মোট শিক্ষার্থী ছিল দুশ’, তিনশ’ কিংবা বড়জোর চারশ’) দশকের পর দশক অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ উভয় পদই পূর্ণ ছিল। আর এখন এগুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী থাকলেও অধ্যক্ষ নেই ৫ বছর এবং উপাধ্যক্ষ নেই ২০ বছর ধরে।

উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু করে অনার্স কোর্সও চলছে ‘বেশ ভালোভাবেই’। অবিশ্বাসেরই কথা, ৭০ বছর আগের কলেজ, একইসঙ্গে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের পদ দুটিই শূন্য ১০ বছর ধরে। তবু চলছে; বেশ ভালোই চলছে। আজব এক দেশ- অধ্যক্ষের পদ শূন্য, উপাধ্যক্ষের পদ শূন্য, তাও খানিকটা আলোচনা-সমালোচনা হয়।

কিন্তু ক্যাম্পাস মুখরিত থাকলেও রুটিন অনুযায়ী শ্রেণীকক্ষ যে ফাঁকা পড়ে থাকে সেদিকে কারও দৃষ্টি নেই। কেউ অবশ্য বলতে পারেন, ‘অধ্যক্ষ নেই তো কী হয়েছে? ভারপ্রাপ্ত দিয়ে তো কাজ চালানো হচ্ছেই।’ এ প্রসঙ্গে এখানে আমি আর কিছু বলতে চাই না। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ-নিযুক্তি ও তার কর্মকাণ্ড নিয়ে পরবর্তীকালে একটি পৃথক নিবন্ধ লেখার ইচ্ছা রয়েছে। আজ সংক্ষেপে শুধু এটুকুই বলি, সব কাজ বরাতে চলে না।

শৈশবে মা হারালে মাসিই তার ভরসা-অবলম্বন; কিন্তু তা কতটুকু ও কতদিন? ভাত যদি নাই জোটে তো পিঠা-পুলি, মুড়ি-চিড়ে আছে, তাই বলে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ...! এটা কোনো স্বাভাবিক ব্যবস্থা না পরিস্থিতি?

২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত আগ্রহে যে ৩০০ কলেজকে সরকারি বলে ঘোষণা করা হয়েছে, জানা যায়, সেগুলোরই অন্তত ৮০টিতে অধ্যক্ষ এবং ৫০টিতে একইসঙ্গে অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ উভয় পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অযথা বাগাড়ম্বর পরিহার করে বিষয়টির প্রতি এখনই মনোযোগের সঙ্গে সবার দৃষ্টি দেয়া জরুরি বলে মনে করি।

বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×