দেশপ্রেমের চশমা

বইমেলা লেখকবান্ধব নয় প্রকাশকবান্ধব

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বইমেলা লেখকবান্ধব নয় প্রকাশকবান্ধব
বইমেলা লেখকবান্ধব নয় প্রকাশকবান্ধব

পৃথিবীতে একটি মাত্র দেশে বুকের রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এ দেশটির নাম বাংলাদেশ। এমন একটি দেশের নাগরিক হতে পেরে আমরা গর্বিত। এ দেশের দেশপ্রেমিক ছাত্রসমাজের ভাষার জন্য জীবনদান বৃথা যায়নি। তাদের এ মহান ত্যাগকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে। এ এক মহান অর্জন।

এ জন্য আজ বিশ্বব্যাপী ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ দিবস পালন করে বিশ্বের সব দেশ নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি তাদের মমত্ব বাড়িয়ে তোলে। মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করতে নতুন করে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। তবে যে দেশের নাগরিকদের আত্মত্যাগের কারণে আজ মাতৃভাষা বিশ্বব্যাপী মর্যাদা পেল, সে দেশে মাতৃভাষার অবস্থা কী অবস্থায় আছে তা ভাবলে লজ্জিত হতে হয়।

এ দেশে ১৯৫২ সালে সংঘটিত ভাষা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করা। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পার হলেও আমরা কি তা করতে পেরেছি? না পারিনি। সেদিকে কি সরকারের কোনো খেয়াল আছে? অন্য ভাষা শিখলে নিজের ভাষাকে কখনও অমর্যাদা করা হয় না। আমরা যদি ইংরেজি, জাপানি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ ইত্যাদি ভাষা শিখি, তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সে জন্য নিজের মাতৃভাষাকে অসম্মান করা মোটেও যৌক্তিক নয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভাষা অধিক প্রাধান্য পাচ্ছে। আগে উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির প্রাধান্য ছিল। এখন নিচ থেকে ইংরেজিকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এ কারণে অপরিকল্পিতভাবে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল গড়ে উঠেছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে এখন বাড়ি ভাড়া করে গড়ে উঠছে অক্সফোর্ড, ক্যামব্র্রিজ স্কুল। ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠাকে বিনিয়োগকারীরা এখন লাভজনক ব্যবসা হিসেবে গণ্য করছেন। আর এ ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েছেন এমনকি বিদেশি অ্যাম্বাসিগুলোও।

ঢাকার উল্লেখযোগ্যসংখক বিদেশি দূতাবাস ইংরেজি স্কুল পরিচালনা করছে। তুরস্ক দূতাবাস পরিচালিত টার্কিশ হোপ স্কুলের ঢাকা ছাড়া চট্টগ্রামেও ক্যাম্পাস রয়েছে। এসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো বেতন নেয়া হচ্ছে। তাছাড়া দেশীয় স্কুলগুলোয় এখন ইংরেজি মাধ্যমে ন্যাশনাল কারিকুলাম পড়ানোর হিড়িক পড়েছে। এসব ব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়ে শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষা পাচ্ছে কিনা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সে বিষয়ে কোনো মূল্যায়ন নেই। ভাষা আন্দোলনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের মূল দাবিটির যখন শিক্ষাঙ্গনেই এ অবস্থা, তখন অন্যত্র যে এ দাবি অধিকতর অবহেলিত তা না বললেও চলে। সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও আদালতের সর্বস্তরে এখনও বাংলা ভাষা চালু করা সম্ভব হয়নি।

সংক্ষেপে বলা চলে, বাংলা ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে চলছে নীরব নৈরাজ্য। নাগরিক সমাজে যে মানসিকতা তৈরি হয়েছে তাতে একজন অভিভাবক তার ছেলে মাতৃভাষার পরিবর্তে ইংরেজিতে কথা বললে বেশি খুশি হন। সরকারিভাবে ভাষার শুদ্ধ চর্চা ও উন্নয়নের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা লক্ষিত হচ্ছে না। পরিবর্তে গণমাধ্যমে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রতিদিনই ভাষাকে বিকৃত করা হচ্ছে। টেলিভিশনে প্রমিত বাংলায় লেখা নাটকের চেয়ে আঞ্চলিক বাংলায় লিখিত নাটকের সংখ্যা অনেক বেশি।

আঞ্চলিক ভাষার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলা যায়, এর সংখ্যা অপরিকল্পিতভাবে এত বেশি হলে শিশু-কিশোরদের প্রমিত বাংলা শেখা ব্যাহত হতে পারে। এসব বিষয়ে দেখভালের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা থাকা উচিত। বাংলা ভাষার উন্নয়নে দেশে বাংলা একাডেমি কাজ করছে। কিন্তু তাদের কাজ এ ক্ষেত্রে গঠনমূলক ও সুপরিকল্পিত নয়।

বাংলা ভাষার উন্নয়ন এবং উৎকর্ষের জন্য বাংলা একাডেমিকে আরও একটু কঠোর হতে হবে। টিনএজারদের কাছে জনপ্রিয় অনলাইন রেডিওগুলো প্রতিদিন ‘বাংলিশ’ (না বাংলা, না ইংলিশ) ভাষা উপস্থাপন করে যেভাবে কসাইয়ের মতো বাংলা ভাষাকে জবাই করছে, তাতে বাংলা একাডেমির উচিত তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা।

অন্যদিকে, স্যাটেলাইট টিভির ক্ষেত্রে ভারতীয় হিন্দি ও বাংলা সিরিয়ালের একতরফা প্রবাহে দেশের ভাষা ও গণসংস্কৃতির ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সে বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কোনো চিন্তা-ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশি সমাজের ওপর প্রতিবেশী দেশের সংস্কৃতির এ একতরফা প্রবাহের ভয়াবহ পরিণতি উপলব্ধি করে ১৫ বছর আগে ২০০৪ সালে খ্যাতিমান নাট্যকর্মী জামালউদ্দীন হোসেন দেশের একটি শীর্ষ দৈনিকে ‘দয়া করে হিন্দি চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দিন’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

ওই প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছিলেন, অনিয়ন্ত্রিত বহিরাগত সংস্কৃতির একতরফা প্রবাহ কীভাবে ঘরে ঘরে বউ-ঝি ও শিশু-কিশোরদের মন-মানসে বিকৃতি ঘটাচ্ছে। ভারতের দর্শক-শ্রোতাদের কাছে বাংলাদেশের গান ও নাটক অনেক জনপ্রিয় হলেও এ দেশের একটি টিভি চ্যানেলও ভারতে, এমনকি বাংলা ভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গেও দেখানো হয় না। অথচ, ক্ষতিকর জেনেও ভারতের সব জনপ্রিয় স্যাটেলাইট চ্যানেল বাংলাদেশের অবারিত করে দেয়ায় এ দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

বাংলা একাডেমি স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে ভাষার মাসে একুশে বইমেলার আয়োজন করছে। মিসরের বা জার্মানির বইমেলার চেয়েও এ মেলার সময়কাল বেশি দীর্ঘ। এ বইমেলাকে কেন্দ্র করেই মূলত বাংলাদেশের প্রকাশকরা তাদের নতুন বই প্রকাশ করেন। তবে এ মেলার শুধু উত্তরোত্তর কলেবরই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, একাডেমি এ মেলাকে প্রকাশকবান্ধব করতে পারলেও লেখকবান্ধব করতে পারেনি। প্রতিবছর মেলা শেষে দাবি করা হয়, এ বছর গত বছরের চেয়ে বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু মেলায় কী ধরনের বই বের হচ্ছে, প্রকাশিত বইয়ের কতগুলো মানসম্মত এবং কতগুলো মানসম্মত নয়, তা নিয়ে কি বাংলা একাডেমির কোনো মূল্যায়ন আছে? নেই বলে যে কোনো ব্যবসায়ী প্রকাশক হয়ে যা খুশি তাই বই আকারে প্রকাশ করতে পারেন।

একাডেমির উচিত লেখালেখির ও সাহিত্যের বিভিন্ন এলাকার বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে একটি কমিটি করে মেলায় প্রকাশিত প্রতিটি বই মূল্যায়ন করিয়ে মেলা শেষে প্রকাশকদের একটি করে প্রতিবেদন দেয়া। এ প্রতিবেদনে প্রকাশকের প্রকাশিত বইয়ের গুণ ও মান সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ মতামত থাকবে যা ওই প্রকাশকের জন্য হবে পরের বছর বই প্রকাশের জন্য একটি পরামর্শমূলক সতর্ক বার্তা। এর জন্য খুব বেশি সময় বা অর্থ বরাদ্দ করা লাগবে না। শুধু একাডেমির সদিচ্ছা থাকলেই এ কাজ করা সম্ভব।

সে সঙ্গে একাডেমির আরও দেখা উচিত, কোনো প্রকাশক আপত্তিকর কিছু প্রকাশ করছে কিনা। এমন দেখভালের ব্যবস্থা থাকলে প্রকাশকরা মানসম্পন্ন বই প্রকাশে মনোযোগী হবেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি কিছু প্রকাশক মান বিচার না করে টাকার বিনিময়ে ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের লেখা বই প্রকাশ করছেন। আবার, বিদেশে অবস্থানরত কোনো লেখক কিছু ডলার দিলে তার বই মানসম্পন্ন না হলেও কোনো কোনো প্রকাশক ছাপতে দেরি করেন না। এর ফলে প্রকাশিত গ্রন্থের মান কমে যায়।

বই বিক্রয় ও মুনাফার দিকটা বিবেচনা করলে হতাশ হতে হয়। এ কথা বলা যায়, বাংলা একাডেমির বইমেলাটি একটি প্রকাশকবান্ধব বইমেলা। এ মেলা থেকে প্রকাশকরা বই বিক্রি করে লাভবান হন। কিন্তু একাডেমি ভুলে যায়, বইয়ের স্রষ্টা হচ্ছেন লেখক। তাদের শ্রম আর ঘামে রচিত বই দিয়ে প্রকাশকরা বইয়ের স্টল সাজান। এ মেলা থেকে দু-চারজন আইকন লেখক ছাড়া অন্য সব লেখক কতটা লাভবান হতে পারেন? এ ব্যাপারে কি বাংলা একাডেমির কোনো করণীয় নেই? মেলা শেষে বিক্রয়লব্ধ অর্থের শতকরা কত ভাগ প্রকাশক আর কতভাগ লেখকের পকেটে যায়, সে হিসাব কি কেউ করেন? এ হিসাব করলে বলতে হয়, মেলার মধু খান প্রকাশকরা, হাতেগোনা দু-একজন আইকন লেখক বাদ দিলে অধিকাংশ লেখক পান প্রকাশনার আনন্দ ও শুকনো ধন্যবাদ। তবে এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম আছে। সব প্রকাশকই এক রকম নন। লেখককে যোগ্য সম্মান ও তার রয়্যালটি দেয়ার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা মেনে চলার ক্ষেত্রে কতিপয় প্রকাশকের সুনাম আছে। তবে এমন প্রকাশকের সংখ্যা খুব কম। এ ব্যাপারে একাডেমির উচিত লেখকদের পাশে দাঁড়ান। দুটি কাজ করে একাডেমি লেখকদের প্রাথমিকভাবে সহায়তা করতে পারে। প্রথমত, স্টল বরাদ্দ দেয়ার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সঙ্গে একাডেমি যখন প্রকাশকদের কাছে তাদের প্রকাশিতব্য গ্রন্থের তালিকা জমা দিতে বলে, তখন একাডেমির উচিত প্রকাশকদের কাছে তাদের প্রকাশিতব্য নতুন গ্রন্থের লেখকদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির একটি অনুলিপি জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করা। এমন নীতি গ্রহণ করলে প্রকাশকরা তাদের প্রকাশিত প্রতিটি বইয়ের লেখকের সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হবেন। আরেকটি বিষয়ে নজর দেয়া প্রয়োজন। কোনো প্রকাশক যদি লেখকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন, তাহলে লেখকদের অভিযোগ করার একটি জায়গা থাকা উচিত। বাংলা একাডেমি চাইলে লেখকের জন্য এমন একটি জায়গা তৈরি করতে পারে।

লেখকদের চাওয়া-পাওয়া খুব বেশি নয়। তারা চান, প্রকাশক তার বই প্রকাশ করে যেন লোকসানে না পড়েন। তবে তার বই বিক্রি করে প্রকাশক যদি মুনাফা করতে পারেন, তাহলে তাকে যেন তার প্রাপ্য রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত করা না হয়। লেখকদের সঙ্গে, বিশেষ করে গুণী গ্রামীণ লেখকদের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে প্রকাশনা জগতের এ জায়গাটিতে পেশাদারিত্বের যথেষ্ট ঘাটতি আছে বলে ধরা পড়ে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির প্রতি একজন ক্ষুদ্র লেখক হিসেবে আবেদন করব, আপনারা প্রকাশকবান্ধব বইমেলা করুন, তাতে আমাদের আপত্তি নেই।

কিন্তু লেখকদের অবহেলা করবেন না। তাদের পাশে দাঁড়ান। লেখকরা যেন বইমেলায় যোগ্য সম্মান এবং প্রকাশকদের কাছ থেকে তাদের লেখার সম্মানী যথাযথভাবে পান, সে ব্যবস্থা সৃষ্টি করে তাদের অধিকতর সৃষ্টিশীল লেখালেখিতে উৎসাহ দিন।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×