প্রয়োজন পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা

  সোহেল মেহেদী ও রাশেদ-আল-মাহফুজ ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রয়োজন পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা
প্রতীকী ছবি

বিগত বছরগুলোতে প্রশ্নফাঁস একটি ব্যাধিতে পরিণত হয়েছিল। কখনও অসাধু কর্মকর্তা অথবা কখনও প্রযুক্তির অপব্যবহারকে দায়ী করা হয়েছে। তবে এর পেছনের মৌলিক কারণটি খোঁজা হয়নি। আমাদের কাছে মনে হয়, অসুস্থ প্রতিযোগিতা এর পেছনে মূল কারণ।

প্রত্যেক অভিভাবকের একান্তই আকাঙ্ক্ষা- তার সন্তানকে অবশ্যই জিপিএ-৫ পেতে হবে। তা না হলে তারা সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হবেন, তাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। আপাদমস্তক শিক্ষা নিয়ে এই যখন অবস্থা, তখন এটিকে সামাজিক ব্যাধি না বলে আর উপায় নেই। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ অতীব জরুরি।

এসএসসি পরীক্ষা চলছে, বিগত দুটি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী কঠোরহস্তে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। আপাতত বলা যায়, এ ক্ষেত্রে তিনি সফল হয়েছেন; তবে কয়েকটি পরীক্ষা কেন্দ্রে আগের বছরের প্রশ্নে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে, এটা দুঃখজনক।

এ ছাড়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি বিষয় লক্ষণীয়, কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের মেধা ও মনন বিকাশের আগেই আমরা তাদের পরিমাপ করার চেষ্টা করছি। তাদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি, যা মোটেই কাম্য নয়। এতে করে তাদের যথাযথ মেধা ও মননের বিকাশ তো হচ্ছেই না; বরং জিপিএ-৫ পাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা তাদের নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পিইসি এবং জেএসসি পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য জিপিএ-৫ পাওয়া নয়; বরং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি প্রদান। তাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে একটা নির্দিষ্ট নম্বর প্রাপ্তির ভিত্তিতে সবাইকে পাস সার্টিফিকেট প্রদান করা যেতে পারে এবং সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্তদের বৃত্তির জন্য মনোনীত করা যেতে পারে। এতে করে জিপিএ-৫ পাওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, সেটি বন্ধ হবে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমবে।

সমাজ ব্যবস্থাকে যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কোনো বিকল্প নেই। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে জীবনমুখী, কল্যাণমুখী ও কর্মমুখী। সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা। শুধু পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থাই দেশ ও বিদেশের চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারে। একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে দক্ষ জনশক্তি। কাজেই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অবশ্যই মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পাসের হার সন্তোষজনক ছিল। যদিও মানসম্মত শিক্ষার প্রশ্নটি থেকেই যায়। তারপরও যেহেতু বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা যাচ্ছে, এটি একটি আশার দিক। আমরা যদি বিগত তিন দশকের এসএসসির ফলাফল পর্যালোচনা করি; তাহলে দেখতে পাই, প্রথম দুই দশকে বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। ১৯৯০ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল মাত্র ৩১.৭৩ শতাংশ এবং ২০০১ সালে ছিল ৩৫.২২ শতাংশ।

১৯৯০ সালের আগে পাসের হারের অবস্থা ছিল আরও নাজুক। এটি প্রমাণ করে, দীর্ঘসময় ধরেই দক্ষ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরির লক্ষ্যে পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি ছিল। যেসব ছাত্র ফেল করেছে, তাদের অনেকেই হয়তো কোনো না কোনো বিষয়ে ভালো ছিল। যদি পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা থাকত, তাহলে আমরা অবশ্যই তাদেরকে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারতাম। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমরা সেটি করতে পারিনি।

ফলে তার অভাব এখন অনুভব করছি। আমরা বিদেশে দক্ষ ও শিক্ষিত জনশক্তি রফতানি করতে পারতাম। কিন্তু আমরা বিদেশে অদক্ষ-আধাদক্ষ শ্রমিক রফতানি করছি। তাছাড়া দেশে পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক দক্ষ জনবল না থাকার কারণে আয়ের একটা বিরাট অংশ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ফেল করানোর মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই বরং পাস করাতে হবে; ছেলেদের মানুষ করতে হবে। এ বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট- জাতির পিতা উপলব্ধি করেছিলেন, একটি জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন আমরা সেই পথে হাঁটতে পারিনি। তবে আশার আলো হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।

আমরা যদি বিগত ২০১০ সাল থাকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করি; তাহলে দেখতে পাই, গড় পাসের হার ৮৪.৬৮ শতাংশ। এটা বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফসল। কেননা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশই তরুণ। তাদের যদি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়, দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা না যায়; তাহলে ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে যে উন্নত দেশে পরিণত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

অর্থমন্ত্রী ২৪ জানুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবনে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়া সম্ভব নয়। কারণ এ শিক্ষাব্যবস্থা টেকনোলজি বেজড নয়। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, আমরা যে ডিজিটাল বিপ্লব বা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কথা ভাবছি, সেটি বাস্তবায়নের জন্য অবশ্যই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পঠন ও পাঠনে পরিবর্তন আনতে হবে, টেকনোলজির সংযোগ ঘটাতে হবে।

আমাদের দেশে যেমন শিক্ষিত বেকার আছে, আবার তেমনি দক্ষ জনবলেরও অভাব রয়েছে। কাজেই শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, প্রযুক্তিভিত্তিক করতে হবে; যাতে করে বৈশ্বিক চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায়।

তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়, পাঠ্যসূচি প্রণয়ন ও পরীক্ষা পদ্ধতি সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অবশ্যই কনটেক্সটকে বিবেচনায় নিতে হবে, কারণ আমাদের ছেলেমেয়েরা কেমন পরিবেশে বেড়ে উঠছে, সেটি একটি বিবেচ্য বিষয়। তা না হলে হিতে বিপরীত হবে, বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার যে উদ্দেশ্য, সেটি ব্যাহত হবে। তা ছাড়া চাহিদার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। সেই পরিবর্তনের কাজটি গবেষণাভিত্তিক জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে হওয়ার কথা। সেই দায়িত্ব আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর।

মালয়েশিয়া তাদের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কিউএস র‌্যাংকিংয়ে ৩০০-এর মধ্যে আনতে পেরেছে, সেখানে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে আছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণাভিত্তিক জ্ঞানচর্চার কাজটি কতটুকু করতে পেরেছে, সেটি ভাববার বিষয়। যে নরমেটিভ ভিত্তির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার জন্য কতটুকু প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

আমরা প্রায়ই উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, কোর্স-কারিকুলাম নিয়ে আলোচনা করি, সেগুলো অনুসরণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো উন্নত দেশ থেকে আলাদা। শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে, যার জন্য গবেষণালব্ধ জ্ঞান প্রয়োজন। কাজেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাভিত্তিক জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। কেননা একটি পরিকল্পিত, সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা তৈরিতে গবেষণালব্ধ জ্ঞানের ব্যবহার অনস্বীকার্য। শুধু পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থাই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে মানসম্মত শিক্ষার আওতায় এনে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

লেখকদ্বয় : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাক্রমে হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগ এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×